Archives

স্থানের তথ্য (Place Information)

18 Apr 2019

বাংলাদেশের আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে প্রাচীন সভ্যতা। মসজিদের শহর হিসেবে বাগেরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জের অনেক খ্যাতি। কিন্তু ক’জন মানুষ জানে এর বাইরেও একটা প্রাচীন শহর আছে? যার অস্তিত্ব এখনও জানান দিচ্ছে কালের সাক্ষী হিসাবে। প্রাচীন এই শহর মোহাম্মদাবাদের ইতিহাস অনেক পুরনো। ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারের প্রায় তিন বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এখনও মোহাম্মদাবাদ বেঁচে আছে সভ্যতার শেষ স্মৃতি হিসেবে।

হারানো এই শহরের শেষ স্মৃতির খোঁজে কোনো একদিন বের হয়েছিলাম এই ইট পাথরের শহর থেকে। সাথে ছিল ভ্রমণ সঙ্গী কায়েস। আমার অফ ট্রেইল ঘোরাফেরার সঙ্গী-সাথীরা সব আজব কিসিমের। কোনো জায়গায় যেতে নেই তাদের মানা। তাই দেই সব আজব জায়গায় হানা। ঝিনাইদহ কোনো ট্র্যাভেলিং ডেস্টিনেশন না। তবে সরকার চাইলে কি না পারে? প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাকে ট্যুরিজমের একটা বিশাল অংশ করা যায়। কিন্তু আফসোস এটা তো বাংলাদেশ, তাই তো আমরা দেশের সৌন্দর্য ছেড়ে বিদেশ পানে ছুটি।

মিশরের পিরামিড, আগ্রার তাজমহল টানে আমাদের চুম্বকের মতো৷ কিন্তু পুণ্ড্রনগর, সুবর্ণগ্রাম, উয়ারী-বটেশ্বর, খলিফাতাবাদ, মোহাম্মদাবাদের নাম কহিলে কহিবে- মশাই, এইগুলো কোথায়? নিজেদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, বাঙাল মুলুকের ইতিহাসই যদি না জানলাম, কী হবে কোন দূর দেশের শাহজাহানের তাজমহল দেখে? তাই আগে দেখি নিজের দেশ। মাহমুদ ভাইয়ের এই পাঞ্চ লাইনে দীপ্ত হয়ে বের হয়ে গেলাম ঝিনাইদহের পথে।

ডিসেম্বর মাসের এই হাড় কাঁপানো শীতে কেউ এসি বাসের টিকেট কাটে শুনলে খ্যা খ্যা করে হাসার কথা৷ তবে পাটুরিয়া ঘাটের সেই ভয়ংকর এক জ্যামের আত্মকথা জানলে তাদের হাসিখানা মলিন হয়ে যেত৷ আমার জীবনের সর্বকালের সেরা জ্যাম উপভোগ করলাম সেদিন। জ্যাম নিয়ে যদি কোনো দিন উপন্যাস লিখি, আমি সেই পাটুরিয়া ঘাটের ভয়াল দিনের কথা অবশ্যই লিখবো৷ ১৭ ঘণ্টার সেই এক মহাজার্নির হাতছানি দিয়ে গাবতলী থেকে সোনারতরি বাসে উঠে বসলাম আমি আর কায়েস ভাই রাত ১২ ঘটিকায়৷ যথারীতি বাস পাটুরিয়া ফেরি ঘাট এসে পৌঁছালো ৩টার দিকে। এরপর যেন এক প্রগাঢ় অপেক্ষা।

সে অপেক্ষার নেই কোনো শেষ। ভোরের প্রথম সূর্যের আলোর সাথে আমাদের ও বাধ ভেঙে গেল৷ নেমে পড়লাম বাস থেকে৷ চোর গেলে বুদ্ধি বাড়ে৷ তাই সবাই আলাপে মত্ত। আহারে যদি ভেঙে ভেঙে যেতাম, কত তাড়াতাড়ি চলে যেতাম৷ এখন টাকার মায়াও ছাড়তে পারে না, আবার বাসে বসে থাকাও সহ্য করতে পারে না। এই বুঝি ছেড়ে দিল, এরপর তো পুরো টাকা লস হয়ে যাবে। এই ছেড়ে দিল ভাবতে ভাবতে দুপুর গড়িয়ে গেল।

আমরা যাত্রী ভাইরা নিজেদের মধ্যে সুখ দুঃখের প্যাচালে ব্যস্ত। এরপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ দুপুর ৩ ঘটিকার দিকে যখন বাস ফেরীতে উঠলো সবাই উল্লাসে এক সাথে চিৎকার দিয়ে উঠলো। কালীগঞ্জ যখন এলাম তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। খাওয়া শেষে এবার হোটেলের খোঁজে বের হলাম। কালীগঞ্জে পর্যটক আসে খুবই কম। তাই এখানে ফাইভ স্টার মানের সার্ভিসের চিন্তা করা বিরাট বড় পাপ।

তবে যে হোটেলই পেলাম ছারপোকা আর বাতির রাজা ফিলিপস দেখে ওঠার আগ্রহ পেলাম না। হতাশ হয়ে যখন নাপিতের দোকানের সামনে সিগারেট টানছি উনি ডেকে আমাদের বললেন, একটা নতুন হোটেলের কথা। তার কথা মতো সেখানে গিয়ে অবাক। খুবই পরিপাটি পরিচ্ছন্ন একটা হোটেল৷ নতুন হয়েছে এই শহরে। স্মৃতি প্রতারক। এতক্ষণের চেষ্টায় নাম বের করতে পারলাম না।

রাতের খাবার সেরে একবারে কাক ডাকা ভোরে বের হয়ে গেলাম। ঘড়ির কাঁটায় তখন সাড়ে পাঁচটা। হাড় কনকনে শীতে জবুথবু হয়ে পকেটে হাত ঢুকিয়ে আমি আর কায়েস ভাই হাঁটছি৷ রাত্রি শেষে কুয়াশা যেন ক্লান্ত মুখে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে একটা চমৎকার শীতের সকালের৷ প্রতি শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে বের হচ্ছে শীতের সাদা ধোয়া। যত দূর দেখা যায় কুয়াশা ঘেরা অন্ধকারে জড়িয়ে পুরো ধরনী৷ লেপ-কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমানো এই সকালে রাস্তায় মানুষের সংখ্যা খুবই নগণ্য৷

রিক্সা না পাওয়া যাওয়ায় বাস স্ট্যান্ডের মোড় পর্যন্ত হেঁটেই যেতে হলো। এরপর উঠে পড়লাম যশোরের বাসে। গন্তব্য আমাদের বারোবাজার। বর্তমানের ঝিনাইদহের বারোবাজার এলাকা প্রাচীন কালে ছাপাইনগর হিসেবে খ্যাত ছিল। রাজত্ব চলতো এখানে বৌদ্ধ হিন্দু রাজাদের। খান জাহান আলী তার বারোজন সহচর নিয়ে আসেন এই ছাপাইনগর। সেখান থেকেই এর নাম বারোবাজার। যুদ্ধ কিংবা মহামারিতে ছাপাইনগর ধ্বংস হয়ে যায়। থেকে যায় প্রাচীন ইতিহাস।

১৯৯৩ সালের প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বের হয়ে আসে ১৫টি স্থাপনা যার বেশির ভাগই প্রাচীন মসজিদ। এগুলো হচ্ছে সাতগাছিয়া মসজিদ, ঘোপের ঢিপি কবরস্থান, নামাজগাহ কবরস্থান, গলাকাটা মসজিদ, জোড়বাংলা মসজিদ, মনোহর মসজিদ, জাহাজঘাটা, দমদম প্রত্নস্থান, গোড়ার মসজিদ, পীর পুকুর মসজিদ, শুকুর মল্লিক মসজিদ, নুনগোলা মসজিদ, খড়ের দীঘি কবরস্থান, পাঠাগার মসজিদ ও বাদেডিহি কবরস্থান। এত ছোট জায়গার মধ্যে কতগুলো প্রত্নস্থান।

বারোবাজার নেমে আগে সকালের নাস্তা পর্ব সেরে নিলাম। শহর মোহাম্মদাবাদ যাবার আগে যাব আর এক কিংবদন্তি গাজী কালু চম্পাবতীর মাজারে। বাংলাদেশে এই প্রথম মনে হয় কোনো নারীর নামে মাজারের সন্ধান পেলাম। গাজী কালু চম্পাবতীর মাজারে প্রতিদিন ভিড় করে দর্শনার্থী। এটি এমন একটি মাজার যেখানে হিন্দু মুসলিম সব ধর্মের মানুষের সমাবেশ হয়৷ গাজী কালু চম্পাবতীকে নিয়ে হয়েছে পালা গান, যাত্রা, মঞ্চ নাটক৷ গাজী কালু চম্পার মাজারে যাবার জন্য আমরা ভ্যান ঠিক করলাম। চলা শুরু করলো ভ্যান গ্রামের মেঠো পথ ধরে৷

এক সময় পৌঁছে গেলাম গাজী কালু চম্পাবতীর মাজারে। এত সকালে মাজারে আমরাই দর্শনার্থী। দূরে এক সাধু বসে আছে। সাধু বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম প্রতিদিন এখানে কেমন মানুষ হয়। সাধু বাবা চিন্তা সাগরে ডুবে গিয়ে বললেন, বিশ্বাসে মেলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। আপনি বিশ্বাস করবেন না শহরের মানুষ। গাজী কালু চম্পা কোনো লোক সাহিত্যের চরিত্র নয়৷ উনি জীবন্ত কিংবদন্তি৷ প্রতিদিন এখানে বৃহত্তর যশোরের অনেক লোক আসে৷ এখানে এসে মানত করে।

এই যে অশ্বত্থ গাছ দেখছেন এখানে ভক্তরা সুতা বেঁধে আগরবাতি জ্বালায়৷ পূর্ণ ভক্তিতে বিশ্বাস রাখলে তার মানত পূর্ণ হয়৷ আপনি শহরের ছেলে, দেখেই বোঝা যায় এসব বিশ্বাস করেন না। জানেন এই মাজারে অনেক প্রেমিক প্রেমিকা আসে। তাদের মনবাসনা কাগজে লিখে এই অশ্বত্থ গাছে বেঁধে দেয়৷ গাজী বাবা আর মা চম্পাবতীর কল্যাণে কত ছাও পোলার প্রেম সফল হলো। ভক্তি ভরে আপনিও সুতা ঝুলিয়ে দেন, মানত পূর্ণ হবে৷ এ কথা বলে সাধু বাবা আবার ধ্যানে গেলেন। গুনগুনিয়ে গাইতে থাকলেন গাজী কালু চম্পার পালা গান৷

