Archives

সাধারণ প্রশ্ন উত্তর (FAQ)

24 Oct 2019

একটু রাগ, কিছু মান-অভিমান, অল্প ভুল বোঝাবুঝি, এইসব ছাড়া আসলে ভালবাসাটা ঠিক জমে না কেন যেন? যে কারনে একদম মুক্ত হয়ে, অফিস আর বাসা দুই যায়গা থেকেই আন্তরিক ছুটি পাওয়ার কারনেই মনে হয় গ্যাংটক পৌঁছে, হোটেলে চেক ইন করে আমার অদ্ভুত অনুভূতি হতে শুরু করলো। পুরো এমজি মার্গের ঝলমলে সবকিছু, বিশাল হোটেল রুমের ধবধবে বিছানা, প্রকাণ্ড কাঁচের জানালা দিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে জ্বলে থাকা জোনাকির আলোর জ্বলানেভা, গরম পানিতে ফ্রেস হয়ে নতুন কাপড় পরে বের হয়েই আমার ফুরফুরে মনে একটা বিষণ্ণতার ছায়া অনুভব করতে লাগলাম।

খুবই অদ্ভুত একটা অনুভূতি, ভালো লাগছে খুব খুব আবার পরোক্ষনেই মনে হচ্ছে ইস আমার সাথে কি যেন নেই, কি যেন নেই। কোন কিছু একটার অভাব বোধ হচ্ছিল। মোমো কিনলাম ক্ষুধা মেটাতে, মনে হল কেউ যেন আমার কাছে অন্যকিছুর বায়না ধরেছে আমি অনুভব করছি কিন্তু কাজটা করতে পারছিনা। সব সময়ের প্রিয় উডল্যান্ডে ঢুকলাম কিন্তু মনে হল কেউ যেন আমাকে না বলে কোথাও ছুটে চলে যাচ্ছে, যাকে আমার ধরে রাখতে হবে।

চুড়ির দোকানের সামনে দিয়ে যেতে যেতে মনে হল, এক গোছা রঙিন চুরি কিনে ফেলি কারো জন্য। তক্ষুনি মনে হল, কেউ বুঝি শুধু এক জোড়ায় হবেনা বলে জেদ ধরেছে, তার আরও কয়েক ডজন চুরি চাই। সোয়েটার আর শাড়ির দোকানের সামনে দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় মনে হল ধুর এখানে তো ঢোকার কথা ছিল কিন্তু ঢুকলাম না কেন? আর আইসক্রিম যখন কিনতে গেলাম তখন মনে হল আমার তো তিনটা আইসক্রিম কিনতে হবে আমি কেন একটা আইসক্রিম কিনছি?

কিছু বুঝে উঠতে না পেরে আমি আইসক্রিম না কিনে সোজা রুমের দিকে গেলাম আর একটু হেটে হেটে, দোকান গুলো বন্ধ হয়ে আলো নিভে যাওয়ার শুরু হতেই। হোটেলের সামনে যেতে যেতেই বেশ কয়েকটা ফাঁকা বেঞ্চি পেয়ে গেলাম, যেগুলো একটু আগেও ভরা ছিল। একটা ফাঁকা বেঞ্চিতে একটু বসলাম। কিছু সময় বসে থাকার পরে আমার মনে হল, এতোটা নিশ্চিন্তে তো আমার এখানে বসে থাকার কথা নয়। আমার তো এখানে ওখানে ছোটাছুটি করে বেড়ানোর কথা! আর আমার তো এতো ঠাণ্ডা লাগার কথাও না। এই অদ্ভুত মানসিক অবস্থার কারন খুঁজে পেতে হোটেলে ঢুকে গেলাম। রুমে ঢুকে কাঁচের জানালায় চোখে রেখে ভাবছিলাম, কিসের অভাব আমাকে এমন অদ্ভুত মানসিক সংকটে ফেলে দিল? কে বা কারা আমার আশেপাশে থেকেও নেই? কেন এমন মনে হচ্ছে?

মোবাইলটা হাতে নিয়ে ভাইবারে ঢুকলাম। একটু ছেলের আর তার মাকে আমার সিকিম পৌঁছে যাওয়ার খবরটা দিতে হবে। বিশাল নরম তুলতুলে বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে ফোনটার লক খুলতেই মনে হল, আমি আসলে আমার দুরন্ত, দুষ্ট ছেলে আর তার অভিমানী মাকে মিস করছিলাম এতক্ষণ ধরে। ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হল ইস ওরাও যদি এখানে থাকতো তবে কতই না মজা হত। চমৎকার এমজি মার্গে ইচ্ছেমত দৌড়াদৌড়ি করতে পারতো, চিকেন, মোমো আর আইসক্রিম নিয়ে নানা রকম বায়না করতো। ওকে এখান থেকে ওখান থেকে দৌড়ে দৌড়ে আমাকে খুঁজে বের করতে হত। সেই সাথে তার মায়ের শাড়ি, চুড়ি আর সোয়েটারের দোকান গুলোতে ঢুঁ মারা কমাতে আমাকে বারবার চোখ রাঙাতে হত।
হ্যাঁ ঠিক, ঠিক এইসব, মা আর ছেলের এসব আমি এতো সময় ধরে মিস করছিলাম। ইস ওরা সাথে থাকলে এই সবকিছু আরও দারুণ ভাবে সময় নিয়ে, মনের মত করে উপভোগ করা যেত। এই রুম, বিশাল কাঁচের জানালায় জ্বলে থাকা পাহাড়ে পাহাড়ে দাড়িয়ে থাকা ঘর বাড়ির আলোকবর্তিকা, মল রোডের জৌলুষ, নানা রকম খাবার, ঝলমলে সব দোকান পাট, মজাদার আইসক্রিম, ঝকঝকে এমজি মার্গের সবুজ কোন একটা গাছের নিচে অথবা কোন একটা রঙিন ফুলের টবের পাশের কোন একটা ফাঁকা বেঞ্চি খুঁজে নিয়ে তিনজনে মিলে বসে পড়তাম অনেক সময়ের জন্য। ছেলেটা মনের সাধ মিটিয়ে ছুটে বেড়াতে পারতো, ওর মা ইচ্ছে মত দোকানে দোকানে ঘুরতে পারতো আর আমি চুপচাপ ওদের পাগলামি দেখতে পারতাম।

কত করে বললাম আমার সাথে আসতে, কিন্তু এলোনা। অথচ ছুটি নিতে পারতো, পাসপোর্ট ভিসা, পোর্ট এড সবকিছু করাই আছে তবুও শুধু ছেলের পড়াশোনা আর ভর্তির জন্য ওরা আটকে গেল। মনে মনে ঠিক করলাম, নাহ ওদের ছাড়া এতো সুন্দর যায়গা, এতো সহজ আর এতো আয়েশি কিছু একা একা কিছুতেই উপভোগ করতে পারছিনা। কি দারুণ একটা ঘুম দেয়া যেত, খেয়েদেয়ে তিনজনে মিলে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা পরিবেশে তুলতুলে লেপের ভিতরে। ইস হলনা, হলনা। কিন্তু নাহ আমি একা একা আর এতো সুন্দর কিছু কিছুতেই উপভোগ করতে পারবোনা। ওদেরকে নিয়ে একসাথে তিনজনে মিলে আমি গ্যাংটক, সিকিম আর সিকিমের সবকিছু উপভোগ করতে চাই।
ঠিক করলাম কালকে সকালে একটু গ্যাংটক শহরে হেটে হেটে দেখে, দুপুরের দিকে শিলিগুড়ি চলে যাবো। একা একা আমার ভালো লাগছেনা, ওদেরকে খুব খুব আর খুব মিস করছি। সেই ভাবনা মোবাইলে ওদের সাথে কথা বলার জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম আর মাঝে মাঝে ফেসবুকে চ্যাঁটিং। এরই মানে এক বড় আপার সাথে আমার মনের সেই সময়ের অবস্থা শেয়ার করার পরে তিনি পরামর্শ দিলেন।

গেলেনই যেহেতু আর কালকেই চলে আসতে চাইলে সরাসরি শিলিগুড়ি না ফিরে পেলিং হয়ে ফিরতে পারেন। খুব সকালে বের হলেই সম্ভব। আপার পরামর্শ মত তাই ঠিক করলাম। কালকেই শিলিগুড়ি ফিরে যাবো, তবে একটু পেলিং হয়ে…
কিন্তু কে জানতো স্বাধীনতা ভালোবাসা আমি কবে থেকে পরাধীনতাকেও ভালোবাসতে শুরু করেছি একটু একটু করে? কে জানতো অবাধ্য আমিও কবে এতোসব মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে গেছি নিজের অজান্তেই? আর কেইবা অনুভব করতে পেরেছিল, মান-অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝির বেড়াজালে নিজেকে কবে থেকে নিজেই জড়িয়ে ফেলেছি!
আর কেইবা কল্পনা করেছিল, যে পেলিং আমার জন্য এতো এতো আর এতো কিছু এমনভাবে সাজিয়ে আর নিজেও সেজে থেকে অপেক্ষা করছে…
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য হওয়া উচিৎ।

Source: Sajol Zahid<Travelers of Bangladesh (ToB)

 

21 Sep 2019

বসনিয়ার রাজধানী Sarajevo (সারায়েভো) থেকে যখন ফ্লেক্সি বাসে উঠি ঘড়িতে সময় তখন বিকাল ৪ টা।।। বিকাল না বলে দুপুর বলাই ভালো কারন জুলাই আগস্ট মাসে সূর্য ডোবে সাড়ে নয়টায়।।। সামনে লম্বা ১৫ ঘন্টার বাস জার্নি, গন্তব্য স্লোভেনিয়ার রাজধানী Ljubljana (লুবিয়ানা)।। স্লোভেনিয়া ইউরোপে আমার ষোলতম দেশ।। লম্বা বাস জার্নি হলেও ভাবলাম যে কিনা নন এসি বাসে চট্টগ্রাম-বরিশাল, বগুড়া বরিশাল, সিলেট বরিশাল কিনবা রংপুর বরিশাল এর মত লম্বা জার্নিতে অভ্যস্ত তার জন্য এইটা কিছুই না।।। বাসে পাশে বসলো এক মধ্যবয়সী মহিলা, ইংলিশ কিছুই বুঝে না।।৷ সারা পথ তাই কানে হেডফোন লাগিয়েই কাটাতে হলো।।।

বসনিয়া-স্লোভেনিয়া বর্ডার ক্রসের সময় পরলাম বিপদে।।। বসনিয়া সেনজেনভুক্ত দেশ না।। ক্রোয়েশিয়া থেকে বসনিয়া ঢোকার সময় ভুলে বসনিয়ান ইমিগ্রেশন পাসপোর্টে সিল মারে নাই।।। এখন বসনিয়া থেকে বের হওয়ার সময় সিল না দেখে ইমিগ্রেশন পুলিশ গেলো কনফিউজড হয়ে।৷ আরো চার পাচ জন পুলিশ ডেকে নিয়ে আসলো৷। মিনিট পনের নিজেরা গবেষণার পর ছাড়লো আমাকে।। একা একা থাকায় একটু ভয় ভয় করছিলো, শেষেমেশ ছেড়ে দেয়ায় মনে হলো হাফ ছেড়ে বাচলাম।।

রাত এগারোটার দিকে ড্রাইভারকে বললাম ডিনারের জন্য থামাতে।। হাইওয়ের পাশে একটা রেস্টুরেন্টে চিকেন স্টেক খেলাম।।। অনেক ক্ষুধার কারনেই কিনা জানি না, অমৃত মনে হলো।। ইউরোপের বেশিরভাগ লংরুটের বাসস্ট্যান্ড গুলো অসাধারণ৷।বাসস্ট্যান্ডগুলোতে টিকিট স্ক্যান না করে ঢোকা যাবে না।। অর্থাৎ ফ্রড কিংবা আজাইরা লোকজনের আনাগোনা নাই।।।

দেশে থাকতে নন এসি বাসেই আমি বাস ছাড়ার দশ মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পরতাম।। আর এর আরামদায়ক বাসে তো কথাই নাই, সারা রাত ঘুমিয়েই পার হলো।। ভোর সাড়ে পাচটায় লুবিয়ানা বাস স্টেশনে নেমে গেলাম।। বাস স্টেশনের সাথেই ট্রেন স্টেশন।। ভেবেছিলাম ট্রেন স্টেশনে আর্লি ব্রেকফাস্ট করে নিবো কিন্তু স্টেশনমার্কেট ছয়টার আগে খুলবেই না।।। শহর কখনোই টানে না আমাকে, লুবিয়ানায় তাই স্টে করবো না বলে ঠিক করলাম।।। স্লোভেনিয়ার উইশ লিস্টে ছিল সোল্কান ব্রীজ আর লেক ব্লেড।।। লেক ব্লেডেই যাবো ঠিক করে সকালের প্রথম ট্রেনে উঠে পড়লাম।।