আমরা মাজারটা ঘুরে ঘুরে দেখছি৷ মাজারের দক্ষিণ পাশে শ্রীরাম রাজার দীঘি। মাজারে পাশাপাশি তিনটি কবর। মাঝের বড় কবরটি গাজীর, পশ্চিম দিকে কালুর কবর আর পূর্ব দিকের ছোট কবরটি চম্পাবতীর। পুরো মাজার জুড়ে আছে বিশাল একটা অশ্বত্থ গাছ৷ এই অশ্বত্থ গাছের ফোঁকরে নাকি আছে একটা গোপন কবর৷ কার কবর তা জানা না গেলেও গাজী কালু চম্পাবতীর গল্প বা জনশ্রুতি সম্পর্কে অবগত থাকলে কিছুটা ধারণা করা যায়৷

লোক শ্রুতি থেকে জানা যায় দরবেশ শাহ সিকান্দার ছিলেন প্রাচীন বৈরাট নগরের রাজা। তার রানী ছিলেন আজুপা সুন্দরী। তাদের প্রথম পুত্র জুলহাস শিকারে গিয়ে নিরুদ্দেশ হন। বরখান গাজী ছিল রাজা-রানীর দ্বিতীয় পুত্র আর কালু ছিল তাদের পালক সন্তান৷ দুই ভাইয়ের মধ্যে ছিল দহরম মহরম সম্পর্ক৷ যেখানে গাজী সেখানেই কালু৷ সে সময় ছাপাইনগরে অপরূপ রূপবতী এক রাজকন্যা চম্পাবতীর নাম শোনা যায়৷ চম্পাবতী ছিলেন সামন্ত রাজা রামচন্দ্র ওরফে মুকুট রাজার কন্যা। চম্পাবতীর রূপের নহর দেখে তার প্রেমে পড়ে যান বরখান গাজী৷

চম্পাবতীর টানে তিনি এসে পড়লেন এই ছাপাইনগর৷ হিন্দুরাজার মেয়ের প্রেম গাজীকে ভুলিয়ে দিল সে মুসলমান। বরখান গাজীর টানে তার সাথে চলে আসলেন ভাই কালু৷ বলুহর বাওরের তমাল গাছ তলায় প্রতিদিন মিলিত হতো গাজী চম্পা। মুকুট রাজা এই খবর পেয়ে রেগে আগুন৷ গাজীকে শায়েস্তা করার ভার দিলেন তার সেনাপতি দক্ষিণ রাওকে৷ কিন্তু বিধিবাম সেনাপতি যুদ্ধে করুণভাবে পরাজয় বরণ করে বরখান গাজীর কাছে ইসলাম ধর্মের দীক্ষা নিয়ে মুসলিম হয়ে যান।

অপরদিকে মুকুট রাজা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চলে আসেন ঝিনাইদহের বাড়িবাথান। যেখানে চম্পাবতী সেখানেই গাজী আর কালু৷ বরখান গাজী চম্পাবতীকে উদ্ধার করে নিয়ে যান তার রাজ্যে। কিন্তু দরবেশ রাজা শাহ সিকান্দার এই সম্পর্ক কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। তাদেরকে রাজ মহল থেকে বিতাড়িত করা হলো ভগ্ন হৃদয়ে কালু চম্পাকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন।

শেষ পর্যন্ত গাজী প্রেমের জন্য দরবেশ বেশে ঘুরতে ঘুরতে সুন্দরবন হয়ে আবার এসে পড়েন এই ছাপাই নগর। সাথে দক্ষিণ রাও, কালু, চম্পাবতী সঙ্গী হলেন। এখানে তাদের আস্তানা গাড়া হয়৷ শুরুতে অশ্বত্থ গাছের কোটরে একটা কবরের কথা বলেছিলাম। ধারণা করা হয়, এটা সেনাপতি দক্ষিণ রাও’র কবর৷ গাজী কালু চম্পাবতীকে নিয়ে মিথ চলে আসছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই৷ কবিতা পুঁথিতে যুগ যুগ ধরে প্রচারিত হয় তাদের প্রেমের গীত৷

ইতিহাসের পাতা থেকে এবার বাস্তবে ফেরার পালা। আবার ভ্যানে করে এসে পড়লাম বারোবাজার মোড়ে। এবার যাত্রা শহর মোহাম্মদাবাদের পথে৷

“পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ঈমানের অংশ। দেশ ঘুরি,মাতৃভূমি কে পরিষ্কার রাখি।”

Source: Ashik Sarwar‎ < Travelers of Bangladesh (ToB)

17 Apr 2019

হটাৎ একদিন সান্ধ্য আড্ডায় ঠিক হল সপ্তাহান্তে কাছাকাছি কোথাও বেরিয়ে এলে মন্দ হয় না। কাছাকাছি যাওয়ার মতো জায়গা কলকাতার আশেপাশে কোথায় আছে সে নিয়ে বিশেষ আলোচনা চললো । কেউ একজন বলে উঠলো নেতারহাটে যাওয়া যেতে পারে,বাকি সবাই বেশ আগ্রহ ও প্রকাশ করল। কিভাবে যাওয়া যেতে পারে দুদিন বেড়ানোর জন্য ঠিক জায়গা হবে কিনা। শেষমেশ ঠিক হলো এবার আমরা বাইক এ যাবো , দূরত্ব ও বেশী নয় মাত্র ৫৫০ কিলোমিটার, একদিনেই পৌঁছে যাওয়া যাবে। একদিন দু-রাত থেকে পরের দিন আবার কলকাতা ফেরত আসা যাবে। গুগলে সার্চ করে রাস্তার একটা ধারণা করে নিলাম কলকাতা থেকে কোলাঘাট হয়ে মেদিনীপুর ধরে সোজা জঙ্গলমহল, ওখান থেকে ঘাটশিলা হয়ে জামসেদপুর তারপর দলমা হয়ে সোজা রাঁচি বাইপাস, ওখান থেকে লোহারদাগা হয়ে একদম নেতারহাটে।

অনলাইনে হোটেল ও বুক করে ফেলা হলো । ঝাড়খণ্ড ট্যুরিজম এর ওয়েবসাইটে গিয়ে খুব সহজেই খুঁজে পেলাম হোটেল প্রভাত বিহার, রেটিং ও খুব ভালো দেখলাম আর খরচ ও আমাদের একদম বাজেটের মধ্যে। ৬ জনের জন্য দুটো রুম এর ভাড়া ৭২০০ ট্যাক্স সহ । আমাদের দুটো এক্স্ট্রা বেড নিতে হয়েছিল যেটা বেড প্রতি ৩০০ টাকা মতো এক্স্ট্রা চার্জ করেছিল।

এবারে ব্যাগ গোছানোর পালা। বাইক যেহেতু বাহন খুব জরুরী জিনিস পত্তর ই নেয়া হলো। তিনটে বাইক ছয় জন আরোহী।শনিবার ভোর ৪ টে নাগাদ কলকাতা থেকে বেরিয়ে পড়লাম নেতারহাট এর দিকে । হাইওয়েতে বড়ো বড়ো ট্রাক গুলো কে পাস কাটিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া খেতে খেতে এগিয়ে চললাম। কোলাঘাট এসে প্রথম থামা হলো , হাইওয়ের ধারের ধাবা গুলো বেশ ভালো চা বানায়। শের ই পাঞ্জাব তো খুব বিখ্যাত ধাবা। চা পান করে আবার এগিয়ে চললাম হাইওয়ে ধরে। সকালের আবছা আলো আর লম্বা হাইওয়ে চারপাশে শুধু সাঁ সাঁ গাড়ির আওয়াজ ।চারপাশে হালকা কুয়াশার চাদর এ মোড়া , আকাশ ফুটে লাল সূর্য আস্তে আস্তে উকি মারছে অসাধারণ অনুভূতি। যতটা সময় আমরা ভেবেছিলাম তার থেকে অনেকটা বেশি সময় লাগছিলো। জঙ্গলমহলে ঢুকলাম প্রায় সকাল ৯.৩০ এর দিকে। উঁচু নিচু ঢেউ খেলানো রাস্তা দুপাশে সবুজ বনানী কেটে এগিয়ে চলেছে। কিছু জায়গায় রাস্তা বাড়ানোর কাজ চলছে দেখলাম। আমরা বেশ খানিকক্ষণ একটু জিরিয়ে নিলাম গাছের ছায়া আর মৃদু শীতল বাতাসে। চার পাশে মহুয়ার গন্ধ মাতাল করা এক পরিবেশ। সন্ধ্যের একটু পর পর রামপুর পৌঁছে গেলাম। তারপর রাস্তা একদম ফাঁকা । ভেবে ছিলাম রাত ১১ টার দিকে হোটেল এ পৌঁছে যাবো। লোহারদাগা পৌঁছলাম প্রায় রাত ১.৩০। এর পর শুরু হলো পাহাড়ি পথ। দু একটা শিয়াল ছাড়া কেউ কোথাও নেই। হোটেল এ পৌঁছলাম রাত ২.৩০। ফোন করে বলাই ছিল তো ঢুকতে অসুবিধা হয়নি। সবাই বেশ ক্লান্ত ছিলাম ঘুম এ চোখ বুজে আসছিল।

পরদিন উঠতে একটু বেলাই হয়ে গেলো। ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিযে পড়লাম আসে পাশের পরিবেশ দেখতে। আমাদের হোটেল টা পাহাড়ের একদম ঢালে। বেশ কয়েক ধাপ উঠে তবে রাস্তায় উঠতে হয় । হোটেল থেকে বেড়িয়ে সামনে একটা পুলিশ ক্যাম্প । আইজিআই গেমে র মতো একটা উঁচু টাওয়ার ও রয়েছে। পিছনে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে অনেক গরু চড়ে বেড়াচ্ছে। লোকজন খুব একটা নেই। পাখির আওয়াজ শুনতে শুনতে বেশ খানিকটা পথ নীচে নেমে আবার উপরে উঠে বাঁক ঘুরেই নেতারহাট বাসস্ট্যান্ড। আমরা বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে অনেকটা এগিয়ে একটা টিলা র উপর উঠে বসলাম চার পাশের মাটি শুকনো পাতার আস্তরনে ঢেকে আছে । লম্বা গাছ গুলোর ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো পড়ে জায়গাটা অসম্ভব সুন্দর করে দিয়েছিল। উঠতে ইচ্ছে করছিল না। হোটেল থেকে ফোন করে খাবার খেতে না ডাকলে আরো বেশ খানিকটা সময় থাকতাম আমরা।
হোটেলের সামনের খাবার জায়গাতে বসে চারপাশের পাহাড় দেখতে দেখতে খাওয়া আর বিকেল এ কোথায় যাবো সেটা নিয়েও ভেবে নেয়া হলো। এবার যাবো সানসেট পয়েন্ট এ।

খেয়ে উঠে একটু জিরিয়ে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সানসেট পয়েন্ট এর দিকে। কিছুটা বনের পথ পেরিয়ে খোলা মাঠের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললাম আসে পাশে কিছু কিছু চা বাগান চোখে পড়লো । আমাদের দার্জিলিংয়ের চা গাছের মতো বেঁটে নয় একটু লম্বা। সামনে বেশ ভিড় পাশে এক বিশাল জলাভূমি, ভিড়ের কারণ এ আমরা আর দাঁড়ালাম না। দেখে লাগলো কোনো কিছুর শুটিং চলছে, নয়তো জায়গাটা বেশ সুন্দর ছিল।
সানসেট পয়েন্ট এ পৌঁছে দেখলাম সামনে পাহাড়ের সারি র নীচে গভীর বন। পালামো টাইগার রিজার্ভ এর বোর্ড ঝোলানো রয়েছে কয়েক জায়গায়। আমরা বেশ খানিকটা এগিয়ে একটা জায়গায় গিয়ে বসলাম সামনে ছবির মতো একটা একটা পাহাড় গায়ে লেগে লেগে দাঁড়িয়ে আছে। আস্তে আস্তে সারা আকাশ লাল হয়ে এলো, এই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সূর্য এবার অস্ত যাবে। নিস্তব্ধ পরিবেশ চার পাশে শুধু পাখির আওয়াজ। আমরা নির্বাক হয়ে দৃশ্য টা উপভোগ করতে করতে একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলাম । ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসলো বুঝতেই পারিনি। এবার হোটেল এ ফেরার পালা ।

Source: Arghadeep Sikdar‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)

17 Apr 2019

অনেকের ভ্রমণ গল্প পড়েই গ্যাংটক গিয়েছিলাম, হটাৎ করে নতুন একটা জাইগা বাংলাদেশীদের জন্য খুলে দেয়াই ট্রাভেল গ্রুপ গুলতেও যেন রাশি রাশি পোস্ট আসছিলো গ্যাংটক, লাচুং, লাচেন, চাঙ্গু লেক।

আমরা রউনা দিয়েছিলাম কলকাতা থেকে।

১। কলকাতা থেকে রউনা দিলে বিমানে অথবা ট্রেনে অথবা বাসে আগে শিলিগুড়ি যেতে হবে, এর পড়ে সেখানে থেকে গ্যাংটক এর জিপ পাওয়া যাই

২। কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি বিমানের টিকেট ২৫০০-৩২০০ টাকা পড়ে যাবার সময় কিন্তু ফেরত আসার সময় টিকেট এর দাম ৫০০০ হাজার এর মতো পড়ে যাই।

৩। সম্ভব হলে ট্রেনের টিকেট আগে কেটে নিতে পারেন, ফেরত আসার দিনের । কারণ যেদিন যাবেন সে দিনের যে ট্রেন ভাড়া সেটা দিয়ে আপনি বিমানেই যেতে পারবেন। তবে বিমানের টাইম মিলিয়ে নিবেন আপনার ট্যুর প্ল্যান এর সাথে কারণ বিকেলের দিকের বিমান হলে আপনাকে শিলিগুড়ি ১ রাত থাকা লাগতে পারে। এইখানে হোটেল খরচ বেশি না

৪। ভুল করেও কেউ গ্যাংটক এর প্যাকেজ শিলিগুড়ি থেকে নিবেন না। ট্রাভেল করলে অভিজ্ঞতা বাড়ে আর এই বার অভিজ্ঞতার ঝুড়ি নিয়ে আসছি, পুরোটাই খারাপ অভিজ্ঞতা।

প্যাকেজ ছাড়া আপনারা ঘুরতে পারবেন না, গ্যাংটক থেকে অনেক গুলো এজেন্সির সাথে কথা বলে সব বুঝে শুনে এর পড়ে প্যাকেজ নিবেন

৫। বাংলাদেশিদের জন্য গ্যাংটক এ যাবার যে পারমিশন লাগে এইটা চাইলে শিলিগুড়ি SNT থেকে নিতে পারেন অথবা Rangpo চেক পোস্ট থেকে নিতে পারেন। Rangpo থেকে নেয়াই ভালো, ৫-১৫ মিনিটের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যাই

৬। গ্রুপ ভাবে গ্যাংটক গিয়ে যদি একেক জন একেক দিনে ব্যাক করেন তবে অবশ্যই সেই পারমিশন এর কপি সবার কাছে রাখবেন

৭। কেউ যদি মনে করেন গ্যাংটক থেকে দারজেলিং আসবেন তাইলে আসতে পারেন- ২৫০ টাকা শেয়ার জিপ এর ভাড়া, ১০ সিটের গাড়ী থেকে, বেশ চাপাচাপি করে বসা লাগে। ঠিক শেয়ারে শিলিগুড়িও যাবে ভাড়া ২৫০ টাকাই

৮। দারজেলিং যেতে চাইলে আগে ভাগেই দারজেলিং যাবেন কারণ গ্যাংটক সিকিম ঘুরে গিয়ে, দারজেলিং তেমন ভালো লাগে নি আমাদের

৯। গ্যাংটক এ MG Marg এ অনেক ট্রাভেল এজেন্সি আছে যাদের থেকে প্যাকেজ নিতে পারবেন। ১০-১৫ কপি ছবি + পাসপোর্ট + ভিসার ফটোকপি নিবেন

১০। হালাল খারাপ পাওয়া একটু কষ্ট, চেষ্টা করবেন খুঁজে দেখার। যখন গ্যাংটক থেকে লাচুং এর জন্য যাবেন ভালো ভাবে বুঝে প্যাকেজ এ কথা বলে নিবেন যে আপনারা হোটেল এ রুম হিটার নিবেন কারণ তাপমাত্রা মাইনাস এ থাকে এইখানে

১১। লাচুং এর সব স্পটে আবার হোটেল এ শীতের পোশাক ভাড়া পাওয়া যাই- ১৫০ রুপি প্রতি পিস এর মনে হয়

১২। প্লাস্টিকের পানির বোতেল সাথে নিতে দিবে না লাচুং এ

১৩। চেষ্টা করবেন গাড়ির ড্রাইভার যেন ভালো হয় নাইলে ট্যুর মাটি হবার জন্য আর কাউকে লাগবে না

সর্বশেষ এ যেখানেই থাকবেন সেখানের মানুষদের সম্মান করবেন, আর পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কিছু করবেন না।

source:

17 Apr 2019

কিছু প্রেম থাকে, যাকে কখনো ভোলা যায়না, মন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়না। সে প্রেম হতে পারে কৈশোরের, যৌবনের, পরিপক্ক বয়সের, এমনকি সে প্রেম জীবনের শেষ বেলাতে এসেও ধরা দিতে পারে। প্রেম ব্যাপারটাই আসলে এমন। কখন, কোথায়, কিভাবে আর কেন যে কারো জীবনে এসে পরবে ভাবতেই পারবেনা কেউ। প্রেম ব্যাপারটাই এমন, বলে কয়ে বা আগে থেকে জানান দিয়ে কখনো আসেনা। যদি কখনো এমন এসেও থাকে তবে সেটা ঠিক প্রেম নয়, প্রেমের মতই অন্যকিছু।

আমার কাছে প্রেম হল অবাধ্য, অশান্ত, অসহ্য, অপার্থিব সুখের একটা অনুভূতি, যেটা কোন বয়স, সময় আর অবস্থান দেখে হয়না। প্রেম হুট করে আর নিজের অজান্তেই হয়ে যায়। প্রেম তো কখনো কখনো এমনও হয় যে, সে যে প্রেমে পড়েছে সেটা সে নিজেও জানেনা, বুঝতে পারেনা। শুধু বিশেষ কিছুর জন্য মন কেমন করে, বুকের মধ্যে একটা হাহাকার ওঠে, একবার দেখার জন্য চোখ তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে, একটু ছুঁয়ে দেয়ার জন্য প্রান আনচান করে। আর শত চেষ্টা করে যদি চোখের সামনে বা স্পর্শের অনুভূতিতে আসে তবে তখন অনুভূতিরা ভোতা হয়ে যায়, বোধ লুপ্ত হয়ে থাকে, স্বাভাবিক ভাবনা চিন্তা কোথায় যেন হারিয়ে গিয়ে প্রেমে যে পড়েছে তাকে বোবা করে দেয়।

কোন অনুভূতিই তখন প্রকাশ করা হয়ে ওঠেনা। অনন্ত, অবাধ্য আর অপার প্রেম গুলো এমনই বোধয় হয়ে থাকে। অন্তত আমার তো তেমনই মনে হয়। ক্ষণে ক্ষণে যে প্রেম তার উপস্থিতি জানান দিয়ে যায়, মনকে উদাস করে দেয়, প্রানে পাগলা হাওয়া বইয়ে দেয়, হৃদয়কে উত্তাল স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, বাস্তবতাকে বরফের মত গলিয়ে দিয়ে ঝরে ঝরে পরে যায়। হ্যাঁ কাশ্মীর, আরও বিশেষ ভাবে বললে কাশ্মীরের পেহেলগাম আমার কাছে তেমনই এক প্রেমের নাম। অবাধ্য, অশান্ত, অপার্থিব এক প্রেম।

পেহেলগামের কোন যায়গা রেখে কোন যায়গার কথা বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা আমি। আমাদের যাদের একটু সাধ্য আছে, এমন অপার্থিব প্রেমে বিলীন হবার মত অল্প বিলাসিতা আছে, যারা শুধু ঘুরে বেড়াতে আর জীবনটাকে একটু উপভোগ করতেই শুধুমাত্র পেহেলগামে যাই, তাদের কাছে পেহেলগামের সবকিছু, সবটুকুই যেন সুখের এক ভূমি, স্বর্গের হাতছানি যার সবকিছু জুড়ে, অপার্থিব তার প্রতিটি কোনের যে কোন কিছুই। পাইনের অরণ্য, ঝর্ণাধারা, লিডার নদী, স্রোতধারার মাঝে মাঝে নানা রকম পাথর, কত রঙের পাহাড়, প্রতিটি কোনই যার সুখের পসরা সাজিয়ে বসে থাকে সবসময়।

আমি কার কথা বলবো, কতটুকু বলবো, কিভাবে বলবো? তার সবকিছু জুড়েই তো শুধু গোপন সুখের অসহ্য অনুভূতি জড়ানো। পাইনের অরণ্য? সে তো ছায়ায় ছায়ায় ঘেরা এক স্বর্গের বনভূমি যেন, সুখের আচ্ছাদনে ঘেরা পুরো অরণ্যের সবটুকু জুড়ে। পাহাড়ি মাটির গভীর থেকে ঝর্ণা ধারার বয়ে চলার স্রোতের তোড়ে বেরিয়ে পরা পাইনের শেকড়, সেও যেন সুখের নতুন কোন উপমায় নিজেকে তুলে ধরতে চাইছে এখানে সেখানে। আর সেই সুখের আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত পাইনের অরণ্যে ঘোড়ায় চড়ে অচেনা পাহাড়ের অজানা বাঁকে বাঁকে নিরুদ্দেশ ঘুরে বেড়ানোর মত আনন্দ, তার কি হিসেব আছে? কোন উপমায় কি সেই সুখকে, রোমাঞ্চকে বাঁধা যাবে? আমার তো মনে হয়না।