লেকের কাছেই আমার হোস্টেল।। লুবিয়ানা থেকে ট্রেন যায় Jesenice স্টেশন পর্যন্ত।। পথে Lesce Bled স্টেশনে নামলে বাসে করে সরাসরি আমার হোস্টেলের কাছাকাছি যাওয়া যায়, কিন্তু ভুলে আমি Jesenice চলে যাই।। Jesenice থেকে অন্য ট্রেনে Bled Jezero. যাওয়াতে অবশ্য ভালোই হয়েছে।। সকালে একেবারে নিস্তব্ধ পরিবেশে Bled Jezeroস্টেশন থেকে হোস্টেল পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার গ্রামের রাস্তায় মর্নিং ওয়াক করতে করতে এসেছি।।। পুরো এক মাসের ট্রিপে আমার লাগেজ একটা ব্যাগপ্যাক৷।। নয় কেজি ওজন।।। এই ওজন নিয়ে হাটার অভ্যাস আছে।।।

হোস্টেলের চেক ইন দুপুর এগারোটায়।। এই চার পাচ ঘন্টা কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না।। একটা সুপারশপ খোলা পেয়ে প্রথমেই এককাপ কফি খেয়ে চাংগা হয়ে নিলাম।। হোস্টেলে ঢুকে দেখি ঘুম থেকেই উঠে নাই কেউ।। মোবাইল, পাওয়ার ব্যাংক, ড্রোনের ব্যাটারী চার্জে দিয়ে গোসল সহ ফ্রেশ হয়ে নিলাম।।। ডে প্যাকে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে আর ব্যাকপ্যাকটা রেখেই লেকের পাড়ে চলে এলাম, উদ্দেশ্য ব্রেকফাস্ট করে লেকের চারিপাশ চক্কর মারা।।। বিধি বাম, এগারোটার আগে কোন দোকানই খুলবে না, অগত্যা সুপারশপ থেকে কলা ব্রেড দিয়েই ব্রেকফাস্ট করে নিলাম।।

লেকের চারিপাশ একচক্কর পাচ/ ছয় কিলোমিটারের কম হবে না।।। যারা বরিশালের দূর্গাসাগর গিয়েছেন তারা বুঝতে পারবেন।।। লেকের মাঝে একটা ছোট্ট দ্বীপ, দ্বীপে একটা চার্চ।। তবে দূর্গাসাগরের মত এত অপরিস্কার এবং রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে পচে যাওয়া যায়গা না।।। টলটলে স্বচ্ছ পানি দেখলেই ঝাপ দিতে ইচ্ছা করে।। লেকের চারপাশে এন্টিক্লোকওয়াইজ তিন ভাগের এক ভাগ চক্কর দিলেই Ojstrica পাহাড়ে ওঠার পথ পাওয়া যায়।।। ওইখান থেকে মাঝের দ্বীপ সহ সুন্দর একটা ভিউ পাওয়া যায়।।। কিছু না ভেবেই ওঠা শুরু করলাম।।। দুইটা ভিউ পয়েন্ট আছে।। প্রথমেই দূরেরটা দিয়ে শুরু করলাম।।।

কোন একদিন এক টিভির দোকানের ডিসপ্লেতে রাখা টিভির ওয়ালপেপারে চোখ আটকে গিয়েছিলো।। একটা লেক আর লেকের মাঝে ছোট একটা দ্বীপের ছবি উপর থেকে তোলা।। বাসায় এসে ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটি করে জানলাম জায়গার নাম লেক ব্লেদ।। সেইদিনই ঠিক করেছিল এই ভিউ আমাকে বাস্তবে দেখতে হবে।। পাহাড়ে উঠতে একটু কষ্ট হলেও লেক ব্লেদে গেলে এই ভিউ দেখা মাস্ট।।।

সলো ট্রাভেলিং এর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছবি তোলা।। অন্যান্য ট্রাভেলারদের অনুরোধ করে ছবি তুলতে হয়।। আর বেশিরভাগ লোকেরই ফ্রেমিং সেন্স কিংবা ফটোগ্রাফি সেন্স বিলো স্ট্যান্ডার্ড।। পাহাড় থেকে নিচে নেমে এক বেলজিক মহিলাকে বললাম ছবি তুলে দিতে।৷ তিনিও আবার আমাকে অনুরোধ করলেন তার ছবি তুলে দিতে৷।। মহিলার নাম মারি, স্কুল টিচার।। অনেকক্ষণ গল্প করলো।। উপরের পাহাড়ে উঠাতে পারবে না বলে বন্ধুদের দেখানোর জন্য উপর থেকে তোলা আমার ছবি গুলো নিলো।।৷ ওনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লেকের বাকি দুই ভাগ চক্কর শুরু করলাম।। কিছুদুর যেতেই এক ক্যাফেতে পেলাম ব্লেদের বিখ্যাত ক্রীমকেক।।

নিচে নামতে নামতে টায়ার্ড হয়ে গেলাম।। সারাদিন পেটেও দানাপানি পরেনি।।। কোন কিছু না ভেবে বড় এক বার্গার অর্ডার দিলাম।। বার্গার খেয়ে দেয়ে দিনের আলো নেভার আগেই হোস্টেলে চেক ইন শেষ করে ঘুম।। সারাদিন হাটা, পাহাড়ে ওঠা, আগের সারাদিন সারায়েভোতে হাটা আর সারা রাত জার্নির টায়ার্ডনেসে এক বারের জন্যও ঘুম ভাংলো না রাতে।।।

সকালে তারাতারি উঠে পরলাম।। ভাবছিলাম এত সকালে কেউ উঠবে না আর সেই সুযোগে ভিউপয়েন্ট থেকে সকালের ভিউ একা একা উপভোগ করব।।। ভিউ পয়েন্টে গিয়ে দেখি আমার মত চালাক আরো অনেকেই আছে।।। তবে একবারে একা একা না হলেও মোটামুটি নির্জনে টাইম কাটানো গেলো।।।

রোদ একটু চড়ে বসলেই নিচে নেমে আসলাম।। বেকফাস্টের জন্য দোকান খোলা না পেয়ে আবার সেই কলা ব্রেড কফি দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে লেক চক্করে বের হলাম।।। এবার আর পায়ে হাটার চক্করে না গিয়ে সাইকেল ভাড়া নিলাম।।। লেকে বিভিন্ন জায়গায় নৌকা দেখছি।।। ভাব্লাম একটা ভাড়া নিয়ে লেকের মাঝে দ্বীপটা ঘুরে আসি।। যদিও ৬/৭ ইউরো দিলে যাত্রীবাহি নৌকায় উঠা যায়, কিন্তু এই লেকে নৌকা চালানোর লোভ সামলানো গেলো না।।। একটু পরেই বুঝলাম কি ভুলটাই না করছি আমি।।। বৈঠা বাই এক দিকে নৌকা যায় আর একদিকে।।। বৃত্তাকারে চক্কর খেতে খেতে হাত ব্যাথা হয়ে গেলো কিন্তু দ্বীপে আর পৌছাতে পারলাম না।। মন মেজাজ খারাপ হয়ে পাড়ে ফেরত আসলাম।।

লেকের বিভিন্ন পাশে কাঠের পাটাতনের মত করা।। সুইমিং করতে নামার জন্য আর সুইমিং শেষে রোদ পোহানোর জন্য।। কতক ফ্রী আর কতক ব্যবহার করতে টাকা লাগে।।। ফ্রী এক্টায় গিয়ে জিনিসপত্র রেখে সুইমিং এ নাম্লাম।। কতক্ষণ সুইমিং করি কতক্ষণ কাঠের পাটাতনে স্বল্পবসনা সুন্দ্রীদের মাঝে রৌদ্রস্নান করি।। আইনেস্টাইনের আপেক্ষিকতা সূত্রে কিভাবে যে ঘন্টা তিনেক পার হয়ে গেলো টেরই পেলাম না।।
স্বল্পবসনা সুন্দরীদের মাঝ থেকে যাওয়ার ইচ্ছা না থাক্লেও ক্ষিদা লাগায় উঠতেই হলো।।। লাঞ্চএ কয়েকটা পিজ্জার স্লাইস নিয়ে ভাব্লাম সাইকেল আছে যেহেতু আশেপাশে ঘুরে আসি।।।

জংগলের মাঝে গ্রামের পথ, পাহাড়ের ঢাল, পাহাড়ী ঝর্না পার হয়ে যেতে যতে যে কখন বিকাল হয়ে গেলো টেরও পেলাম না।। পাহাড়ের ডাউনস্লোপে খুব আরামে নাম্লেও ওঠার সময় জিহবা বের হয়ে গেল।।। সাইকেল জমা দিয়ে হোটেলে চলে আসলাম।।
ওয়েদার ফোরকাস্টে দেখলাম আগামীদিন বৃষ্টির সম্ভাবনা শতকরা ৮০ ভাগ।।। চিন্তা করে দেখলাম বৃষ্টির মধ্যে হোস্টেলে বসে এক দিন নষ্ট করার চেয়ে নতুন কোন জায়গায় যাওয়া ভালো।।।
ইউরেইল এ্যাপসএ সার্চ দিয়ে দেখলাম রাত বারোটায় lesce Bled স্টেশন থেকে অস্ট্রিয়ার Innsbruck ট্রেন আছে৷৷ আর ব্লেদ থেকে রাত ১০ টায় Lesce Bled এ লাস্ট বাস।৷। হোস্টেলের পাশের সুপার শপ থেকে সস্তা পিজ্জা দিয়ে ডিনার সারতে সারতেই বৃষ্টি চলে আসল।।।
Lesce Bled স্টেশনে পৌছালাম রাত সাড়ে দশটায়।। ছোট স্টেশন হওয়ায় পুরা স্টেশনে আমি একা যাত্রী আর পাশে একটা বারে তিন জন অর্ধমাতাল।। মনে কিছুটা ভয় নিয়েই দুই ঘন্টা কাটালাম।। এর মধ্যে ঘোষনা শুনলাম ট্রেন আধা ঘন্টা লেইট হবে।। আধা ঘন্টা পর ট্রেন আসলে হাফ ছেড়ে বাচলাম।। সকালে Innsbruck নেমে স্টেশনে লাগেজ লকারে ব্যাকপ্যাক রেখে আরো একবার ট্রেন চেইঞ্জ করে পৌছাতে হবে Hallstatt.
সেই গল্প না হয় আর একদিন হবে।।।

Source: Rafat Limon‎<Travelers of Bangladesh (ToB)

9 Sep 2019

হুমায়ুন আহমেদের কল্যানে তার ভক্তদের কাছে নেত্রকোনা, সুসং দূর্গাপুর, সোমেশ্বরী নদী অতিপরিচিত। কল্পনায় কিংবা বিভিন্ন পোষ্ট দেখে সোমশ্বরী নদী বা বিরিশিরি সম্পর্কে আমরা কম বেশি সবাই জানি। কিন্তু বাস্তবে এটা কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। মেঘালয় রাজ্যের গাড়ো পাহাড় বেষ্টিত সোমেশ্বরী নদী আপনাকে মোহিত করবেই। যারা জাফলং গিয়েছেন অনেকটা তার সাথে সাদৃশ্য খুঁজে পাবেন যদিও এখানে পাথর নাই। জিরো পয়েন্ট থেকে মেঘালয়ের নীল পাহাড় বেষ্টিত সোমেশ্বরীর সৌন্দর্যে ডুবে যাবেন আর ভাববেন এতো চমৎকার জায়গা অথচ এর কোন প্রচার নাই!!!