অথবা যদি লিডারের তীরে বসে থাকা কোন নরম কোমল সবুজ ঘাসের উপরে, যার চারপাশে নানা রকমের ফুলের হাসি, ঘ্রাণ, আদুরের কাটার খোঁচা, বয়ে চলা উচ্ছ্বসিত নদীর জলের ছিটা এসে ছুঁয়ে দেয় আপনাকে? শিহরিত না হয়ে কি পারা যাবে? আমার তো মনে হয়না। উচ্ছ্বসিত নদীর সেই ফুলেল তীরে বসে কাটিয়ে দেয়া যাবে অনন্ত অবসর অনায়াসে, সে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি। ঘুম, ক্ষুধা, ক্লান্তি কোন কিছুই তখন আপনাকে স্পর্শ করতে পারবেনা। অপার্থিব সুখ যে কাউকে করে তুলবে অনুভূতিহীন।

অথবা যদি একটু সাহস করে, একটা লাফ দিয়ে গিয়ে বসতে পারেন লিডারের উত্তাল স্রোতের মাঝেই আপন মহিমায় নিজের আভিজাত্য জানান দিয়ে যাওয়া কোন পাথরের উপরে, যে পাথরের চারপাশ দিয়ে অনন্ত যৌবনা লিডারের অবিরত স্রোত শুধু বয়ে যায় আর বয়েই চলে যায়, মাঝে মাঝে ভিজিয়ে দিয়ে যাবে আপনাকে, সেই পাথরের উপরে গিয়ে বসতে যদি পারে কেউ, তখন কেমন লাগবে বা লাগতে পারে কোন ধারনা কি কেউ করতে পারবে? কোন বাখ্যা কি কেউ দিতে পারবে সেই অপার্থিব অনুভূতির? কোন উপমায়, কোন ব্যাখ্যায় সেই অনুভূতিকে প্রকাশ করলে হৃদয়ের সবটুকু সুখের অনুভূতি বোঝানো যাবে আমার জানা নেই।

আপাতত আর থাক, এই অবাধ্য প্রেমের, অসহ্য সুখের, অপার্থিবতার বর্ণনা। পাছে হৃদয়, মন-প্রান অশান্ত হয়ে ছুটে চলে যায় তার কাছে, তাকে দেখতে, তার স্পর্শ পেতে। শেষে বাস্তবতা থেকে নিজেকে নির্বাসিত করতে হতে পারে। তাই আপাতত থাক, আমার অসহ্য সুখের আরুভ্যালী আর অলস অবসরের বেতাব ভ্যালীর কথা নাহয় অন্য কোন একদিন, আবেগ অবাধ্য হয়ে উঠলে পরে বলা যাবে।

যাকে যায়না ভোলা, কখনোই আর কিছুতেই। ক্ষণে ক্ষণে যে প্রেমের মাতাল হাওয়া মনপ্রান আনচান করে তোলে, সময়ে বা অসময়ে।

Source: Sajol Zahid‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)

16 Apr 2019

হঠাৎ একদিন এক বন্ধু বলল সিকিম যাবি? আমি বললাম এইটা আবার কোথায়। বলল ভুটান আর নেপাল এর মাঝামাঝি, তিব্বত এর নিচে। কিছু ছবিও দেখাল বরফ, পাহাড় আর লেকের। বাজেট টুর হবে। আমার রোড জার্নি অপছন্দ । এর আগে একবার ভুটান প্লানে বাই এযার, বাই এযার করতে করে প্লানই বাদ হয়ে যায়। তাই এবার বন্ধু যা বলল সব রাজি রাজি বলে গেলাম। ইন্ডিয়া আমার কখনোই বিদেশ মনেহয়নি, কখনো ইন্ডিয়া যাবার ইচ্ছাও হয়নি। আমাদের মত দেখতে খয়েরি রঙের মানুষ আমাদের মত দেখতে ঘরবাড়ি, একসময় আবার একই দেশ ছিল, বিদেশ কিভাবে হয় ! আমার কাছে বিদেশ মানে সাদা সাদা মানুষ ছোট ছোট কাপড় পরে ঘুরে বেড়াবে। যাইহোক, বন্ধুর সব কিছুতে রাজি হয়ে গেলাম। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার গ্যাংটকে গণ্ডগোল এর গ্যাংটক বলে কথা।

প্লান হল এজেন্সি দিয়ে প্যাকেজে যাব, পারমিশন এর ঝামেলা নাই, কিছুই প্লান করতে হবেনা। বাফে খাবার। ঝামেলা বিহীন টুর। সব বন্ধুদের যাবে কিনা জিজ্ঞেস করতে করতে আর কাওকে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত দুই বন্ধুই যাব বলে ঠিক করলাম। এজেন্সিতে টাকা দিয়ে বুক ও করে ফেললাম। ভিসা টিসা সব রেডি করলাম।কিন্তু, এই এজেন্সি বেপারটা মনে কেমন খটকা লাগছিল।সবসময় এজেন্সি ছাড়া ঘুরতে যেতে চেষ্টা করবেন। পরে এজেন্সি বাদ দিয়ে নিজেরাই রওনা দিলাম। সিকিম যাবার জন্য সবচে ভাল হল চেংরাবান্ধা বর্ডার।এসি, নন এসি আর বিজনেস ক্লাস বাস চলে এই রুটে।সব বাস এর টিকেট কল্যাণপুরে পাওয়া যায়। ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি শিলিগুড়ি পৌঁছে গেলাম মাঝের বর্ডার এর কাজ শেষে । বাসের অন্যদের সাথে মিলে গ্রুপ করে গ্যাংটক এর গাড়ি ঠিক করলাম। শিলিগুড়ি থেকে বাসে অথবা জীপে করে যাওয়া যায়।আপনি চাইলে ট্যাক্সি নিয়েও যেতে পারবেন, তাতে খরচ বেশি হবে। বাসে আপ ৭০ রুপি ডাউন ৮০ রুপি, লোকাল মানুষ থেকে জানা ভাড়া।

আর জীপে ২৫০ রুপি প্রতি জন। একজিপে ১০ জন যেতে পারে। সিট ২-৪-৪। আপনার গ্রুপ বড় না হলেও গাড়ির স্ট্যান্ড আছে সেখান থেকে শেয়ার যেতে পারবেন। গ্যাংটক এর আগে রংপো বর্ডার আছে সেখান থেকে অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হবে। সিকিম ইন্ডিয়ার দ্বিতীয় ক্ষুদ্র অঙ্গ রাজ্য। আশেপাশে ৩ দেশের সীমানা। তাই আপনার সিকিম ঢুকতে এবং বেরতে ইন, আউট সিল নিতে হবে। বের হবার সময় ওই রংপো তেই না গেলেও হবে, আরও এসএনটি গেট আছে, যেকোনোটা দিয়ে আপনি বের হতে পারবেন সিল নিয়ে। রংপো তে খুব ভিড় থাকায় আমাদের অনেক সময় চলে যায়। এক বাংলাদেশি লোকের সাথে এক নেপালি মেয়ের ঝগড়া হাতা হাতির কারণে বাংলাদেশিদের অপেক্ষায় রেখে সব নেপালিদের আর অন্য দেশিদের আগে অনুমতি দিতে থাকে। আমাদের সামনে এক এক জন নেপালি ২০-৪০-৯০ টা পর্যন্ত পাসপোর্ট নিয়ে লাইন এ ছিল।অনেকজন বাংলাদেশির রাত ১০ টা বাজায় সেদিন অনুমতি না পাওয়ায় সেখানেই হোটেলে থেকে যেতে হয়। নেপালিরা পাসপোর্ট ছাড়া শুধু ওদের সরকারি কার্ড নিয়ে সিকিম ঢুকতে পারে।

আমাদের গ্যাংটক পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ১২.৩০ বেজে যায়। সব কিছু বন্ধ সব হোটেল সব রেস্টুরেন্ট । নেমে দেখি বৃষ্টি হচ্ছে। এটাই বাকি ছিল। ১২/১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠাণ্ডা। খুধায় পেট চো চো করছে। সেই দুপুর ১২ টায় খেয়েছিলাম। একটু সামনে যেতেই দেখি মানুষের জটলা। এক লোক মোমো বিক্রি করছে। গপাগপ এক প্লেট খেয়ে নিলাম। ৭০ রুপি ৮ টা চিকেন মোমো। আরও ২/৪ প্লেট খাব ভেবে চাইতে চাইতে দেখি শেষ।
পুরো এম জি মর্গ ঘুরে কোন হোটেল কি কথা বলার লোক পর্যন্ত নেই। সব দরজা বন্ধ তালা দেয়া। সাথের বন্ধু বলল চল ক্লাব খুঁজি, ক্লাব এ রাত থেকে সকালে হোটেল নিব। এমন ভাবতে ভাবতে দেখি আরও যারা হোটেল খুঁজছিল তাদের একজন ডাকছে হাত নেড়ে । পরে সেখানকার পুলিশ কল করে আমাদের হোটেল এর বেবস্থা করে দেয়। এমনটা নাকি প্রায়ই হয়।

ভিউ সহ একটা রুম পেয়ে যাই। পেছনে বারান্দা দিয়ে পুরো গ্যাংটকও দেখা যায়।সকালে উঠে জানালা দিয়ে দেখি কাঞ্চনজঙ্ঘা। কি অসাধারণ দৃশ্য ! পরদিন রেস্ট নিয়ে, আশেপাশে ঘুরে তার পর দিন সাঙ্গু লেক ঘুরতে বেরলাম। চমৎকার পাহাড়ি উঁচুনিচু রাস্তা ধরে যেতে হয়।গ্যাংটক শহরটা ৫০০০ ফিট উপড়ে, এখান থেকে আমরা যাব ১৩,৩০০ ফিট পর্যন্ত।

এখানে কোথাও যেতে হলে আবার পারমিশন লাগবে, ট্রাভেল এজেন্সি সাথে যেতে হবে, গাইড আর ট্রাভেল এজেন্সি মাস্ট। আর পারমিশন এরাই করিয়ে দেবে। যেতে যেতে যখন আমরা আস্তে আস্তে উপরদিকে উঠতে শুরু করলাম দুপুর ১২ টা পাড় হয়ে গেছে তখন, আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করল। সকাল থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত আকাশ পরিষ্কার থাকে, এর পর থেকে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করে আর এরপর বেশি দূর পর্যন্ত দেখা যায়না। আমরা উপড়ে উঠতে উঠতে মেঘের ভেতর দিয়ে চলা শুরু করলাম, সামনে ২০ ফুট এর বেশি দুরে দেখা যায়না। পৌঁছলাম ২ ঘণ্টা পর সাঙ্গু লেক। ১০ ফিট সামনে কিছু দেখা যায়না ! খুব কম অক্সিজেন। একটু বেশি হাঁটলেই মাথা ঘোরায়। রেস্ট নিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে ঘুরতে থাকলাম, সাথের বন্ধু ইয়াক গরু নিয়ে ঘুরতে গেল। ১২০০ রুপিতে লেক ঘুরিয়ে নিয়েয় আসবে। এর মধ্যে আশপাশ অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেছে আর বরফ ও পড়তে শুরু করেছে, পুরো লেকটা আর আশেপাশের পাহাড় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল, এখানে কেবল কার আছে, লেকের সাথের পাহাড়ে ওঠা যায় এতে করে, উপর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ভিউ পয়েন্ট।
যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেনা, দয়াকরে নিদ্রিস্ট স্থানে ময়লা ফেলুন।

Source: Rafaat Pronoy‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)

15 Apr 2019

একদিনে ঢাকা শহর থেকে ঘুরে আসা যায় এমন অনেক যায়গা আছে। তারমধ্যে তেওতা ভ্রমন নিয়ে তেমন পোস্ট এই গ্রুপে দেখা যায়না, কিংবা অনেকেই এই সুন্দর এলাকাটি সম্পর্কে জানেন না। আজ আপনাদের বলবো তেওতা জমিদার বাড়ী ভ্রমণ ও আরিচা থেকে পদ্মার টাটকা ইলিশ খাওয়ার গল্প। হ্যা আরিচা যমুনা নদীর তীরে। আর আরিচা থেকে ৫-৭ কিমি দূরে পদ্মা ও যমুনা নদীর মিলনস্থল।

দেশের পুরাকীর্তি স্থাপনার মধ্যে মানিকগঞ্জের তেওতা জমিদার বাড়ী ইতিহাস অন্যতম। মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর কূলঘেঁষা সবুজ-শ্যামল গাছপালায় ঢাকা তেওতা গ্রামটিকে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে দিয়েছে জমিদার শ্যামশংকর রায়ের প্রতিষ্ঠিত নবরত্ন মঠটি।

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার এই তেওতা গ্রামটি আরও বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী প্রমীলার স্মৃতি জড়িয়ে থাকায়। তেওতা গ্রামের মেয়ে প্রমীলা।

কীভাবে যাবেন?
প্রথমে গাবতলী চলে আসুন। গাবতলী থেকে আরিচা ঘাটে যায় এমন বাসে উঠে পড়ুন। ভাড়া ৯০-১০০ টাকা চাইবে, দরদাম করে নিলে ৭০-৮০ তেও রাজী হয়ে যাবে।

সরাসরি আরিচা ঘাটে যায় বি.আর.টি.সি, পদ্মা লাইন বাস। সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা মত।

কিছু কিছু বাস পাটুরিয়া যায়। যারা পাটুরিয়া কিংবা দুর পাল্লার বাসে উঠবেন তারা তারা উথুলি বাজার নেমে সেখান থেকে অটো/সিএনজি ধরে আরিচা ঘাটে চলে যাবেন। অটো ভাড়া ১০ টাকা প্রতিজন। সময় লাগবে ১০ মিনিট মত।

আবার ঢাকার নিউমার্কেট কলাবাগান, শ্যামলী হয়ে পাটুরিয়া পর্যন্ত নীলাচল বাস চলাচল করে। তারা উথুলি বাজার নেমে অটো/সিএনজি ধরে আরিচা ঘাটে চলে যাবেন।

আরিচা ঘাটে নেমে বিস্তৃত যমুনা নদী দেখতে পাবেন। সেখানে পানির শব্দ, পানির আছড়ে পড়া বিস্তৃত জলরাশি আপনাকে মুগ্ধ করবে। সেখানেই কাটিয়ে দিতে পারবেন অনেকটা সময়। চাইলে স্পিড বোটে করে নদীর ওপার কিংবা নদীর মাঝে জেগে উঠা চরে গিয়ে ঘুরে আসতে পারবেন। আপনার মন ভালো হতে বাধ্য।

এখানে ঘোরা হয়ে গেলে দুপুরের খাবার আরিচা ঘাটেই খেয়ে নেবেন, এবং অবশ্যই ইলিশ মাছ দিয়ে। খাবার আগে দামদর করে নিয়ে টাটকা ইলিশ ভেজে দিতে বলবেন। দাম হাতের নাগালেই। আর হ্যা এখানের পানি তেমন একটা ভালো লাগেনি, তাই সম্ভব হলে বোতলের পানি কিনে খাবেন।

তারপর আরিচা ঘাট/বাজার/বাসস্ট্যান্ড থেকে অটো বা সিএনজি করে তেওতা জমিদার বাড়ী যাবেন। ভাড়া ১০ টাকা জনপ্রতি। সময় ১০-১৫ মিনিট মত। এই ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য যাবার পথেই পাবেন। যে রাস্তা দিয়ে যাবেন সেই রাস্তার বাম পাশ থেকে শুরু হয়ে যমুনা নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি, যতদুর চোখ যায় ততদুর শুধু পানি আর পানি। আর রাস্তার ডানপাশে রাস্তার সাথে লাগোয়া সব টিনের বাড়ী। এ যেন আমাদের কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমাদের বন্ধুরা কেউ কেউ মজা করে বলছিলো গরীবের মেরিন ড্রাইভ। (এটার একটা ভিডিও দিলাম)

এই অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে আপনি পৌছে যাবেন তেওতা জমিদার বাড়ী। এই জমিদার বাড়ীর সামনে একটা বড় দিঘি আছে। দিঘিটা এখন বাধাই করা। এই দীঘিতে গোসল করতে আসতো প্রমীলা দেবী। কবি নজরুল ইসলামকে তিনি কবিদা বলে ডাকতেন। একদা প্রমীলা যখন বাড়ির পুকুরে গোসল করাতে যেত, তখন তার রূপে মুগ্ধ হয়ে কবি বলে উঠেন-
“তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়,
সেকি মোর অপরাধ”

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তেওতা জমিদার বাড়িটির বয়স ৩০০ বছর ছাড়িয়েছে। জেলার ইতিহাস থেকে জানা গেছে, সপ্তদশ শতকের শুরুতে পাচুসেন নামের পিতৃহীন দরিদ্র এক কিশোর তার সততা আর চেষ্টায় তামাকের ব্যবসা করে বিপুল ধন সম্পদ অর্জন করেন। দরিদ্র পাচুসেন দিনাজপুরের জয়গঞ্জে জমিদারী কিনে হয়ে যান পঞ্চানন সেন। তারপর শিবালয়ের তেওতায় তিনি এই জমিদার বাড়িটি তৈরি করেন।

জমিদার বাড়ির মূল ভবনের উত্তর দিকের ভবনগুলো নিয়ে হেমশংকর এস্টেট এবং দক্ষিন দিকের ভবনগুলো নিয়েছিল জয়শংকর এস্টেট। প্রতিটি এস্টেটের সামনে বর্গাকৃতির অট্টালিকার মাঝখানে আছে নাটমন্দির। পুবদিকের লালদিঘী বাড়িটি ছিল জমিদারদের অন্দর মহল। অন্দর মহলের সামনে দুটি শানবাঁধানো ঘাটলা, এর দক্ষিন পাশের ভবনের নীচে রয়েছে চোরা কুঠুরী যাকে এলাকার মানুষেরা বলে অন্ধকুপ। উত্তর ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ৪ তলা বিশিষ্ট ৭৫ ফুট উচ্চতার নবরত্ন মঠ। এর ১ম ও ২য় তলার চারদিকে আছে ৪টি মঠ। তেওতা জমিদার বাড়িটি ৭.৩৮ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই জমিদার বাড়ি।

সম্পুর্ন বাড়ী ও তার আশেপাশের আনুসাঙ্গিক জিনিস দেখতে দেখতে অনেকটা সময় অজান্তে কেটে যাবে।

বাড়ীটি দেখাশোনার কেউ আছে বলে তেমন মনে হলোনা, জরাজীর্ণ দেওয়াল, স্থানে স্থানে ভেঙ্গে যাওয়া, রঙ চটে যাওয়া, দেওয়ালে নানা রকম শ্যাওলা ও দেওয়াল ফেরে গাছ বেড়িয়ে গেছে। তাছাড়া যে যেমন পারছে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেখানে সেখানে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, বিরিয়ানির প্যাকেট কিংবা সিগারেট এর প্যাকেট ফেলে দিচ্ছে।

আমরা যারা ভ্রমণে যাচ্ছি সেখানে যদি একটু সাবধানতা অবলম্বন করি ও নোংরা না করি তাহলে এই ঐতিহাসিক স্থানটি আরো সৌন্দর্যময় হয়ে উঠতে পারে। তেওতা এলাকা ও জমিদার বাড়িটি নজরুল-প্রমীলার স্মৃতিধন্য একটি স্থান। এখানে নজরুলের বেশ কিছু স্মৃতি খুঁজে পাওয়া গেছে। তাই বাড়িটিকে কিছুটা সংস্করন ও সংরক্ষণ করে এর হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা দরকার। তাহলে খুব দ্রুতই এটা হতে পারে অন্যতম এক দর্শনীয় এক স্থান।

Source: দ্রীক্ক ধূম্রজাল‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)

15 Apr 2019

প্রথমে বলে নিচ্ছি গ্রুপে কোন এক ভাই পোস্ট দিয়েছিল রুট প্লান ..উনার কাছ থেকে ইন্সপায়ার হইয়া প্লান করছি…এছাড়া ও আমার ভিসা করা আছে ডাউকি পোর্ট দিয়ে ….আম রা তিন আছি …ঈদের ২য় দিন রাতে রউনা হব ইনশাআল্লাহ্‌ ..এর আগে অবশ্য আমরা মেঘালয় ঘুরে আসছি..যাই হউক আমাদের রুট প্লান বিস্তারিত :