কি কি দেখলামঃ
আমি আমার স্ত্রী আর বাচ্চাসহ একদিনের ট্যুরে গিযেছিলাম। আমরা চীনামাটির পাহাড়, সবুজ ও নীল পানির দুটি লেক, বিজিবি বাজার, হাজং মাতা রাশি মনি স্মৃতিসৌধ, কমলা বাগান, সৌমশ্বরী নদীতে নৌকা ভ্রমণ করেছি। আরো কিছু স্পট ছিল, কিন্তু সময়ের স্বল্পতায় যেতে পারিনি সেইসব জায়গায়।
প্রথমে গেলাম চীনামাটির পাহাড় ও সবুজ পানির লেক দেখতে। চীনা মাটির পাহাড় ও সবুজ পানির লেক দুটি অদ্ভূত সুন্দর। হাটতে হাটতে ক্লান্ত হবেন আর সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে চার্জড হবেন। একজন গাইড (ছোট বাচ্চা) নিলে ভাল। সে স্বল্প পরিশ্রমে সাইট ভিজিট করাবে। অন্যথায় পাহাড়ী রাস্তায় এলোমেলো হেটে এনার্জি লস করবেন।
এরপর চলে গেলাম বিডিআর ক্যাম্পে। সেখানে অপেক্ষমান সৌন্দর্যের দুয়ার। চমৎকার নদীর ঘাট (বিজিবির তৈরি, তাদের গোসল করার জন্য), ঘাটে রয়েছে বড় ইঞ্জিন চালিত বোট ও ছোট ডিংগি নৌকা। আমরা নিলাম ডিংগি নৌকা কারন ইঞ্জিনের শব্দ ভালো লাগে না। মাঝি নিয়ে যাবে জিরো পয়েন্টের কাছে। সামনেই মেঘালয় বেষ্টিত নীল পাহাড়, দুই পাশে চমৎকার জঙ্গল, উপজাতিদের বসতি। অনেকটা কাপ্তাই লেকের মত তবে নদীর প্রশস্থতা অনেক বেশি। আর মেঘালয়ের পাহাড়ের সৌন্দর্য অপরুপ। দুঃখজনক হলো, এই সৌন্দর্য ক্যামেরায় ধারন সম্ভব নয়। জিরো পয়েন্ট ভূলেও অতিক্রম করা যাবে না কারন সাথেই বিএসএফ ক্যাম্প।

নৌভ্রমণ শেষ করে গেলাম কমলা বাগান। অনেক আগে কমলা বাগান ছিলো, বর্তমানে কোন কমলা গাছ নেই, আছে পাম গাছ। পাহাড়টা মধ্যম উচ্চতার তবে ভালো লেগেছে। যদিও নামকরনটা বিভ্রান্তিকর। আরো কিছু স্পট ছিলো কিন্তু সময়াভাবে দেখা হলো না।

কিভাবে যাবেনঃ
📷আমরা ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল যাই এনা বাসে। সেখানে একরাত ছিলাম। পরের দিন সকালে সিএনজি চালিত অটোরিক্সা রিজার্ভ করলাম সারাদিনের জন্য (ত্রিশাল to দুর্গাপুর (up down), ভাড়া ২৫০০ টাকা)। জার্নিটা ছিল অসাধারন। যারা বিভিন্ন পোষ্টে বিরিশিরির বর্ননা পড়েছেন তাদের ৯৯%-ই বলেছে রাস্তার বেহাল দশার কথা। সুখের বিষয় এই যে, এখন রাস্তা অত্যন্ত ভালো। গাজীপুর চৌরাস্তা হওয়ার পর ময়মনসিংহ হয়ে বিরিশিরি (প্রায় ১৬০ কিমি) পর্যন্ত চমৎকার রাস্তা। দুইপাশে বিস্তৃত সবুজ দেখতে দেখতে কখন যে চলে যাবেন টেরই পাবেন না। পাহাড়ী রাস্তার সাথে তুলনা না করে, শেষ কবে এমন সমতলের সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন এই প্রশ্ন মনে জাগ্রত হতেই পারে। যারা নিজেরা ড্রাইভ করেন, শুধু এই রাস্তাটাই ভ্রমণ করতে পারেন।
ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন, ব্যাক্তিগত গাড়িতে করে চলে যাবেন দূর্গাপুর। সোমেশ্বরী নদী পার হবেন খেয়া ঘাট থেকে। ওপার থেকে অটো, ব্যাটারী চালিত রিক্সা বা বাইক সবগুলো স্পট ঘুরানোর জন্য ভাড়া করে আরাম করে সৌন্দর্য উপভোগ করবেন (সময় লাগবে আনুমানিক ৩ ঘন্টা)। পথে বিভিন্ন ছোট ছোট হোটেল রয়েছে। যেহেতু পর্যটক কম তাই হোটেল গুলো উন্নত মানের না। তবে আমরা যে হোটেলে খেলাম তাদের রান্না বেশ ভালো ছিল।

কেমন খরচ:
ঢাকা টু ময়মনসিংহ (বাস / ট্রেন): ১৫০- ২৫০
ময়মনসিংহ টু র্দূগাপুর (বাস / ট্রেন / সিএনজি): ১০০-৩০০
ঢাকা টু র্দূগাপুর (বাস / ট্রেন ): ৩০০-৫০০
খেয়া পাড়াপাড় : ০৫
রির্জাভ অটো রিক্সা (০৩ সিট): ৩০০-৫০০ সবগুলো স্পট
রির্জাভ অটো (০৭ সিট): ৬০০-১০০০ সবগুলো স্পট
নৌকা: ৫০ টাকা (১টি স্পট), ১০০ টাকা (২টি স্পট) (জনপ্রতি)
দুপুরের খাবার: ১০০-২০০ টাকা।

সতর্কতাঃ
লেক বা নদীতে নামবেন না। অতীতে অনেক দূর্ঘটনার রেকর্ড রয়েছে। ময়মনসিংহ-বিরিশিরি রোডে গাড়ি তুলনামূলক কম চললেও প্রচুর ট্রাক চলে তাই সাবধানে গাড়ি চালাবেন। কপাল খারাপ হলে ট্রাকের কারনে অনেক সময় জ্যামের খপ্পরেও পরতে পারেন। খেয়া পাড়াপাড়ের সময় অনেক যাত্রী, মটর সাইকেল নৌকায় উঠাবে। ভয়ের কিছু নাই, এটাই ঐ স্থানের সিস্টেম। এলাকাবাসীদের ও আদিবাসীদের সম্মান করবেন। যেখানে সেখানে পলিথিন, পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট ফেলবেন না। আপনার সতর্কতা রক্ষা করবে প্রকৃতির সৌন্দর্য।
পরিশেষে একদিনের ট্যুর প্লান যারা করছেন তারা অবশ্যই যাবেন। যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভালো লাগবে।
Source: Mohammad Asaduzzaman‎<Travelers of Bangladesh (ToB)

26 Aug 2019

সোনাদিয়া ৯ বর্গকিমি এলাকার এক অনন্য সুন্দর দ্বীপ যা সাগরকেন্দ্রিক বিভিন্ন জীববৈচিত্র্যের এক আধার। মহেশখালি থেকে এই দ্বীপ একটি খাল দ্বারা বিভক্ত। দ্বীপটিতে দুটি পাড়া, পূর্বপাড়া ও পশ্চিমপাড়া। নৌকা থেকে নেমে আমরা পশ্চিমপাড়ায় যাই যেখানে স্থানীয় জসিম ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে আগে থেকেই আমরা থাকা খাওয়ার ব্যাপারগুলো ঠিক করে নিই। উল্লেখ্য যে, সোনাদিয়া দ্বীপে থাকার বা খাওয়ার কোন হোটেলের ব্যাবস্থা নেই। এখানে থাকতে ও খেতে হলে একমাত্র স্থানীয় মানুষদের সাথে আগে থেকে বন্দোবস্ত করে নিয়েই থাকা যায়। স্থানীয় জসিম ভাইয়ের কন্টাক্ট আমরা টিওবি থেকেই সংগ্রহ করেছিলাম। খুবই অমায়িক ও অতিথিপরায়ন জসিম ভাই আমাদের জন্য খুব সুন্দর ও অল্প খরচে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। দ্বীপে পা দেয়ার পরপরই সাইকেল চালিয়ে ও হেঁটে সোজা চলে যাই সমুদ্রপাড়ে।

সোনাদিয়া ভ্রমণের আগে আমার দেখা দেশের সেরা সমুদসৈকত ছিল কুতুবদিয়া সৈকত, কিন্তু জনমানবশুন্য ও আবর্জনাবিহীন সোনাদিয়া সমুদ্র সৈকত দেখে কুতুবদিয়াকে টপকে সোনাদিয়াকেই উপরে রাখতে বাধ্য হলাম। নির্জন সৈকতের ঢেউয়ের শব্দ আর ঝাউবনের শনশন শব্দের এক অদ্ভুত মাদকতায় কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে গেল কেউ টেরই পাইনি। জসিম ভাইয়ের ছিমছাম শান্ত বাড়ীতে গিয়ে টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানিতে গোসল করে ধোঁয়া উঠা ভাতের সাথে ডাল, আলুভর্তা আর মুরগীর মাংস দেখে পেটের চরম ক্ষুধার কথা সবার মনে পরে গেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগে কয়েক বাড়ী পাশেই ছোট এক দোকানে চা খেয়েই ছুটলাম খালের পাড়ের দিগন্ত বিস্তৃত সবুজেঘেরা মাঠের উদ্দেশ্যে। পড়ন্ত বিকেলে ঘাসের চাদরে বসে শুরু হল ডাবের সুমিষ্ট পানিপান।

কপাল ভাল থাকলে যা হয় আর কি, বোনাস হিসেবে পেয়ে গেলাম পূর্ণ চাঁদের আলো। সন্ধ্যা থেকে রাত প্রায় সাড়ে ৯ টা পর্যন্ত সৈকতে বসে নিজেদেরকে চাঁদের শুভ্র আলোতে স্নান করানোর সুযোগ কি আর মিস করা যায়। বর্ষার সময় বলেই তাঁবুবাস ও বারবিকিউ এর ইচ্ছা মাথা থেকে বাদ দিয়েছিলাম, নয়তো তাঁবুবাসেরও ভাল ব্যবস্থা আছে। জসিম ভাই সে ব্যবস্থাও করে দিতে পারেন। শহরের ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে দূরে, বৈদ্যুতিক আলো ও বাতাসের কৃত্রিমতা ফেলে প্রকৃতির খুব কাছে থেকে নিজেকে ও জীবনকে উপভোগ করার জন্য দারুন এক জায়গা সোনাদিয়া দ্বীপ। শীতের সময় আরো একবার যাওয়ার ইচ্ছা মনে পুষে রেখে পরদিন খুব ভোরে সূর্যোদয় দেখে ও গরম গরম খিচুড়ি খেয়ে আবার নৌকায় চেপে চলে বসলাম মহেশখালির উদ্দেশ্যে।

ভ্রমণসহায়ক কিছু তথ্যঃ
১) সোনাদিয়া দ্বীপে ইলেক্ট্রিসিটি নেই তাই মোবাইল চার্জের জন্য পাওয়ার ব্যাংক নেয়া আবশ্যক। নেটওয়ার্ক ৩জি পর্যন্ত পাওয়া যায়।
২) মহেশখালি ঘটিভাংগা ঘাট থেকে প্রতি সকালে জোয়ারের সময় (সকাল ১০-১১ টার দিকে) সোনাদিয়ার উদ্দেশ্যে বোট ছাড়ে, ভাড়া ৩০ টাকা প্রতিজন। আমাদের মত সাইকেলসহ পাড় হলে অবশ্য কিছু বাড়তি দিতে হবে, আমরা সাইকেল প্রতি ৩০ টাকা করে দিয়েছিলাম।
৩) সোনাদিয়ায় থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা একমাত্র স্থানীয়দের বাড়িতেই সম্ভব। তাই যাওয়ার আগে অবশ্যই যোগাযোগ করে সব বন্দোবস্ত করে যাবেন। টিওবিতে সোনাদিয়া দ্বীপ সার্চ করলেই কয়েকজনের কন্টাক্ট পেয়ে যাবেন। আমরা যোগাযোগ করেছিলাম জসিম ভাইয়ের সাথে, খুবই ভদ্র, সাহায্যকারী ও সোজা কথার মানুষ তিনি। উনার মোবাইল নাম্বারঃ ০১৮১৭৭০০২১২
৪) যেখানেই থাকেন না কেন পুরোটাই গ্রাম, তাই এমন কোন কিছু করা থেকে বিরত থাকবেন যা দেখে স্থানীয় মানুষজন বিরক্ত হয়। সবাই খুবই আন্তরিক ও সহজ সরল।
৫) আমরা চট্টগ্রাম থেকে সাইকেলে গিয়েছিলাম। যারা গাড়ীতে যেতে ইচ্ছুক তারা চট্টগ্রাম নতুন কর্ণফুলী সেতুর মোড় থেকে সানলাইন নামক গাড়ীতে সরাসরি বদরখালি জনতা বাজার পর্যন্ত যেতে পারবেন, ভাড়া পরবে ২২০ টাকা। জনতা বাজার থেকে সরাসরি সিএনজিতে চড়ে চলে যেতে পারেন আদিনাথ সড়ক বা গোরকঘাটা বাজারে (ভাড়া ১০০) যেখানে স্থানীয় হোটেলে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে রওয়ানা দিতে পারেন ৬-৭ কিমি দুরের ঘটিভাংগা ঘাটের উদ্দেশ্যে। আমরা আদিনাথ সড়কের হোটেল গ্রীন প্যালেসে উঠেছিলাম। দুইটি ডাবল বেড (৪ জন) নিয়ে এক রুমের ভাড়া পরেছিল ৫০০ টাকা, এক রাতের জন্য।
৬) সোনাদিয়ায় জসিম ভাইয়ের বাড়ীতে একরাত থাকা ও তিন বেলা খাবারের জন্য দিতে হয়েছিল জনপ্রতি ৬০০ টাকা করে। দুপুর ও রাতের মেনু ছিল ভাত, আলুভর্তা ও মুরগী আর সকালে ছিল গরম খিচুড়ির সাথে ডিমভাজা।