1. ঈদের ২য় দিন রাত 10 টায় ইউনিক পরিবহন এ সিলেট কদমতলী ..ভোর 5 টায় পৌছাব ইন শা আল্লাহ
2.৩য় দিন সকালে ডাইরেট বাস এ তামাবিল বর্ডার ..30 মিনিট এর ইমিগ্রাশন শেষে ডাউকি বাজার ..এর পর লোকাল জিপ অথবা রিজার্ব টেক্সি নিয়া শিলং আঞ্জলী বাস স্টান্ড ….বাস স্টান্ড থেকে স্লিপার ভলভো তে শিলিগুড়ি ( 567 কি .মি)
3.৪র্থ দিন শিলি গুড়ি থেকে নাস্তা করে বাস বা কার করে রাংপো পারমিট অফিস হয়ে দেওরালী স্টান্ড .. তারপর অই খান হতে কার এ করে গ্যাংটক (116 কি.মি)
এরপর হোটেল এ রাত্রী যাপন
4. ৫ম দিন গ্যাংটক থেকে সাং গু এর পর সাইট সিন গ্যাংটক
5.৬ষ্ট দিন গ্যাং টক টু লাচুং ইয়ামতাং এর গাড়ি হোটেল ফুড প্যাকেজ এজেন্সির মাধ্যমে ( রাত্রীযাপন)
6. ৭ম দিন শিলিগুড়ি এবং শিলি গুড়ি টু শিলং .. ( রাত্রীযাপন)
7. ঈদের ৮ম দিন শিলং টু ডাউকি টু সিলেট টু ঢাকা
8. ঈদের ৯ম দিন ঢাকা
বি.দ্র. বাজেট পার পারসন 15 হাজার (বেশি হবে না এর থেকে আর ও কম হবে ..যত মানুষ তত কম)

Source: Tutul Ahmed Ajhor‎ <ToB Helpline

15 Apr 2019

একজন মানুষের ভাগ্য কতটা সুপ্রসন্ন হলে ভ্রমণের শেষে এসে এমন একজন মানুষের সাথে দেখা হতে পারে আমি এখনো ভেবে পাইনা। আর সেই প্রায় ভ্রমণ শেষের শুরুতে পেলাম কতশত অজানা তথ্য, শুনলাম রোমাঞ্চকর কত অভিজ্ঞতা, প্রাচীন, অপূর্ব, অভূতপূর্ব, অবিশ্বাস্য কিন্তু সত্যি শরীরে রোমে রোমে শিহরণ জাগানো এক গল্প।

আমার গোমুখ অভিযান শেষ করে দেরাদুন থেকে দিল্লী ফেরার পথে সেই দুর্লভ মানুষের সাথে বসে বসে করা অনেক গল্পের মাঝে এটি একটি। যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশী রোমাঞ্চিত করেছে, আলোড়িত করেছে, এখনো আবেশে জড়িয়ে রেখেছে। তবে মুল গল্পটা শুরু করার আগে সেই দুর্লভ মানুষটি সম্বন্ধে দুই একটি কথা না বললেই নয়।

দেরাদুন থেকে দিল্লীর শতাব্দী এক্সপ্রেস ট্রেন ছিল বিকেল ৪:৫০ এ। তাই সকাল থেকে দেরাদুন শহরের অলিগলি, রাস্তা-ঘাট, দোকান-পাট, পার্ক-ফুটপাথে হেটে হেটে ভাঁজা ভাঁজা করে শেষ দুপুরে ক্লান্ত শরীরে স্টেশনের ডরমেটরিতে ফিরলাম। ধীর লয়ে, অলস পায়ে গোসল করে ফ্রেস হয়ে জানালায় তাকিয়ে রইলাম মোবাইল চার্জে দিয়ে। তারপর পুরো দেরাদুন রেল স্টেশনটাকে খুব ভালো করে দেখে নিতে প্লাটফর্মের শেষ মাথায় আমার রুম থেকে শুরু পর্যন্ত হাটা শুরু করলাম। একবার পুরো স্টেশন এপাশ-ওপাশ করতেই ঘড়ির কাটা চারটা পেরিয়ে গেল।

রুমে ফিরে ব্যাগ কাঁধে করে নিজের কামরায় গিয়ে উঠলাম। নির্ধারিত সিট খুঁজে নিয়ে বসে পড়লাম। আমার সিট ছিল জানালার ধারে। অন্য সিটে এক নিপাট ভদ্রলোক বসে আছেন। তিনি একটু ঘুরে বসতেই আমার সিটে ঢুঁকে পরলাম। আমি বসতে বসতেই তিনি ফোনে অন্যপ্রান্তে কারো সাথে পুরো দুস্তর ইংরেজিতে শতভাগ ব্যবসায়ী কথাবার্তা বলতে লাগলেন। তবে তার কথাবার্তার অনেকটাই সদ্য ফেলে আশা হারশিল নিয়ে, যেটা তার কথার প্রতি আমাকে কিছুটা মনোযোগী করে তুলেছিল। কারন হারশিল আর হারশিলের আপেলের অরণ্য আমার হ্রদয়ে আসন গেঁড়ে ফেলেছে। এখানে আমাকে আবার আসতেই হবে। সেই গল্প মুগ্ধতার তো আছেই আলাদা করে।

ট্রেন ছেড়ে দিল যথা সময়ে। ট্রেনের টিকেটের সাথে যুক্ত বেশ ভালো মানের আর পরিমানের প্রাথমিক নাস্তা নিয়ে এলো। নাস্তা থেকেই আমাদের হালকা পরিচয় শুরু হল, সেই সাথে কত যে অজানা আর রোমাঞ্চে ভরপুর গল্পে পুরোটা সময় চোখের পলকে কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। কথায়, কথায় জানলাম আমি আর কোন ছাতার ট্রেকার বা সোলো ট্র্যাভেলার। আমি যদি নিজেকে ট্রেকার বলি, তবে তিনি তো এই জগতের কিংবদন্তী তুল্য। কত যে কঠিন কঠিন অজানা পথে তিনি তার গ্রুপ নিয়ে এক্সপ্লোর করেছেন সেই গল্প পরে বলবো অন্য কোনদিন। আজকে শুধু হারশিলের রোমাঞ্চকর ইতিহাসের গল্প।

ফ্রেডরিক উইলসন একজন ব্রিটিশ নাগরিক। সিপাহী বিদ্রোহের পরে তিনি কোন একটা কারনে দণ্ডপ্রাপ্ত হন। বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয় তার। কিন্তু তাকে সেই সময়ের প্রথা অনুযায়ী মৃত্যুর পরিবর্তে কোন জঙ্গলে নিজ থেকে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। ধরে নেয়া হত যে সেই সময় গহীন জঙ্গলে গিয়ে কেউই বেঁচে থাকতে পারবেনা। খাবারের অভাব, থাকার যায়গা, আর ভীষণ বৈরি আবহাওয়ায় কেউই নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবেনা।

সেই সাথে বন্য হিংস্র পশুর আক্রমণ তো আছেই। সুতরাং পূর্ণ জীবন পাবার কোন সম্ভাবনাই নেই। আজ বা কাল মৃত্যু জঙ্গলের এই শহুরে বাবুকে আলিঙ্গন করবেই। তবুও সেই সময় তিনি নিজের প্রান বাঁচাতে হারশিলের অরণ্য বেছে নিয়েছিলেন। প্রাথমিক ভাবে আশ্রয় নিয়েছিলেন ছোট্ট একটি গ্রামে। পরে একটা আশ্রয় আর বেঁচে থাকার জন্য কিছু কর্মের জন্য তেহরিকের রাজার সাথে দেখা করলেন। কিন্তু রাজা তার ব্রিটিশ আনুগত্যের কারনে উইলসনকে কোন প্রকার সাহায্য করতে পারলেননা বা চাইলেন না।

তারপর উইলসন নিজের সংস্থান নিজেই করার সিদ্ধান্ত নিলেন। হারসিলের অরণ্য থেকে গাছ কাটতে শুরু করলেন আর সেগুলোকে নদী পথে হৃষীকেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে লাগলেন। কারন হৃষীকেশে তখন রেল লাইন তৈরির জন্য ভালো কাঠ থেকে স্লিপার তৈরির কাজ করছিল ব্রিটিশরা। হৃষীকেশের সমিলের মালিকের সাথে বাৎসরিক চুক্তি করলেন উইলসন।

আর রাজাকে পঞ্চাশ পয়সা বাৎসরিক কর হিসেবে দিতে লাগলেন গাছ কাটার জন্য। কিন্তু এখানে প্রশ্ন এসে যাবে সেই সময়, এতো দুর্গম পথে কিভাবে এতো এতো বিশাল বিশাল গাছ হারশিল থেকে হৃষীকেশে পৌছাতে? রাজাও এই ভেবে অনুমোদন দিয়েছিলেন যে গাছ কাটে কিছু কাটুক, সেগুলো তো আর পৌছাতে পারবেনা কোথাও। নেবে কিভাবে? না আছে পথ, না আছে বাহন।

ঠিক এই যায়গাতেই ব্রিটিশ বুদ্ধির কাছে রাজার ভারতীয় বুদ্ধি মার খেয়ে গিয়েছিল। কারন, এক অভিনব উপায়ে বছরের পর বছর কাঠ হারশিল থেকে হৃষীকেশে পৌঁছে গিয়েছিল উইলসনের বুদ্ধিমত্তায়। উইলসন যেটা করেছিলেন সারা বছর গাছ কেটে কেটে জমিয়ে রাখতেন গঙ্গা বা ভাগরথী নদীতে বা তার আশেপাশে। আর বর্ষাকাল এলে নদী যখন প্রবল যৌবনা হয়, নদীর স্রোত যখন সব বাঁধা ভেঙে চুড়ে, পাহাড়, পাথর আর অনন্ত পথ পেরিয়ে যেত, ঠিক তখন জমিয়ে রাখা গাছ ও কাঠ নদীতে ভাসিয়ে দিতেন। হৃষীকেশে উইলসনের লোকজন সেগুলো তুলে নিতেন। সমিলে দিয়ে দিতেন রেলের স্লিপার বানানোর জন্য।

এভাবে অরণ্য উজাড় করতে করতে উইলসন এতো এতো সম্পদের মালিক হয়ে গেলেন যে, রাজাকেই তার অধিনস্ত করে ফেলেছিলেন! এমনকি স্থানীয় মুদ্রার সাথে নিজের নামে মুদ্রা পর্যন্ত চালু করেছিলেন। খুবই দুর্গম দুই পাহাড়ের দুরত্ত কমাতে তিনি শুধু কাঠ দিয়ে তৈরি করেছিলেন টোল ব্রিজ! সম্ভবত ভারতবর্ষের প্রথম টোল ব্রিজ। যে ব্রিজ পাহাড়ি ভাঙনে ভেঙে গেছে ঠিক-ই কিন্তু এখনো পাহাড়ি ভাঙনের মাঝে রয়ে গেছে সেই ব্রিজের অনেকাংশই।

যেখানে আর একটি নতুন সেতু তৈরি করা হয়েছে। হারশিলে তৈরি করেছিলেন বিশাল প্রাসাদ। মুশৌরিতে তৈরি করেছিলেন হোটেল যা এখনো ভারতীয় প্রশাসনিক ভবন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। হারশিল আর রাজা উইলসন বা পাহাড়ি উইলসনকে নিয়ে এমন নানা রকম গল্প, মিথ, রূপকথার মত অনেক কিছুই প্রচলিত ছিল, আছে পুরো হারশিল জুড়েই।

উইলসনের এসব কর্মকাণ্ডের জন্যই তিনি শুধু ফ্রেডেরিক ই উইলসন থেকে স্থানীয়ভাবে পাহাড়ি উইলসন নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। শুধু এই গল্পটি নয়, এমন রোমাঞ্চকর আরও কত গল্প যে শুনিয়েছেন আমার সেই সহযাত্রী। সেসব গল্প একটি গল্পে লিখে শেষ করার মত নয়, সেটা সম্ভবই নয়। আমার সেই সহযাত্রীর নাম আশু।

যিনি পুরো ট্রেনে, দেরাদুন থেকে দিল্লী আসার পথের ছয় ঘণ্টা এমন গল্পে, তার পাহাড়ের নেশা, ট্রেকিং প্রেম, অজানাকে জানার ভালোবাসা, নিজের ব্লগ, ক্লাব নিয়ে শত গল্পের মাঝে কখন যেন দিল্লী চলে এলাম বুঝতেই পারিনি। অবশেষে একে অন্যের সাথে ফেসবুকে বন্ধু হয়ে। বিদায় নিয়েছিলাম আবার কখনো দেখা হবে সেই প্রত্যাশায়।

হারশিল যেতেঃ কলকাতা থেকে প্লেন বা ট্রেনে দেরাদুন, দেরাদুন থেকে বাস বা জীপে হারশিল।

পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব সবার, সেটা মনে রাখবেন।

Source: Sajol Zahid‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)

15 Apr 2019

রাতের খাবারের পাট চুকিয়ে লঞ্চের ব্রিজে এসেছি কিছুক্ষণ হলো। এতক্ষণে যারা ঘুমোবার ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার মতন গুটিকতক লোক হয়ত জেগে সুন্দরবনের রাতের রোমাঞ্চ উপভোগ করছে, তবে ব্রিজটাকে মোটামুটি জনশূন্যই বলা চলে। কেবল দুপাশের সোফাদুটো দু’জনে দখল করে বসে আছি। ভদ্রলোকের কথায় নড়েচড়ে বসলাম। আমার কেবিনটা স্টারবোর্ডের দিকে, সুতরাং এপাশটার সোফায় একটা অধিকার জন্মে গেছে। রাতে এপাশটায় যখন আসি তখন মোজা পরে, গরম কাপড়ে আপাদমস্তক ঢেকে ক্যামেরাটা কোলে নিয়েই বসি। ধূমপানের অভ্যেস নেই কিন্তু কড়া কফিটার অভাববোধ করি বেশ।

মাহফুজ ভাই আছেন আমার উল্টোপাশে, পোর্টহোলের দিকে, কাজেই হরিণ দেখার লোভে কনকনে শীতের মাঝেও সোফার আরামদায়ক ওম ছেড়ে উঠতে হল। তীর থেকে এক/দেড়শো গজ দূরে নোঙর করে আছি আমরা। তীরের কাছটা বেজায় অন্ধকার। আকাশে হলুদাভ চাঁদটা কেমন যেন মলিন একটা আলো ছড়াচ্ছে, ভালোমতো দেখা যায় না সব। ওর মধ্যেই চিত্রগ্রাহক ভদ্রলোক কি খুঁজে পেলেন আল্লাহ মালুম, তবে তার চোখের তারিফ করতেই হবে। অন্ধকার চোখে সয়ে আসতেই দেখলাম কিছু একটা নড়ছে। অবয়ব বোঝা যায় শুধু, এর বেশী কিছু না।

শ’খানেক গজ দূরে একটা ট্যুরিস্ট লঞ্চ জেনারেটর ছেড়ে রেখেছিলো। হরেক রকমের বাতি দিয়ে সাজানোয় দেখে মনে হচ্ছিলো যেন পার্টি চলছে। মাহফুজ ভাই শুধু মাঝে মাঝেই বিড়বিড়িয়ে তাদের চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছিলেন। জেনারেটরের শব্দে নিশাচরদের কেউ আশ পাশে থাকলে নির্ঘাত পালিয়ে গেছে। আজকের রাতটা বেকার জেগে থাকা হবে মনে হচ্ছে। কাজেই রাতের প্রকৃতি দর্শনের বদলে ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করলাম। আগামী ক’টা দিন লঞ্চভর্তি একদল লোকের সঙ্গে থাকতে হবে অথচ কাউকেই চিনি না। এদিকে গায়ে পড়ে খাতির জমানোও আমার জন্য রীতিমতো মর্মান্তিক ব্যাপার। তারপরেও আলাপ কিন্তু জমে উঠলো।

মাহফুজ ভাই সদালাপী ভদ্রলোক। চারুকলা থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন কিছুদিন হলো। বিয়ে থা করেননি। দুর্দান্ত সাইকেল চালান। সময় পেলেই এদিক ওদিক বেরিয়ে পড়েন। তার ওপর শখের ফিল্মমেকার। এদিকে আমার নিজের পরিচয় দেবার মতন তেমন কিছু নেই। অনাহুত প্রশ্ন বাদ দিয়ে ভদ্রলোক যে আমার সাথে প্রকৃতি দর্শন নিয়ে মেতে উঠলেন, আমার জন্য সেটাও কম স্বস্তির নয়। কথার ফাঁকে ফাঁকে নদীতে আলো ফেলে দেখছিলাম কুমির ভেসে যাচ্ছে কি না। মনে পড়ে গেলো, কোন একসময় জলে ছলাৎ করে একটু বেশী শব্দ হওয়ায় মাহফুজ ভাই লঞ্চের রেলিং থেকে সরে এলেন। আমি আশ্বস্ত করলাম, বাঘের মতন ভারী কোন জানোয়ার রেলিং বেয়ে লঞ্চে উঠলে সেটা একপাশে কাত হয়ে যাবেই, অযথা আতংকিত হবার কিছু নেই। মাহফুজ ভাই আমার দিকে পাথর দৃষ্টি হেনে বললেন,
: এখানে কোন কিছুর ভরসা নেই।

মিথ্যে বলব না, মাহফুজ ভাইয়ের বিশ্বাস দেখে আমার যৎসামান্য বাঘ বিষয়ক জ্ঞানও কেমন যেন গুবলেট হয়ে গেলো। ভয় সংক্রমিত হবার জিনিস। আমিও রেলিং থেকে একটু পিছিয়ে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দিলাম। যে জঙ্গলে বাঘ আছে সেটার ভাব গাম্ভীর্যই আলাদা, সবসময়ই কেমন যেন সতর্ক থাকতে হয়। এখানে এক মুহূর্তের অসতর্কতায় মৃত্যু নেমে আসতে পারে। সতর্কতাই এখানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝের সন্ধিরেখা। জঙ্গল অসতর্ককে ক্ষমা করে না।

রাত গড়িয়েছে অনেকটা। চাঁদটাও হলদেটে ভাবটা ছাড়িয়ে ঝলমলে হয়ে এসেছে। শিশিরে ভেজা গাছপালা সেই আলোয় চকচক করছে। তীরের কাছটা চাঁদের আলোয় পরিস্কার ফুটে উঠেছে, একদম ঝকঝকে। যেখানটায় গাছের ছায়া পড়েছে সেখানে কেমন যেন দুধ্লা অন্ধকার। রাতে বানর নামে না, অনুমান করলাম কাঁকড়ার দল নিশ্চিন্তে চরে বেড়াচ্ছে। এক/আধটা সাহসী বুনো শুয়োর মাঝে সাঝে ছায়ার কাভার ছেড়ে বেরিয়ে আসছে দাঁত দিয়ে মাটি খুঁড়ে রসালো মূল খাবার আশায়। হরিণগুলো তুলনামূলক ভীরু প্রকৃতির, ছায়া ছেড়ে কিছুতেই বের হচ্ছে না। রাতের আঁধারে ওগুলোর চোখ জ্বলতে দেখেই কেবল উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। যাক, রাতের অতিথিরা আসতে শুরু করেছে। আমরা দু’জন চাতক পাখির মতন বসে রইলাম বাঘ দেখব বলে। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তেমন কিছুই ঘটলো না। শেষরাতের দিকে কেবল বিশালাকার একটা পেঁচা দেখলাম। Wood Owl এর সব প্রজাতির চিন্তাভাবনা মাথা থেকে দূর করে দিলাম। ওই সৌভাগ্য নিয়ে আমি আসিনি, কোন ধরণের Fish Owl হবে হয়ত। রাজসিক ভঙ্গিতে ডানা মেলে তীরের দিকে একটা ডাইভ দিয়ে হারিয়ে গেলো উত্তরের গহীন জঙ্গলে।

শিকার পেয়েছে কি না বোঝা গেলো না, পেয়ে থাকলেও শিকারের অন্তিম আর্তনাদ হতচ্ছাড়া জেনারেটর খেয়ে ফেলেছে। আরো একবার ট্যুরিস্ট লঞ্চবাসীদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা গেলো। মাহফুজ ভাই উঠে গেলেন লঞ্চের ছাদে, ছায়াপথটা খানিক সময়ের জন্য দৃশ্যপটে উন্মুক্ত হয়েছে, ছবি তোলার মোক্ষম সময়। আমিও পিছু নিলাম। সারা আকাশ জুড়েই আলোর পসরা সাজিয়ে বসেছে তারার দল। কোথায় পাবো এমন আকাশ? দূরে কোথাও আযান হচ্ছিলো। সুন্দরবনের কোন গহীনে দু/চার ঘর মিলে হয়তো গড়ে উঠেছে কোন মহল্লা। তারই কোন মসজিদে শোনা যাচ্ছে আযান। একসময় পুব আকাশ আভাস দিলো সূর্যোদয়ের। একটা দুটো ওরিয়ল মিঠে গলায় ডাক শুরু করেছে কেবল। ক্ষণিক নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে দিয়ে জলের খুব নীচু দিয়ে একঝাঁক জিরিয়া ফড়ফড় করে উড়ে গেলো। এর কিছুক্ষণ পরই একদল টিয়া ছোট্ট সবুজ মেঘের মতন একজোট হয়ে উড়াল দিলো পূবে। প্রভাতের আকাশে নানান রঙে কোথায় যেন মিশে দিকচক্রবালে হারিয়ে গেলো সব।

অলসতা করে অপচনশীল দ্রব্য যত্রতত্র ফেলে পরিবেশ ও প্রকৃতি নষ্ট করবেন না। বাংলাদেশে বনভূমির পরিমান মাত্র ৬.২৫ শতাংশ (আদর্শ মান ২৫ শতাংশ), সেটাও যদি আমরা নষ্ট করে ফেলি!!!!

source: Razib Ahmed‎<Travelers of Bangladesh (ToB)