বিশেষ জ্ঞাতার্থেঃ
১) সোনাদিয়া দ্বীপটিতে ভ্রমণপিয়াসীদের ভীড় নেই বললেই চলে যে কারনে মানুষসৃষ্ট ময়লা আবর্জনাও নেই। দ্বীপে ভ্রমণকালে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলে অন্যান্য সমুদ্র সৈকতগুলোর মত এই সমুদ্র সৈকতটিকেও নোংরা করা থেকে সবাই বিরত থাকব।
২) এই দ্বীপে সমুদ্রের পানিতে গোসল করতে নামলে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত কারন কোন অঘটন ঘটলে সাথে সাথেই সাহায্য পৌঁছানো অসম্ভব কারন সৈকতে জনমানুষের আনাগোনা খুবই কম।
৩) যদিও এই দ্বীপে অবস্থানকালে কোন ট্রাভেলার এখনো পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনার সন্মুখীন হননি। তবে একটু দূরে বা নির্জনস্থানের দিকে কৌতহলবশত যদি যেতেই হয় তবে অবশ্যই স্থানীয় কোন ব্যাক্তির পরামর্শ নিয়ে গেলেই ভাল হয়।
৪) এই দ্বীপটিতে একটি কচ্ছপ প্রজননকেন্দ্র রয়েছে। তাই সৈকতে অবস্থানকালে একটু সাবধানতা অবলম্বন করবেন যেন কোনভাবে আপনার গতিবিধি কচ্ছপের চলাফেরায় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

Source: Shaurav Barua <Travelers of Bangladesh (ToB)

22 Aug 2019

কোন জায়গায় ঘুরতে যাওয়া হচ্ছিল না। তাই বন্ধু যখন বলল চল আমরা রামগতি থেকে ঘুরে আসি। একবার চিন্তা করেই রাজি হয়ে গেলাম। ৭-৮ জন যাওয়ার কথা থাকলেও শেষমেশ আমরা হলাম ৬ জন। সকাল ৮.৩০ লক্ষ্মীপুর থেকে রওনা দিলাম লেগুনায় করে গন্তব্য আলেকজান্ডার মেঘনা বিচ। আপনি চাইলে বাসেও যেতে পারেন। বাস আর লেগুনার ভাড়া সেম ৫০ টাকা। বাসে যেতে সময় লাগে পৌনে ২ ঘন্টা আর লেগুনায় দেড় ঘন্টা এই যা। আলেকজান্ডার নেমে হালকা নাস্তা করে চলে গেলাম মেঘনার পাড়ে। আলেকজান্ডার এই অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। বাঁধের উপরে উঠলেই প্রথমে আপনাকে স্বাগতম জানাবে দমকা হাওয়া তার সাথে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হলে তো আর কথাই নেই। ব্লকের উপর বসে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটিয়ে দিতে পারবেন। সরকার এই স্থানের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে কাজ করছে। বাঁধের পাড়ে ঝাউগাছ লাগানো হয়েছে, বসার জন্য তৈরি করা হয়েছে শেড আর সাথে আছে সোলার লাইট। আগে যেখানে সন্ধ্যার পর ছিনতাইকারীর ভয়ে থাকা যেত না এখন অনায়াসে বসে চাঁদের আলো উপভোগ করা যায়। এনেক বক বক করি ফালাইলাম..

এবার দুপুর ১২ টায় রওনা হলাম রামগতির জন্য, অটো ভাড়া জনপ্রতি ৪৫ টাকা, যদিও আসার সময় ৫০ টাকা দিতে হইছিল। আপনি সিএনজি বা লেগুনায় ও যেতে পারেন লেগুনা ভাড়া ৪০ টাকা। যেতে সময় লাগবে পৌনে এক ঘন্টার মত।

রামগতি গিয়ে আগে পেটপূজা সারলাম ইলিশ দিয়ে, প্রতি পিচ ৭০ টাকা সাথে ভাত দুই প্লেট ২০ টাকা। রামগতি বাজারে এখন গেলে দেখবেন শুধু ইলিশে বাজার সয়লাব আমি চিন্তায় পড়ে গেছিলাম এত মাছ যায় কোথায়। আর নদীর পাড়ে দেখবেন জেলেরা ট্রলার থেকে মাছ নামাচ্ছে। নদীর পাড়ে ব্লকের দিকে না গিয়ে চলে যাবেন জেলে গ্রামের দিকে নদীর পাড় ধরে। রামগতি আলেকজান্ডারের চেয়ে সুন্দর জায়গা, এখানে মানুষের আগমন ও কম। বেড়ি ধরে হাটতে হাটতে ডেড ইন্ডে একটা চায়ের দোকান পাবেন। চা খাবেন আর ফিল নিবেন… কিছু দিন পর দোকানটা আর নাও পেতে পারেন। কারন আস্তে আস্তে নদী এগিয়ে আসছে জনবসতির দিকে আর গ্রাস করছে সবকিছু। ও ওখানে নদীতে গোসল টা সেরে ফেলতে পারেন।

এরপর বেশি দেরি না করে আবার চলে আসবেন রামগতি বাজারে। ওখান থেকে অটো করে চলে যাবেন ট্যাংকির চর। জনপ্রতি ভাড়া ৩৫ টাকা। ঐ জায়গাটাও অনেক সুন্দর যদিও আমরা যেতে পারি নাই। সূর্যাস্তটা ওখনে উপভোগ করেই তাড়াতাড়ি রওনা হয়ে যাবেন। বেশি দেরি করলে পরে গাড়ি পাবেন না। ফিরতি পথে আবার একই ভাবে ফিরে আসবেন।

খরচ-

লক্ষ্মীপুর – আলেকজান্ডার ৫০+৫০= ১০০ টাকা

আলেকজান্ডার – রামগতি ৫০+৫০=১০০ টাকা

রামগতি – ট্যাংকির চর ৩৫+৩৫ =৭০টাকা

খাওয়া খরচ =১০০ টাকা

Source: Asiful Habib‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)

21 Aug 2019

নীল সমুদ্রের বুকে মাথা উঁচু করে আছে বেশ কিছু সবুজ দ্বীপ। প্লেনের জানালা দিয়ে শুধু আকাশ আর মেঘ দেখতে দেখতে যখন একঘেঁয়ে লাগছিলো, তখনই দৃষ্টিসীমা ফুঁড়ে হঠাৎ উদয় হলো সমুদ্রের বুকে ছোট ছোট সবুজাভ নীল কয়েকটা বিন্দু। বেশ লাগছিলো দেখতে। সমুদ্র প্রায় ছুঁয়েই ল্যান্ড করলো প্লেন। এয়ারপোর্টে নেমেই প্রথম চোখে পড়লো দুদিকে সবুজ পাহাড়। ছোট্ট একটা এয়ারপোর্ট। বের হয়েই গরমের প্রথম ধাক্কাটা টের পেলাম। গাঁ জ্বালা করা প্রচন্ড গরম। প্রত্যেকবার কেমন করে জানি গরমের দেশেই আসা হয় আমাদের। এবার এসেছি সেইন্ট থমাস… ইউ এস ভার্জিন আইল্যান্ডসের অন্যতম প্রবেশদ্বার। ক্যারিবীয়ান সাগরগামী ক্রুইজগুলোর অন্যতম গন্তব্য। ইনফ্যাক্ট ক্যারিবীয়ানের ব্যস্ততম ক্রুইজ পোর্ট। পুয়ের্টোরিকোর ঠিক পাশেই।

নিরক্ষীয় অঞ্চলের অপূর্ব সুন্দর সব দ্বীপগুলোর অন্যতম ভার্জিন আইল্যান্ডস। ভার্জিন আইল্যান্ডস কোন একক দ্বীপ না, গ্ৰুপ অব আইল্যান্ডস। ক্যারিবীয়ান সাগরের মধ্যবর্তী তিনটি প্রধান দ্বীপ ও ছোট ছোট আরো কিছু দ্বীপ নিয়ে ইউ এস ভার্জিন আইল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্রের দূর সমুদ্র মধ্যবর্তী শাসন অঞ্চল।

এই তিনটি দ্বীপেরই একটি হলো, সেইন্ট থমাস। বাকি দু’টি সেইন্ট জন ও সেইন্ট ক্রোয়িক্স। আমাদের বাৎসরিক অবকাশের জন্য এবার বেছে নিয়েছি এই ভার্জিন আইল্যান্ডস। এখানে আমাদের ইমিগ্রেশন হবেনা। টেকনিক্যালি আমেরিকার ভিতরেই আমরা আছি। তবে এখান থেকে ফেরত যাবার সময় ইমিগ্রেশন হবে। কারণ সেন্ট থমাস এর পোর্ট হলো ফ্রি পোর্ট। আশেপাশের ক্যারিবীয়ান দ্বীপগুলো থেকে সহজেই এখানে আসা যায়। যাই হোক, আমরা এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে শাটলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমীরার গাল এর মাঝেই লাল হয়ে গিয়েছে। হিট র‍্যাশ। বুঝলাম, মেয়েটা আগামী কয়টা দিন একটু কষ্ট পোহাবে। আমীরা হল আমার দেড় বছর বয়সী অসম্ভব রকমের চঞ্চল আর দুরন্ত কন্যা।

শাটল এলে কার রেন্টালে গিয়ে আমরা আমাদের গাড়ি বুঝে নিলাম। লাল রঙের ছোট্ট একটা সেডান। প্রত্যাশার চেয়ে বেশ ছোট গাড়িটা। তবু সাতপাঁচ ভেবে আপগ্রেড না করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখলাম আমরা। গাড়ি নিয়ে বের হয়ে রওনা হলাম আমাদের আগামী কয়েকদিনের নিবাসের উদ্দেশ্যে। আগে থেকেই জানতাম, এখানে গাড়ির ড্রাইভিং সিট বামদিকে হলেও ড্রাইভ করতে হয় রাস্তার বামদিক দিয়ে। সাধারণত যে কোন দেশে ড্রাইভিং সিট যে পাশে থাকে, ড্রাইভ করতে হয় রাস্তার অপর পাশ দিয়ে। যাই হোক, এটা নিয়ে একটু চিন্তিত ছিলাম, পাভেলো পারবে কিনা। আল্লাহর রহমতে ও ভালোভাবেই উৎরে গেলো। নাহ, ড্রাইভার হিসেবে আমার জন খুব একটা মন্দ না। মোটামুটি পক্ক ও অভিজ্ঞ। কোথাও গেলে বেচারা সবসময় ড্রাইভ করে, আর আমাকে আশেপাশের সৌন্দর্য পুরোমাত্রায় উপভোগের সুযোগ করে দেয়। আমি আবার সিরিয়াস ড্রাইভার। ড্রাইভ করতে বসলে কিছুই দেখতে পারিনা। ডানে বামে ঘাড় ফিরাতেও কষ্ট হয়ে যায়।

ছোট্ট ডাউনটাউনের মাঝ দিয়ে মেরিনার পাশ ঘেঁষে চলে গেছে ওয়াটারপার্ক ফ্রি ওয়ে। যেদিকেই তাকাই চোখে পড়ছে ছোট বড়ো পাহাড়। দেখতে দেখতে হঠাৎ আমরাও পাহাড়ের উপর উঠতে শুরু করলাম। বুঝলাম এই পুরো দ্বীপটাই আসলে পাহাড়ি। এর সব স্থাপনাও পাহাড়ের কোলে কোলে। যেখানেই যাই না কেন, এক দুইটা পাহাড় ডিঙিয়েই যেতে হবে। তেমনি এক পাহাড়ের উপরই আমাদের রিসোর্ট। রিসোর্টে আমাদের ভিলাতে ঢোকার মুখেই একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ লালে লালে রক্তিম হয়ে চেয়ে আছে আমাদের দিকে, ছেয়ে আছে ফুলে ফুলে। অপূর্ব লাগছিলো দেখতে। এক ফ্লোর নিচে মেরিনা ভিউ ছোট্ট একটা স্যুট আমাদের। বেলকনি থেকে পাওয়া যাচ্ছে অপূর্ব মেরিনা ভিউ। রোদে গরমে এর মাঝেই অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই না খেয়েই শুয়ে পড়লাম। উঠতে উঠতে প্রায় বিকেল। এরপর ফ্রেশ হয়ে বের হলাম ডাউন টাউন ভ্রমণে। আজকের পরিকল্পনা হলো এখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখা। কয়েকশো বছর দীর্ঘ ডেনিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাস রয়েছে এই দ্বীপের। ইউ এস ভার্জিন আইল্যান্ডসের দ্বীপগুলো ১৯১৭ সালে আমেরিকা ডেনমার্কের কাছ থেকে কিনে নেয়। এই বছর এই তিনটি দ্বীপের আমেরিকা অন্তর্ভুক্তির শত বছর পূর্তি হলো। পাহাড় থেকে নেমেই প্রথমে পেট পূজার ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়লো। স্থানীয় একটা চাইনিজ ক্যারিবিয়ান ফিউশন রেস্টুরেন্টে গেলাম। কোথাও গেলে হারাম হালালের চক্করে আমাদের খাওয়াটা কখনোই খুব বেশি উপভোগ্য হয়না। সবসময় ভেগান কিংবা সি ফুড নিতে হয়। সি ফুডই অর্ডার করলাম। খেয়ে বের হয়ে দেখি প্রায় অন্ধকার। তখন বাজে সাতটা। পরে চেক করে বুঝলাম, এখানে সন্ধ্যা তাড়াতাড়ি হয়। অথচ আটলান্টায় তখন সূর্যাস্ত হয় রাত নয়টায়। এই ব্যাপারটা খেয়াল করিনি আগে। ধরেই নিয়েছিলাম লোকাল টাইম যেহেতু এক, সূর্যাস্তের সময়ও কাছাকাছিই হবে। আমাদের আর ইতিহাস খোঁজ করতে যাওয়া হলোনা সেদিন। মেয়ের খাবার দাবার সহ কিছু প্রয়োজনীয় শপিং সেরে নিলাম। রিসোর্টে ফিরে আসার পথে পাহাড়ের উপর একটা লুক আউট পয়েন্ট ড্রেকস সিটে গেলাম। ততক্ষণে গাঢ় অন্ধকার ওখানে। সূর্যাস্তের পর পাহাড়ে খুব তাড়াতাড়ি অন্ধকার নেমে আসে। ওখান থেকে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের আলোকিত রাতের রূপ দেখা যায় দূর থেকে। মনে হয় যেন, দূর পাহাড়ের বুকে ধিকি ধিকি জ্বলছে অসংখ্য প্রদীপ। সিম্পলি অসাধারণ!

ভার্জিন আইল্যান্ডসের এই দ্বীপগুলো আসলে না আমেরিকা, না ইউ কে। কিন্তু তাদের দ্বারা শাসিত। এগুলোকে ইন্সুলার এরিয়া বলে। এরকম আরো অনেক দ্বীপ বা দ্বীপপুঞ্জ আছে আটলান্টিক মহাসাগরীয় এলাকায় যেগুলো ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, ইউকে সহ আরো অনেক দেশ দ্বারা দূর দূরান্ত থেকে শাসিত। মূলতঃ এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার তথা আধিপত্য ধরে রাখার জন্যই পশ্চিমা ক্ষমতাশালী দেশগুলো এই দ্বীপগুলোর শাসনের অধিকার ধরে রেখেছে। এই দ্বীপগুলোর অধিবাসীরা নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট পেলেও ভোটাধিকার পায়না। এদেরকে সিটিজেন না বলে ন্যাশনাল বলে। শর্তসাপেক্ষে এরাও পূর্ণ নাগরিকত্ব পেতে পারে। তবে সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রের মেইনল্যান্ডের অধিবাসী হতে হবে। মানে মাইগ্রেট করতে হবে। সত্যি বলতে কি ব্যাপারটা আমার নিজের কাছেও পরিস্কার না।

পরদিন সকাল ৭টায় ঘুম ভাঙলো আমার। অনেক স্নিগ্ধ একটা সকাল। সকালের মেরিনা ভিউ অনেক বেশি অপূর্ব, আরো অনেক রিফ্রেশিং। বেলকনির চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে অনেক আয়েশ করে সকালের কফি খেলাম। এরপর টুকটাক ব্রেকফাস্ট রেডি করলাম। কিচেন থাকার এই এক সুবিধা। বাইরের খাবার মুখে না রুচলে অন্তত কিছু একটা করে খাওয়া যায়। ব্রেকফাস্ট করে রেডি হয়ে বের হয়ে পড়লাম আগের দিনের অসম্পূর্ণ ঐতিহাসিক ভ্রমণ সম্পূর্ণ করতে। খুব বেশি চমকপ্রদ কোন স্থাপত্য নয়। তবে অনেক পুরোনো কিছু স্থাপনা। হয়তো ঐ যুগে এরকম সমুদ্র মধ্যবর্তী কোন দ্বীপে এই অনেক বেশি ছিল। তবে বেশি ভাগই পাহাড়ের উপর। একটা লাল দূর্গ আছে। আর ৯৯টা সিঁড়ি পার হয়ে একটা স্থাপনা আছে ব্ল্যাকবিয়ার্ড ক্যাসল। আমরা যেদিন গিয়েছিলাম, সেদিন বন্ধ ছিল ব্ল্যাকবিয়ার্ড ক্যাসল। মিঃ ব্ল্যাকবিয়ার্ড ছিলেন একজন নামকরা স্প্যানিশ জলদস্যু। বিখ্যাত না কুখ্যাত সেটা বুঝতে পারলাম না। তিনি এটা তৈরী করেন নি। তার স্মরণে ডেনিশ উপনিবেশ যুগে নির্মিত হয় এটা। ডেনিশ উপনিবেশ পূর্ববর্তী যুগে এই দ্বীপগুলো ছিল স্প্যানিশ জলদস্যুদের রমরমা আখড়া। কল্পকাহিনীর জলদস্যু না, একবারে সত্যিকারের দুধর্ষ জলদস্যু! অবশ্য অনেক কল্পকাহিনীও প্রচলিত আছে এদের নিয়ে। ব্লু বিয়ার্ডের কাহিনী তার মাঝে অন্যতম। সে কাহিনী আপাতত এখানে আর পাড়লাম না।

ইতিহাস খুঁজতে খুঁজতে দুপুর হয়ে গেলো। সেইন্ট থমাসের সব বড় বড় অফিসিয়াল ও প্রশাসনিক লোকজনের বাস এখানেই। বেশির ভাগ ঐতিহাসিক ভবনগুলোকে সংরক্ষণ করে তাদের বাসস্থান বানানো হয়েছে। যেহেতু স্থাপনাগুলো সব পাহাড়ের গাঁয়ে, তাই সেখান থেকে অপূর্ব সব মেরিনাভিউ পাওয়া যায়। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে শহর আর পাহাড়ে হেঁটে হেঁটে, বাচ্চার স্ট্রলার ঠেলে ঠেলে সব ঘুরে ফিরে দেখলাম। এরপর খাঁড়ির পাশ ঘেঁষে চলে যাওয়া একটা পায়ে হাঁটা পাকা রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটলাম। খাঁড়ির পাশ ঘেঁষেই খোলা মতন একটা জায়গায় এসে খাওয়া দাওয়া সেরে নিলাম। এরপর রিসোর্টে ফিরে বিশ্রাম করে আবার বের হলাম। পাহাড়ের উপর বারবার উঠতে নামতে গিয়ে খেয়াল করলাম এই দ্বীপে কৃষ্ণচূড়ার আধিক্য। যেদিকেই যাও, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে যেখানে সেখানে এই কৃষ্ণচূড়া। আমি তো ঘোষণাই করে দিলাম, সেন্ট থমাসের জাতীয় ফুল কৃষ্ণচূড়া! দ্বিতীয় হল বাগানবিলাস। এরপর নাম না জানা আরো অসংখ্য ফুল। অযত্নে অবহেলায় বেড়ে ওঠা। প্রথম গেলাম একটা ছোট্ট পাহাড়ি বোটানিক্যাল গার্ডেনে। খুব বেশি মুগ্ধকর কিছু নয়। তবে পাহাড়ি বন জঙ্গলে একা কিছুটা সময় কাটানোর জন্য উপযুক্ত স্থান। গার্ডেনে একটা ইকো সিস্টেম মেনটেইন করা হয়েছে। তাই ওখানে প্রচুর গিরগিটি ও ব্যাঙ আছে। এদের কারণে এখানে কোন মশা নেই। আসলেই তাই। আটলান্টায় আমাদের বাগানেও কয়েকটা ব্যাঙ আর গিরগিটি পোষার চিন্তা এলো তৎক্ষণাৎ। মশার যন্ত্রণায় আমাদের বাগানে নামা কষ্ট হয়ে যায় মাঝেমাঝে।

এরপর গেলাম মাউন্টেন টপে। মাউন্টেন টপ এখানকার টপরেটেড ট্যুরিস্ট স্পট। সেন্ট থমাসের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় এই মাউন্টেন টপ। আর এখান থেকে দেখা দৃশ্য নাকি ক্যারিবীয়ান অঞ্চলের অন্যতম সুন্দর দৃশ্য! আসলেই তাই। প্রথম যখন দেখলাম, মনে হলো এই দৃশ্য কি সত্যি নাকি সিনেমাতে দেখছি! প্রায় ১৫০০ ফুট উপর থেকে দেখা যায় ইউ আকৃতির অপূর্ব নীল এক সমুদ্র সৈকত। দূরে হালকা নীল আকাশ আর ধূসর মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে নীলচে সবুজাভ কিছু দ্বীপ। সবমিলিয়ে কি এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য! আমি শব্দের কারিগর নই। তাই ভাষায় সেই সৌন্দর্যের কিছুই প্রকাশ করতে পারছিনা। উত্তর দিকের সব পাহাড়ের চূড়া থেকে এই সৈকতের খুব অসাধারণ কিছু ভিউ পাওয়া যায়। শুধু তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা হয়। দূরের দ্বীপগুলো ছিল ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও অন্যান্য ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস।

বানানা ডাইকুরি নামের একটা বার কাম স্যুভেনির শপ এই স্পটের হোস্ট। বানানা ডাইকুরি হলো কলা মিশ্রিত এক প্রকার রাম যা এখানকার খুব জনপ্রিয় আইটেম। স্যুভেনির শপটা বেশ বড়। টুকটাক কেনাকাটা করে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে আসলাম। এরপরের গন্তব্য ছিল উপর থেকে দেখা সেই অপূর্ব নীল সৈকত মেগান্স বে!