 

13 Apr 2019

অনেক দিন থেকেই আম্মুকে নিয়ে কোথাও যাবো চিন্তা করছিলাম। প্রায় ২ মাস চিন্তা ভাবনা করেছি, বিভিন্ন ব্লগ পরেছি, টিওবি তে সিমলা মানালি নিয়ে লিখা গুলো পরেছি। অনেক চিন্তা ভাবনার পর ঢাকা- দিল্লির প্লেন টিকেট করে ফেল্লাম। কোথাও যাওয়ার ১ মাস আগে টিকেট করে ফেললে দাম আসলেই অনেক কম পরে। যদিও ভিসা হবে নাকি এইটা নিয়ে ১ টা টেনশন থেকে যায়। যাই হোক, বেশি কথা না বারিয়ে আসল কথায় চলে আসি। যেহেতু ২১-২৩ তারিখ পর্যন্ত ইন্ডিয়া তে হলি উৎসব চলে, আমি সেই সময়টুকু এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম, কারন ঐ সময় সব কিছু বন্ধ থাকে। কোনও যাত্রা শুরুর আগে আপনার কিছু জিনিষ দেশ থেকে শেষ করে যাওয়া উচিত।

১। প্লেন টিকেট, ভিসা।
২। যে হোটেল এ থাকবেন সেটা বুক করে নিবেন আগে থেকে, তাহলে ঝামেলা কম হবে। আমি যেহেতু আম্মু আর ভাই নিয়ে গিয়েছিলাম, এইসব আগে থেকেই করে নিয়েছি।
৩। এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশ এ গেলে বাস এর টিকেট পারলে বাংলাদেশ থেকে বুক করে যাবেন। (আমি ‘ঘুরে আসি” নামক ১ টি গ্রুপ থেকে টিকেট নেই)।
৪। ছোট ১ টা ব্যাগ রাখবেন ময়লা রাখার জন্য, আমি যেকোনো জায়গায় গেলেই সেটা কাছে রাখি। ব্যাগ এর ১ টা কর্নারে রেখে দিবেন। খুব কষ্টের কিছুনা। ময়লা গুলা সেখানে রেখে পরে কোন ডাস্টবিনে ফেলে দিবেন।

দিল্লি যাত্রা ঃ
দিল্লির উল্লেখযোগ্য জায়গা গুলো দেখার জন্য ২দিন হাতে রাখতে পারেন। আপনার ২দিন এইভাবে ভাগ করে নিতে পারেন, ১। পুরানো দিল্লি ২। নতুন দিল্লি।
আমি প্রথমদিন পুরানো দিল্লিতে ছিলাম। কোলকাতা থেকে ফ্লাইট এ দিল্লিতে পৌছাতে সময় লাগে ২ ঘণ্টা। দিল্লিতে পৌছাতে আমাদের রাত ১২ঃ৩০ বেজে যায়। আমরা হোটেল থেকে পিকআপ নিয়েছিলাম। কারন, এত রাত এ ঝামেলা করতে চাইনি। হোটেল এ পৌছাতে আমাদের ২ টার মত বেজে যায়। হোটেল এ পৌঁছে কিছু খেয়ে আমরা ঘুমিয়ে যাই। সকাল এ উঠে আমরা ৯টার মধ্যে বের হয়ে যাই। সকাল এ বের হয়ে থমকে যাই। মনে হল পুরান ঢাকা চলে আসছি। পাহারগঞ্জ এর রাস্তা গুলোতে অনেক কোলাহল। চিপা রাস্তা, দোকানপাট, রাস্তার দোকান, অটো, সব মিলিয়ে আজব অবস্থা। পুরান দিল্লিতেই আপনি অনেক বিদেশি দেখতে পারবেন। আমরা যেই দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত, তারা সেটাই সময় নিয়ে দেখতে আসে পুরান দিল্লি তে। যাই হোক, আমার মা সকাল সকাল আঙ্গুর কিনে নেয় অনেক গুলা। সেই আঙ্গুর নিয়ে আমরা ১ টা অটো ভাড়া করলাম। ১ টা কথা বলে নেই, দিল্লি তে কখনই ১টা গাড়ি ভাড়া করে ঘুরবেন না, এইটা বোকামি। অনেক বেশি ভাড়া পরবে, আর অনেক কিছুই আপনি দেখতে পারবেন না। আর ফোন এ OLA, UBER অ্যাপ থাকলে ভাড়া টা চেক করে নিতে পারবেন।

যাই হোক, চলে গেলাম “ দিল্লি জামা মসজিদ “ এ। অসাধারণ ১টা জায়গা। যত সকাল এ যাবেন, মানুষ তত কম থাকবে। আমার আম্মু জামা মসজিদ এ নামাজ পরে নিল, কারন আম্মুর অনেক ইচ্ছা ছিল আগে থেকেই। জামে মসজিদ এ আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে পারবেন, কারণ জায়গাটা এতই শান্তিপূর্ণ। ৫০ রুপী দিয়ে আপনি ছাদে উঠতে পারবেন, আর আরও ১০ রূপি দিয়ে মিনারএ। উঠতে কিছুটা সময় লাগে, কিন্তু মিনার এ উঠলে আপনি পুরো দিল্লির ১টা সুন্দর ভিউ পেয়ে যাবেন। আমাদের জামে মসজিদ এই অনেক সময় কেটে যায়, কারন আমরা তারাহুরা করতে চাইনি।মিনার থেকেই দেখলাম যে নিচে অনেক ভিড় হয়ে আছে, সুনলাম সেটাই “মিনা বাজার”। তাই বের হয়েই গেলাম বিখ্যাত “ মিনা বাজার/ চোর বাজার” দেখতে।এটাকে “Sunday market” বলে। রবিবার এ মিনা বাজার এ আলাদা রকম ভিড় দেখা যায়। যদিও আহামরি কিছুই নাই। সব ই সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিষ। আমরা মিনা বাজার দেখে “লাল কিলা” দেখতে গেলাম। কিন্তু বাইরে লাইন দেখে বের হয়ে এলাম। এসব জায়গায় আসলে সকাল সকাল যেতে হয়। বের হয়ে এসে কিছুক্ষণ ঘুরলাম “চাঁদনি চক” এ।

মার্কেটটি মূলত বিয়ের শপিং এর জন্য বেস্ট। অনেক কম দাম এ অনেক ভাল কিছু পারবেন। চাঁদনি চক দেখে আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেল, লাল কিলা পাশে থাকায় আমরা লাল কিলা দেখতে গেলাম, কিন্তু বিশাল লাইন দেখে বের হয়ে আসলাম। লাল কিলা এবং মিনা বাজার এর আশে পাশে অনেক খাবার দোকান আছে, ছোট ছোট ভ্যান আছে যারা ফল (আনারস,পেপে, পেয়ারা) নিয়ে দাড়িয়ে থাকে। সেগুলো খেয়ে দেখতে পারেন। এরপর অটো ভাড়া করলাম কুতুব মিনার এর জন্য। কুতুব মিনার এ যেয়ে দেখি একই অবস্থা। বিশাল লাইন… তাই আর না দাড়িয়ে থেকে চলে গেলাম বিখ্যাত সারোজিনি মার্কেট এ । মার্কেট টা দেখার মত। মেয়েদের জন্য আমি বলবো বেস্ট। অনেক কম দাম এ অনেক কিছু কিনা যায় (জুতা, জিন্‌স, টপ, কানের দুল, গলার মালা, ব্যাগ আরও হাবিজাবি)। যাই হোক, রাত এ আমাদের সিমলার জন্য বাস থাকায় আমরা তাড়াতাড়ি হোটেল এ চলে যাই।

হোটেলে দুপুরে খেয়ে ব্যাগ হোটেল এর লবিতে রেখে আবার বের হলাম। হটাত মনে হল, এই অল্প সময়ে কোথায় কোথায় জাউয়া যায়। তারপর মাথায় আসলো “নিজামুদ্দিন দারগাহ”, অটো ভাড়া করে চলে গেলাম দরগাহর রাস্তার সামনে। রাস্তাটাতে অনেক বেশি ভিড়। রাস্তার আসে পাশে দোকানে ভরা, সবাই বার বার বলছে জুতা খুলে হেটে জেতে। সামনে নাকি আর জুতা রাখার জায়গা নেই। আর বলল ফুল অথবা চাদর (যেটা মাজার এর উপর দেয়) কিনে নিতে। যাই হোক, আমি বলে দিয়েছি কিছুই কিনব না।মানুষ গুলা খুবই বিরক্তিকর। আমরা জুতা রেখে হাটা শুরু করি (এইটা রাখাতে টাকা নেয় নি)। তারপর প্রায় আধা ঘণ্টা এই খালি পায়ে হাটতে হয়েছে, খুব বেশি বিরক্ত লাগছিল যখন দেখি মাজার এর একদম সামনে ই জুতা রাখার জায়গা আছে। যাই হোক, মাজারে ঢুকে আমার চোখের সামনে আমির খান এর মুভি “PK” র সিন গুলা ভেসে আসছিল। যেই ফুল আর চাদর গুলা মানুষ ওইখানে দিচ্ছে, সেগুলা নিয়ে আবার দোকানে বিক্রি করছে। মানুষ টাকার জন্য এইদিকে ওইদিকে চেয়ে বেড়াচ্ছে। যাই হোক, বেশি সময় ওইখানে থাকি নাই। বের হয়ে আবার অটো নিয়ে “ ইন্ডিয়া গেট” দেখতে গেলাম। ছুটির দিন হউয়াতে অনেক মানুষ ছিল। কিন্তু খারাপ লাগবে না। পাশে ১ টা মিউজিয়াম আছে, ওইটাও দেখতে পারেন। তারপর আবার হোটেলে চলে আসলাম। সন্ধ্যায় পাহারগঞ্জ এর রাস্তায় ১ টা কাবাব খাই। এখন ও আমার মুখে স্বাদ লেগে আছে (নাম ভুলে গিয়েছি)। তারপর অপেক্ষার পালা বাস এর জন্য… রাত ১০ টায় মঞ্জু কি টিলা থেকে আমাদের বাস ছাড়ে…
*** মানালি থেকে ফিরে ও আমরা দিল্লি তে ২দিন থাকি, সেটার বর্ণনা একদম শেষে আবার দিব।।।।
প্লেন ফেয়ারঃ ঢাকা-কলকাতা- দিল্লি ( ১৬০০০ টাকা- রিটার্ন টিকেট)
দিল্লি এয়ারপোর্ট – পাহারগঞ্জঃ ৬০০ রূপী।
হোটেলঃ ১ রাত ১৫০০ রুপী।
বাস (দিল্লি-সিমলা)ঃ ৩৭৫০ টাকা (৩জন)

Source: Al Fariha Arpa <Travelers of Bangladesh (ToB)