মেগান্স বে, ক্যারিবীয়ান অঞ্চলের টপ রেটেড ও জনপ্রিয় সৈকতগুলোর মধ্যে অন্যতম। সেইন্ট থমাসের উত্তর উপকূলে দুইটা পাহাড়ের মাঝে এক মাইল দীর্ঘ ছোট্ট একটা সৈকত। ক্রুইজ শিপ যেদিন আসে, সেদিন লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় এই সৈকত। ভাগ্যিস আমরা যেদিন গিয়েছিলাম, সেদিন কোন ক্রুইজ শিপ আসেনি। তাই খুব আয়েশ করে উপভোগ করতে পেরেছি এর নির্মল সৌন্দর্য। কোন উত্তাল ঢেউ নেই। কোন ভীড় নেই। শান্ত ঢেউ আর অগভীর পরিষ্কার নীল জল। পা ভিজিয়ে হেঁটেছি বেশ কিছুক্ষণ। বালুকাবেলায় বসে নিরিবিলি কাটিয়েছি আরো কিছুটা সময়।

এর মধ্যেই আমার ছোট্ট মেয়েটা একটু অসুস্থ হয়ে পড়ে প্রচন্ড গরমে। এতো ভালোলাগার মধ্যে সমস্যা শুধু এটাই। তা হলো এই গরম। তাই সেদিনের পাততাড়ি গুটিয়ে আমরা রিসোর্টে ফিরে গেলাম। এমনিতেই আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হবে। পরের দিন পার্শ্ববর্তী দ্বীপ সেইন্ট জনে যাবো আমরা ডে ট্রিপে। সকাল সকাল এই দ্বীপের অপর প্রান্তে গিয়ে ধরতে হবে ফেরি।

চলবে…

বিঃদ্রঃ ভ্রমণ সংক্রান্ত খরচাপাতি আমি সেভাবে হিসাব করিনা। আর বাজেট ট্রিপ না বলে তেমন স্বস্তিও বোধ করিনা পাইপাই হিসাব দিতে। নিছক আমার দেখা ও অভিজ্ঞতা শেয়ারের জন্যই এই লেখা। তাও প্রায় দুই বছর আগে লিখেছিলাম। এখানে যা কিছু লেখা, সব দুই বছর আগের ঘটনা।

চাহিদা ও বাজেট মতো ফ্লাইট, হোটেল, রিজোর্ট সব আজকাল অনলাইনেই বুক করা সম্ভব। কারো তবু কিছু জানার থাকলে আমাকে ইনবক্স করতে পারেন। শুধু এটুকু বলবো, ভার্জিন আইল্যান্ডস ভ্রমণের জন্য বেশ ব্যয়বহুল একটা গন্তব্য। আমার ভ্রমণ রুট ছিল Atlanta, USA থেকে Saint Thomas, USVI (United States Virgin Islands)। আশেপাশের ক্যারিবীয়ান দ্বীপগুলো থেকেও সহজে আসা যায় এখানে। আরো রুট থাকতে পারে আপনার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে। তবে US ভিসা লাগবে।

শুধু ঘুরতে গিয়েই নয়, আশা করি যে যেখানে আছেন, তার আশেপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে চেষ্টা করবেন। অন্তত নিজে কোনোভাবেই নোংরা করবেননা। হোক তা জল কিংবা স্থল।

Source:  Sofia Nishi‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)

29 Jul 2019
এই একটা যায়গা, যে যায়গার কথা মনে পড়লে, যে যায়গার কথা ভাবলে, যে যায়গার ছবি দেখলে আমার আর মন খারাপ হয়না, থাকেনা। যেখানে মন খারাপেরা কিছুতেই কাউকে আঁকড়ে ধরতে পারেনা। এখানে মন খারাপেরা বাতাসের সাথে উড়ে উড়ে, মেঘেদের সাথে ভেসে ভেসে, সুখের বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরে।
যেখানে মন খারাপেরা পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছড়িয়ে গিয়ে আদরের কুয়াসা হয়ে জড়িয়ে ধরে, যেখানে মন খারাপেরা পাইনের গভীর অরণ্যে হারিয়ে গিয়ে, একমুঠো রোমাঞ্চ হয়ে শিহরণ তুলে যায়, যেখানে মন খারাপেরা পাথরে পাথরে বাড়ি খেয়ে, উচ্ছ্বাসের ঝর্ণাধারা হয়ে নদীর অনন্ত আলিঙ্গনে নিজেকে সপে দেয়। যেখানে মন খারাপেরা পাহাড়ি নদীর পাগল করা স্রোতের সাথে ভেসে ভেসে চলে যায় দূর অজানায়, দেশ থেকে দেশান্তরে। আর এই একটা যায়গা, যে যায়গা নিয়ে আমার লেখার কোন শেষ নেই যেন!
কিভাবে শেষ হবে লেখা? আর কিভাবেই বা হবে মন খারাপ? তার যে কোন উপায়ই সে রাখেনি। তার সবকিছুই যে আমাদের সাধারনের কাছে অমোঘ, অপার্থিব আর অসহ্য সুখের।
এখানে যখন মেঘ করে, মেঘেরা যেন তখন সবচেয়ে আপন কেউ। ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়, ভিজিয়ে দেয়, জানালার ধারে এসে আভিমান করে থাকে, জানালা খুলে দিলেই নিজের অভিমান ভেঙে আপনাকে আলিঙ্গনে বেঁধে ফেলে মন খারাপ দূর করে দেয়, মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলতে বাধ্য করে। মেঘেরা এখানে মন ভালো করে দেয়, এক মুহূর্তেই।
এখানে যখন বৃষ্টি নামে, অবিরত ঝরতে থাকে। বৃষ্টির ছন্দেরা তখন, অবিরাম গুণগুনিয়ে গান শুনিয়ে যায়। সবুজ পাহাড় তখন রুপালী রঙে সেজে ওঠে, জানালার কাঁচে তখন কতরকমের আকুবুকি করতে ইচ্ছে হয়। রঙিন ফুলেরা, সবুজ ঘাস গুলো, ঝুলে থাকা গাছের লতারা, সবাই যেন সুখের নাচন শুরু করে। ভিজে ভিজে সবুজ আরও সবুজ হয়ে ওঠে। রঙিন ফুল গুলো আরও বেশী রঙের হয়ে ওঠে।
এখানে যখন কুয়াসা পড়ে, চারদিক একটু আদুরে চাদরে ঢাকা পরে যায়। পাহাড়, পাইনের বন, নদী, ঝর্ণা, আকাশ। সব যায়গায় কেমন একটা ধোঁয়া ধোঁয়া অবাক করা প্রকৃতি তৈরি হয়। অন্যরূপে পৃথিবীকে চেনায়। এখানের সবকিছুই তখন একটা অন্য জগতে রূপ নেয়। ইচ্ছে হয় অচেনা পাইনের বনে হেটে হেটে হারিয়ে যাই ধোঁয়া ধোঁয়া সেই অপরূপ অরণ্যে। ইচ্ছে হয়ে কোন এক পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি, ধোঁয়া ধোঁয়া এই কুয়াসার চাদরে, ইচ্ছে হয় ধোঁয়া ওঠা নদীর স্রোতের সাথে ভেসে যাই কোন দূর অজানাতে।
এখানে যখন সূর্য হাসে, একই সাথে যেন সবকিছুই ঝলমল করে হেসে ওঠে। পাহাড়, বন, নদী, ঝর্ণা, গাছ, ঘাস, লতাপাতা আর মাঠ। সবাই যেন সূর্যের আলোতে আলোকিত হয়ে ওঠে মুহূর্তেই। নিজেদেরকে সাজিয়ে তোলে যার যার খেয়ালে। কেউ রুপালী, কেউ সোনালী, কেউ নীল আর কেউ কেউ নানা রঙের স্যাডোতে। তখন চোখের দৃষ্টিরা ভীষণ অসহায় হয়ে পড়ে। চোখ দুটো ভীষণ অসহায় হয়ে মনকে জানায় চোখ কেন দুটোই হল? কেন আরও দুটি চোখ নেই মানুষের? দুই চোখে আর কতটাই দেখা যাবে সূর্যের হাসিতে ঝরে পরা শত রকমের রূপের?
একদিকে পাহাড় সবুজ পাহাড়ের নীল হয়ে যাওয়া, অন্যদিকে সেই সবুজ পাহাড়ের উপরেই বরফ মোড়ানো পাহাড় চূড়াদের নানা রঙে সেজে ওঠা। একদিনে গভীর পাইনের বনে হলুদ আনন্দ তো অন্যদিকে ঝরে পরা ঝর্ণা ধারায় রঙধনু রঙের খেলা। আর বয়ে চলা রুপালী নদীর ঝলমলে হাসিতে পাগল করে তোলা। এই পাহাড়, অরণ্য, নদী, ঝর্ণা এদের এতো এতো রূপের ঝলকানি কি শুধু দুই চোখ দিয়ে প্রান ভরে উপভোগ করা যায়? যায়না।
হয়তো কোন এক সূর্য রাঙা সকালে, ভীষণ অলস দুপুরে বা বৃষ্টি শেষের বিলাসী বিকেলে যদি ইচ্ছে হয় রাজা হতে, তবে তো আর কথাই নেই। নিজের হোটেল বা কটেজ মালিকের পালিত ঘোড়াতে চেপে বেড়িয়ে পরা যায় রাজার বেশে। টগবগ করে ছুটে চলা যায়, অচেনা পাহাড়ে, অজানা অরণ্যে, হারিয়ে যাওয়া যায় দূর থেকে দূরে। যেখানে আর যতদূর ইচ্ছে করে। কখনো ইচ্ছে হলে ঘোড়ায় চড়েই পারি দেয়া যাবে অবাধ্য নদী, উচ্ছ্বাসের ঝর্ণাধারা আর হাজারো পাথর বিছানো বন্ধুর পথ অনায়াসে।
কোন এক পাহাড় চূড়ায় উঠে গিয়ে ঘোড়াটাকে বেঁধে রেখে নিজেকে সপে দেব সেই পাহাড়ের কাছে, অপলক তাকিয়ে থাকবো নীল আকাশের দিকে, অলস সময় কাটাবো হেটে, বসে বা গড়িয়ে। শেষ বিকেলে যখন দিনের আলোরা ছুটি চাইবে আমার কাছে, ঘোড়ায় চড়ে বসবো। রোদ, মেঘ, বৃষ্টি আর কুয়াসাদের লুকোচুরিদের সাথী করে ফিরে আসবো নিজের আবাসে।
ক্লান্ত শরীরটাকে এলিয়ে দেব সবুজ ঘাসের গালিচায়। হয়তো একটু ঝিরঝিরে বাতাস, নতুবা এক পশলা বৃষ্টি অথবা একটুখানি কুয়াসায় আলিঙ্গনে সিক্ত হতে হতে জীবনের নতুন কোন মানে খুঁজে পাবো, বেঁচে থাকার স্বাদ কি সেটা অনুভব করবো, বিধাতার সীমাহীন উপহারের কাছে নিজেকে ভীষণ ভাগ্যবান ভেবে কৃতজ্ঞতায় নুইয়ে পড়বো।
ইস একটা জীবনে এমন যায়গায় যেতে পারার আনন্দে আনন্দে নিজেকে হারিয়েই ফেলবো ভাবনার, কল্পনার আর স্বপ্নের এক অন্য জগতে।
এটা আর কোন যায়গা নয়। আমার ভীষণ, ভীষণ আর ভীষণই প্রিয় যায়গা। আমার গোপন অভিসারের, নিজেকে নিশ্চিন্তে সপে দেয়ার, ২১ বছর বয়সী টাইটানিকের যেন সেই রোজ, সেই কেটউইন্সলেট এর মত!
20 Jul 2019

অাপনি যদি, সাগর, পাহাড় অার অাধুনিতার সংমিশ্রণে অসাধারণ কোন স্থান পরিদর্শণ করতে চান, তাহলে অবশ্যই অবশ্যই অাপনি বেচে নিতে পারেন ভিশাখাপত্তমকে। কেন? তাহলে জেনে নিতে পারেন অতি চমৎকার এই স্থান সম্পর্কেঃ

ভিশাখাপত্তনম, যার ডাক নাম ভাইজ্যাগ। যাকে অাবার ‘সিটি অফ ডেসটিনি’ বলা হয়। পুরান অনুসারে কার্তিক ঠাকুরের অস্ত্রের নাম অনুসারে নাকি এই শহরের নামকরণ। অার তেলেগু শব্দ পত্তনম-এর অর্থ হচ্ছে শহর (সূত্রঃঅামাদের টেক্সি ড্রাইভার)। পাহাড় ও সমুদ্রের মেলবন্ধনে তৈরি অন্ধ্রপ্রদেশের এই সাজানো শহরকে দক্ষিনের ‘নৈস্বর্গ’ বললেও হয়ত ভুল হবে না। এই শহরের অন্যতম আকর্ষণ হলো এটির একদিকে আছে পাহাড় আর অন্য দিকে সমুদ্র। অর্থাৎ উত্তরে পূর্বঘাট পর্বতমালা আর দক্ষিনে বঙ্গোপসাগর বন্ধু হয়েছে এখানে।অন্ধ্রপ্রদেশের এই বহু পুরনো বন্দর শহরটি পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে অামার দেখা ভারতের অন্যান্য শহরের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে। পাহাড়-সমুদ্র একাকার হয়ে এক অবিশ্বাস্য মধুর কম্বিনেশন দিয়ে সাজিয়ে তুলেছে ভিশাখাপত্তনমকে৷ সেখানে না গেলে অার এর সৌন্দর্য উপভোগ না করলে হয়তো কেউ জানতেই পারবেন না কেন একে ‘সিটি অফ ডেসটিনি’ও বলা হয়।

ভিশাখাপত্তনমে প্রধান অাকর্ষণ গুলো ২ ভাগে বিভক্ত। এক দিকে হচ্ছে পাহাড়ী এখাকার দর্শণীয় স্থান। অার অপর দিকে হচ্ছে সমুদ্রের তীরবর্তী দর্শণীয় স্থান। সমুদ্রের তীরবর্তী দর্শণীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম এখানকার অসাধারণ সুন্দর সৈকত সমুহ এবং পার্শবর্তী কিছু নজরকাড়া পর্যটনকেন্দ্র। এখানে সমুদ্রের দুটি রুপের সঙ্গে পরিচয় ঘটে পর্যটকদের। এর একটা হচ্ছে লাগাম ছাড়া, দুরন্ত, খ্যাপা। যার উত্তাল গর্জণে সরব থাকে গোটা উপকুল ও তার অাশপাশের এলাকা। অার অন্যটি স্নিগ্ধ, শান্ত অার অসীম নীল। অকুল সমুদ্রের যে দিকেই চোখ পড়বে, শুধুই নীল অার নীল৷ মনে হবে কেউ যেন চোখে স্বপ্নের রং লাগিয়ে দিয়ে গেছে৷
এখানকার সাগর পাড়ে বসে পরিস্কার নীল জলের মস্ত বড় বড় ঢেউয়ের পাথরের উপর আছড়ে পড়ার দৃশ্য, সমুদ্রের অবিরাম গর্জণ অার পাগল করে দেয়া সৌন্দর্য নিমিষেই যে কারো মনেই এনে দেবে গভীর প্রশান্তি।

তাই তো সেই স্বাদ নিতে প্রতিদিন বিকেলেই এখানকার সৈকত গুলোতে হাজার হাজার সৌন্দর্য পিপাসুদের ঢল নামে। এখানে সমুদ্র সৈকত ও তার পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা প্রশস্থ ও দৃষ্টিনন্দন রাস্তার দুই দিকে রয়েছে বেশ কিছু পার্ক ও মিউজিয়াম। যার মধ্যে রয়েছেঃ কয়লাস গিড়ি পাহাড়, ইন্দিরা গান্ধী জিওলজিক্যাল পার্ক, ঋষিকুন্ডা সৈকত, থোটলকুন্ডা সৈকত, ভিমলি সৈকত, ভিএমঅারডিএ পার্ক, এয়ারক্রাফ্ট মিউজিয়াম, সাবমেরিন মিউজিয়াম, রামকৃষ্ণ সৈকত, ইয়ারাদা সৈকত, ডলফিন নোজ লাইট হাউজ, সাগর দর্গা মন্দির, ভিউ পয়েন্ট ইত্যাদি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি সৈকত অবস্থান হচ্ছে শহরের প্রান্ত ঘেঁষে। অার কয়েকটির অবস্থান শহর থেকে পূর্ব-পশ্চিম দুই দিকে, বেশ দূরবর্তী স্থানে। অার দূরবর্তী সেই সৈকত গুলোতে যেতে চোখে পড়ে সারি সারি নারকেল অার তাল গাছ। ঋষিকুন্ডা সৈকত থেকে ভিমলি সৈকত অবধি সমুদ্রকে সঙ্গে করে ৩০ কি. মি. রাস্তা অামাদের শুধুই দেখতে দেখতে কেটে গেল। সৈকতটি যতনা ভালো লেগেছে তার চেয়ে অনেক বেশি উপভোগ্য ছিল যাবার পথটুকু। অার শহরের প্রান্ত থেকে ইয়াদা সৈকত পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার রাস্তায়ও চোখে পড়বে অসংখ্য তাল গাছ ও নারিকেল গাছ। এমনকি এই পথে দুয়েকটি পাহাড়েও তাল অার নারিকেল গাছ ছাড়া অন্য কোন গাছ চোখেই পড়েনি। এত তাল অার নারিকেল গাছ কোথাও এর অাগে দেখিনি। সমুদ্রের সাথে নিবিড়তা বাড়ানোর আদর্শ জায়গা এই নারকেল গাছ ঘেরা ইয়ারাদা সৈকতটি অন্যান্য বীচের তুলনায় অনেক নির্জণ। একটি পার্ক লাগুয়া পরিচ্ছন্ন সৈকতটি সারাদিন অলস সময় কাটানোর অাদর্শ জায়গা। পার্ক ঘেঁষা শ্বেত বালির চর, নীল উত্তাল জলরাশি, পাহাড়, স্বচ্ছ আকাশ আর সু-উচ্চ তাল-নারকেল গাছের নানান ভঙ্গিমা, সব মিলিয়ে অাপনার চোখ ও মন ভরিয়ে দেবে, চিত্তকে প্রশান্ত করে দেবে।

সেখান থেকে ১ কিলোমিটার দূরত্বেই রয়েছে ডলফিন নোজ লাইট হাউজ। যেখানে অাপনি ওয়াচ টাওয়ারের উপড় থেকে সমুদ্র, সমতল অার পাহাড়ের অসাধারণ ত্রিমাত্রিক সৌন্দর্য উপভোগের চমৎকার সুযোগ পাবেন। ভিশাখাপত্তনমের আরেকটি দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্র হল কৈলাশগিরি। সুন্দর সাজানো একটা পার্ক৷ সমুদ্র পাড়ে তার পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬০ ফুট উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত এই পার্কের কেন্দ্রে শুভ্র শিব-পার্বতীর মূর্তি বিরাজমান রয়েছে৷ পাহাড়ের দেহ কাটা-ছেঁড়া করে গড়ে ওঠা এই পার্কের দক্ষিন দিকের রেলিং ধরে দাঁড়ালেই পায়ের নিচে অশান্ত বঙ্গোপসাগরের ঢেউ আর গর্জন উপভোগ করা যায় অনেক উপড় থেকে দাড়িয়ে। যার অনুভূতিটা সত্যি অসাধারণ। পার্কের অারেকটি অাকর্ষণ হচ্ছে নিচ থেকে চূড়া পর্যন্ত পৌছানোর জন্য কৈশালগিরির রোপ-ওয়ে! পাহাড়ের চূড়া থেকে সমুদ্রের কোলে নেমে এসছে এই রোপ-ওয়ে৷

রামকৃষ্ণ সৈকতে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছি বিশাল সাবমেরিন মিউজিয়াম অার তার পাশের এয়ারক্রাফ্ট মিউজিয়াম দেখে। ডাঙ্গায় তোলা সমুদ্রের তলদেশের বাসিন্দা এই কারসুরা সাবমেরিনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তার সকল কিছু প্রত্যক্ষ করার সযোগ হয়েছে। জানা গেছে সাবমেরিনের ভিতরটা ঠিক কীরকম হয়, অার কীভাবে সেনারা সেখানে পানির নীচে দিনের পর দিন কাটান। এমন অভিজ্ঞতা অর্জন করার সুযোগ সচরাচর মেলে না। অার রাস্তার অপর প্রান্তেই বিশ্বের সর্বাধুনিক, সবচেয়ে সুকৌশলী, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও ভারী এয়ারক্রাফ্ট টিইউ-১৪২ এর যুদ্ধ কৌশল, সকল অংশ ঘুরে দেখা এবং এর সম্পর্কে সকল তথ্য জানতে পেরেছি।
ভাইজ্যাগে নাকি পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য ফিশিং হারবার। যেখান থেকে জাহাজে করে মাছ ও সি-ফুড বিদেশে রপ্তানি করা হয়। বিশাখাপত্তনমের এই মৎস সংরক্ষণের বন্দরটি নাকি সমগ্র ভারতের অন্যতম বড় মৎস্য রপ্তানি কেন্দ্র। হারবারের দিকে এগোলেই দুপাশের শুকানো মাছের গন্ধের তীব্রতায় তা বেশ টের পাওয়া যায়। যে কারণে অামাদের অার সাহস হয়নি গাড়ি থেকে নামার!

ভিশাখাপত্তনমে অামাদের ভ্রমণের ২য় অংশ ছিল এখানকার পাহাড়ী এলাকার কয়েকটি দর্শণীয় স্থান পরিদর্শণ। যার ১মে ছিল অারাকু ভ্যালি। ভিশাখাপত্তনম থেকে অারাকু ভ্যালির দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। শহর ছাড়িয়ে পুরো রাস্তাটাই পূর্বঘাট পর্বতমালার ঢেউ খেলানো উপত্যকার মধ্যে দিয়ে। সেই রাস্তার সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। টেক্সিতে করে প্রায় ৩ ঘন্টা পর পৌছায় অারাকু ভ্যালি। অারাকু ভ্যালি মুলত উপজাতীয় এলাকা। অার এখানকার প্রধান অাকর্ষণ উপজাতীয় জাদুঘর, নাম ট্রাইবাল মিউজিয়াম। পার্কের মত দারুন সাজানো-গুছানো এই জাদুঘরের উপকরণ গুলো কয়েকটি অালাদা অালাদা ঘরে প্রদর্শিত অাছে। ইট, পাথথর অার সিমেন্ট দিয়ে তৈরী এই ঘর গুলো দেখতে অনেকটাই মাটির ঘরের মত। যা বাইরে থেকে দেখতে অনেকটা ট্রাইবালদের কুঁড়ে ঘরের মতোই। অার ভেতরে উপজাতীদের নানান ট্রাইবাল আর্ট দিয়ে সাজানো। এই জাদুঘরটি সত্যিই অসাধারণ। মডেল করে আদিবাসীদের জীবনযাত্রা উপস্থাপন করা হয়েছে এখানে। যা দেখে খুব সহজেই ধারণা পাওয়া যায় আদিবাসীদের শিল্প-সংস্কৃতি, জীবন-যাত্রা, সমাজ ব্যবস্থা, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ, অস্ত্রশস্ত্র, অলঙ্কার, বাদ্যযন্ত্র প্রভৃতি সমন্ধে। শতকের পর শতক ধরেও নাকি তাদের সংস্কৃতি খুব একটা বেশি পরিবর্তণ হয়নি! এই আরাকু ভ্যালিতে নাকি অনেক রকমের ট্রাইবাল জাতির বাস। সরকারি হিসেব মতেই কম কমপক্ষে ১৯ টি ট্রাইবাল জাতি বাস করে এখানে। অার এখান থেকেই কিনতে পাওয়া যায় আদিবাসীদের তৈরী হস্তশিল্প সামগ্রী ও বিভিন্ন ধরনের মশলা। মিউজিয়ামের এক পাশে রয়েছে ছোট ঝিলে বোটিং এর ব্যবস্থা। অারাকু ভ্যালিতে অারো রয়েছে দৃষ্টিনন্দন দুটি পার্ক এবং দুটি প্রাকৃতিক ঝর্ণা।

অারাকু ভ্যালি থেকে অারো ৩০ কিলোমিটারের পথ বোররা কেভ বা গুহা। পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙিয়ে যখন বোররা গুহায় পৌঁছালালাম তখন বুঝলাম এত পথ পাড়ি দিয়ে হাজার হাজার মানুষ এখানে কেন অাসেন। লক্ষাধিক বছরের পুরনো চুনা পাথরের এই গুহায় অদ্ভুত সব প্রাকৃতিক ভাস্কর্য! পাথুরে প্রাকৃতিক স্থাপত্যে এই গুহার যে কী অপরূপ সৌন্দর্য তা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। প্রায় ২০০ বছরের বেশি সময় অাগে ১৮০৭ সালে ব্রিটিশ জিওলজিস্ট উইলিয়াম কিং অাবিষ্কার করেছিলেন এই বোরা বা বোররা গুহা। প্রায় ১০০০ ফুট বিস্তৃত আর ২৭০ ফুট গভীর এই গুহায় কম করে ৪ শতাধিক সিঁড়ি আছে ঘুরে ফিরে দেখার জন্য। অার অন্ধকার এই গুহাটটি অবশ্য সুন্দর করে আলোকিত করা আছে টুরিস্টদের জন্য, যেন প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট নানান ভাস্কর্য ভালো ভাবে অবলোকন করা যায়।
এদিকে ভিশাখাপত্তনম শহর থেকে তুলনামুলক কাছে, তবে ভিন্ন পথে পাহাড়ী এলাকায় ২০ কিলোমিটার দূরবর্তী অারেকটি দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্র হচ্ছে সিমলাচলম এলাকার সিমহাচলম মন্দির। কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলীতে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল একাদশ শতাব্দীতে৷ ভিশাখাপত্তনম বা ভাইজ্যাগের অন্ততম প্রধান দর্শণীয় স্থান এটি৷ দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন এই মন্দিরটি ব্যাপক জনপ্রিয় এর অসাধারণ কারুকার্যের জন্য৷ তবে দক্ষিন ভারতের অন্যান্য মন্দিরের মতই এর ভেতরেও ছবি তোলা নিষেধ!

যারা কম খরচে ভিশাখাপত্তম ভ্রমণ করতে চান, তারা দুই ভাবে সেখানে যেতে পারেন। প্রথমত কোলকাতা বা অাগরতলা থেকে বিমানে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই ৩০-৩৫ দিন অাগে টিকেট কেটে রাখলে খরচ প্রায় অর্ধেক হয়ে যাবে। অর্থাৎ কোলকাতা থেকে বিমান ভাড়া পরবে ২০০০-২৫০০ হাজার রুপি। অার দ্বিতীয়ত কোলকাতা থেকে ট্রেণে। সেক্ষেত্রে ক্লাস ভেদে ১০০০ রুপি থেকে হাজার থেকে শুরু। অার থাকার জন্য হোটেল ভাড়া ১০০০ রুপি থেকে শুরু। খাবার খরচ অামাদের দেশের মতই। কিন্তু সাদা ভাতের দাম একটু বেশি। তবে বিরিয়ানি সেখানে বেশ সস্তা। অার নাস্তাতে খেতে পারেন ঢুসা। তাতে কিছুটা ব্যতিক্রমতাও থাকল অার খেতেও সুস্বাদু। দাম পরবে ২০-৪০ রুপি। সেখানে ঘুরাফেরার জন্য খরচ কমনোর জন্য অাপনি বেচে নিতে পারেন অটো সি এন জি, খরচ পরবে ১০০০-১২০০ রুপি। অার টেক্সি নিলে সেক্ষেত্রে খরচ পরবে ১৮০০-২০০০ রুপি। তবে অারাকু ভ্যালি অার বোররা ক্যাভের দুরত্ব বেশি বলে ভাড়া ২৫০০-২৮০০ রুপি।
Source:Mohammad Al-amin‎ <Travellers Of Bangladesh

 

10 Jul 2019

মাত্র দুই দিনে যে কোলকাতা শহর পুরোটা ঘোরা সম্ভব না তা গিয়ে বুঝলাম। ভিসার মেয়াদ শেষের দিকে হওয়ায় কোন কিছু চিন্তা না করেই রওনা দিয়েছিলাম। ঢাকা থেকে শ্যামলী এনআর এ শুক্রবার রাত সোয়া দশটায়। কোলকাকায় পৌছালাম সকালে, শনিবার সকাল সোয়া দশ টায় (বাংলাদেশ সময়)। হ্যা, এক্সাক্ট ১২ ঘন্টায়।

হোটেলে উঠলাম। ফ্রেশ হয়ে নাস্তাটা সেরে নিলাম #কস্তুরি হোটেলে। এরপর একটা ট্যাক্সি নিয়ে বের হলাম ঘুরতে। বেশি বিস্তারিত লিখছি না। বিস্তারিত তো গিয়ে দেখবেন।

দিন ১। প্রথমে গেলাম #ইন্ডিয়ান_মিউজিয়ামে, #নিউমার্কেট হয়ে। ৫০০ রুপি করে টিকেট। এরপর গেলাম #ইডেন_গার্ডেন আর #হাওড়া_ব্রিজ দেখতে। হালকা বৃষ্টির সাথে বাতাসও ছিলো, ভালোই লাগলো হাওড়া ব্রিজের বাতাস। #হাওড়া_রেল_স্টেশনে একটা পলক ফেলে চলে এলাম বিখ্যাত #ভিক্টোরিয়া_মেমোরিয়ালে। সেন্ট্রাল ইওরোপ ঘোরার অভিজ্ঞতা থাকায় বুঝলাম, সম্পুর্ণ ইওরোপিয়ান ধাঁচে তৈরি এই স্থাপত্যটি। একদম অসাধারণ। সাদা মার্বেল পাথরের এই প্যালেস আপনার মনে থেকে যাবে আজীবন। সত্যিই সুন্দর। বাংলাদেশিদের জন্য টিকেট ১০০ রুপি করে, গার্ডেন+মিউজিয়াম। ভিক্টোরিয়া থেকে বেড়িয়ে একটু চা টা খেয়ে মার্কেটিং করলাম হালকা। দাম ভালোই সহনিয় সবকিছুর।

দিন ২। সকালের নাস্তাটা করলাম এক কাশ্মীরির হোটেলে (হোটেলের নাম মারিয়া) সদর স্ট্রিট, দি ভোজ কম্পানির পাশে। এবার রওনা হলাম টেক্সিতে করে রবী ঠাকুরের বাড়িতে। #জোড়াসাঁকোর_ঠাকুরবাড়ি, সাথে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। টিকেট কেটে ঢুকতে হবে আর ছবি তুলতে হলে আলাদা কুপন করে নিতে হবে। ঘুরে ঘুরে দেখলাম রবীর আলো কতো প্রখড়। এরপর খেয়ে নেয়ে গেলাম #সায়েন্স_সিটিতে, ১০৮ টাকার টিকেটে সিটিতে ঢুকলাম ক্যাবল কারে করে। পরিবার বা বন্ধুদের সাথে গেলে সায়েন্স সিটিতে একবার যাওয়া উচিৎ, খারাপ লাগবেনা।

দিন ৩ঃ সকাল ৬:০০ টার গাড়িতে রওনা দিয়েছি কোলকাতা থেকে (সৌহার্দ্য তে) এসে নামলাম রাত ৯:০০ টায়।

কোলকাতায় আরও যা দেখার ছিলোঃ
১। মিলেনিয়াম পার্ক
২। ইকো পার্ক
৩। নিক্কো পার্ক
৪। ওয়াক্স মিউজিয়াম
৫। আলিপুর চিড়িয়াখানা
৬। দক্ষিনেশ্বর মন্দির সহ আরও কিছু মন্দির
৬। বোটানিকাল গার্ডেন
৭। কফি হাউজ
৮। কলেজ স্ট্রিট
৯। নিজামস
১০। বিদ্যাসাগর সেতু
১১। বেলুর মঠ ইত্যাদি।
১২। বাড়লা প্লানেটেরিয়াম

সর্বপরি যেটা বলতে পারি, নিউমার্কেট থেকে কিছু কিনলে দামদর করে, ধরমতলার হোটেলগুলোতে থাকলে দু একটা হোটেল দেখে আর ট্যাক্সিতে চললে দামদর করে চলা উচিৎ। আর অবশ্যই যে কোন রকম দালাল হতে সাবধান! সে হোটেলেরই হোক আর মানি এক্সচেন্জেরই হোক।

আর অবশ্যই যেখানেই যান যেহেতু আমরা আমাদের দেশকে উপস্থাপন করি, আমাদের উচিৎ হবে সবার সাথে পর্যটকের মত আচরণ করা এবং টুরিস্ট স্পটকে পরিস্কার রাখা। কোলকাতার লোকজন খুব সহজেই বাংলাদেশের মানুষকে চিনে ফেলে তাই অযথা নিজের পরিচয় লুকিয়ে দেশকে ছোট না করা সম্মানের কাজ হবে।

সবাইকে ধন্যবাদ।

Source:  Sharon Reza >Travelers of Bangladesh (ToB)

7 Jul 2019

নক্ষত্রের মতই দ্যুতি ছড়ানো এক রিসোর্ট গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে অবস্থিত নক্ষত্রবাড়ি রিসোর্ট। যেন প্রকৃতির নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি করা হয়েছে রিসোর্টটি। এখানে যেন প্রকৃতিকে আরো কাছ থেকে উপলব্ধি করা যায়। দেশের বিশিষ্ট অভিনেতা, চিত্র পরিচালক এবং স্থপতি তৌকির আহমেদ ও তার সহধর্মিণী জনপ্রিয় অভিনেত্রী, নাট্যশিল্পী এবং চিত্রকর বিপাশা হায়াত যেন তাদের স্বপ্নকে বাস্তব রুপ দিয়েছেন এই রিসোর্টটিতে।

যান্ত্রিক ঢাকা শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই রিসোর্টটি রংহীন জীবনে দেবে প্রশান্তি ভরা ছোট্ট একটু বিরতি। ২০১১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় নক্ষত্রবাড়ি রিসোর্টের।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ী বাজার থেকে একটু দূরে চিনাশুখানিয়া গ্রামে গড়ে উঠেছে নক্ষত্রবাড়ি রিসোর্টটি। রিসোর্টে ঢুকতেই রয়েছে নান্দনিক একটি হোটেল। এখানে প্রায় সব ধরনের খাবার পাওয়া যায়। রয়েছে নান্দনিক ডিজাইনে তৈরি তিনতলা একটি কনফারেন্স সেন্টার ও রেস্তোরাঁ; যার সামনেই রয়েছে আরেকটি সুইমিংপুল।

রিসোর্টটিতে আরো রয়েছে পুকুর। এসব পুকুরে হাঁস সাঁতরে বেড়ায়। হাঁস সাঁতরানো এসব পুকুরের এক পাশ ধরে সারি সারি ‘ওয়াটার কটেজ’ তৈরি করা হয়েছে। এগুলো দেখলে মনে হয় যেন পানিতেই ভেসে আছে। ছন, খেজুরপাতার পাটি আর কাঠের তৈরি এসব ঘরের ভেতর আধুনিক সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

রিসোর্টটির চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। এখানে প্রতিটি জায়গা ব্যবহার করা হয়েছে নান্দনিকভাবে। একপাশে রয়েছে ছোট্ট একটি ঝরণা, যেখানে পদ্ম আর শাপলা ফুলের সখ্যতা গড়ে উঠেছে। এখানে চাইলেই পুকুর থেকে মাছ ধরা অথবা নৌকায় চড়েও সময় কাটানো যায়। এছাড়া জোড়া পুকুরের মাঝে কাঠের সাঁকোতে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় ঝিলের জলে ফোঁটা লাল শাপলার সৌন্দর্য।

খেলাধুলার জন্য রয়েছে ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, বিলিয়ার্ড ইত্যাদির ব্যবস্থা। ক্রিকেট খেলার জন্য তৈরি হচ্ছে মাঠ। এছাড়া এখানে মাঝেমধ্যে বাউল গান, ম্যাজিক শো, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়ে থাকে। ঢাকার শহরের খুব কাছাকাছি হওয়ায় নানান ধরণের করপোরেট মিটিং বা অনুষ্ঠানের জন্য এখানে অনেকেই আসেন। এখানে ২০০ জনের কনফারেন্স রুম যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ২০ জনের জন্যও।

থাকার জন্য না হলেও সারাদিন কাটানোর জন্যও ঘুরে আসা যায় এই নক্ষত্রবাড়ি রিসোর্ট অ্যান্ড কনফারেন্স সেন্টার থেকে।

নক্ষত্রবাড়ি রিসোর্ট খরচ

রিসোর্টের খরচটা নির্ভর করবে কতজন যাবেন এবং কিভাবে থাকবেন তার উপর। এখানে আছে তিন ধরনের আবাসন অতিথিদের জন্য – ১। হোটেল কমপ্লেক্স , ২। ওয়াটার বাংলা ও ৩। ফ্যামিলি বাংলা।

হোটেল কমপ্লেক্স : কাপল রেগুলার ভাড়া ৬৩২৫ টাকা / নাইট

সুবিধাঃ এক বেড দুই জন থাকার সুবিধা।

ডিলাক্স কাপল, ভাড়া ৮,২২২/ নাইট

সুবিধাঃ কিং সাইজ এক বেড ৩ জন থাকার সুবিধা।

টুইন রেগুলার ভাড়া ৬৯৫৭ টাকা/নাইট

সুবিধাঃ দুটি সিঙ্গেল বেড দুই জন থাকার সুবিধা।

ফ্যামিলি বাংলোঃ দুই বেড রুম ভাড়া ২৭,৮৩০ টাকা / নাইট

সুবিধাঃ দুই বেড ৫ জন থাকার সুবিধা।

ওয়াটার বাংলোঃ ডিলাক্স কটেজ ভাড়া ১০,৭৫২ টাকা / নাইট

প্রিমিয়াম সুইট কটেজ ভাড়া ২২,৭৭০ টাকা / নাইট

ফ্যামিলি সুইট কটেজ ভাড়া ২০,২৪০ টাকা / নাইট

কনফারেন্স হলের প্রতি শিফটের জন্য ভাড়া পরিশোধ করতে হবে ৩০,০০০ টাকা । সাধারণ দর্শনার্থীদের রিসোর্টে প্রবেশ মূল্য ধরা হয়েছে ৫০০ টাকা। ভাড়া এবং আনুসাঙ্গিক সর্বশেষ তথ্য পেতে চাইলে ভাল হবে তাদের ওয়েব সাইটের মূল্য তালিকা দেখা অথবা তাদের সাথে ফোনে কথা বলা।

Source: Nurul KarimHotels in Bangladesh