মা’র মুখে ছোটবেলায় শুনতাম নীল পরীর গল্প৷ মা’র সেই ছেলে ভুলানো গল্পে চলে যেতাম কল্পনার রাজ্যে। পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চড়ে শুভ্র মেঘমালা ভেদ করে হাওয়ার তালে চলতো আমার স্বপ্নতরী। যখনই জিজ্ঞেস করতাম আম্মু কবে নিয়ে যাবে নীল পরীদের দেশে? মা তখন মায়াভোলা হাসি দিয়ে বলতো, সোনা তুমি তো অনেক ছোট, যখন অনেক বড় হবে তখন নীল পরীর দেশে যেতে পারবে৷ নীল পরীর দেশে আছে মস্ত বড় ভাউ, বাবুদের দেখলে মস্ত বড় হা করে গিলে ফেলে। নীল পরীর দেশে যেতে হলে পাড়ি দিতে হয় সাত সমুদ্র তেরো নদী। ডলফিনের পিঠে চড়ে যেতে হয় সে দেশে। আমার আব্বুটা যখন বড় হবে তখন নীল পরীর দেশে যাবে। ঘুমাও সোনা৷

কত রাত কেটেছে আমার নীল পরীর দেশের স্বপ্ন দেখে৷ নীল নীল জলরাশি কেটে কেটে ডলফিনের পিঠে চড়ে যাচ্ছি নীল পরীর দেশে৷ কত দিন গিয়েছে আমার ভেবে- আচ্ছা নীল পরীর দেশটা কেমন হবে? ওখানে কি মানুষ আছে? মানুষগুলো কি কোনো দুষ্টু দৈত্যের কাছে বন্দী? নীল পরী ওদের উদ্ধার করবে??

শৈশব ডানপিটে দিনগুলো পার করে এক সময় দুরন্ত কৈশোরে প্রবেশ করলাম৷ ততদিনে ভুলে গেছি সেই নীল পরীর দেশের গল্প। সময় চলে যায় সময়ের স্রোতে৷ তখন আমার স্কুল পালানোর দিন। রাকিব, আইয়ান, জোভান, মাক্স ছিল আমার পার্টনার ইন ক্রাইম৷ তিন গোয়েন্দার গল্প পড়ে সবাই অ্যাডভেঞ্চারের জন্য ব্যাকুল৷ সদ্য স্কুল পাস করে কলেজে ওঠা টগবগে কিশোর। এই বয়সটা খারাপ গুরুজন বলে৷ তবে তখনকার দিনের টেকনোলজি ছিল না এত এডভান্স। মেয়েদের পাশে বসে পরীক্ষা দেওয়া, একটু চোরা চোখে চাওয়া, ধরা পড়লে আবার সেই প্রশ্রয়ের খিল খিল হাসির গুঞ্জন এখনও কানে বাজে৷

এখন জেনারেশন গ্যাপের ফাঁদে পড়ে ভাবি ছেলে মেয়ে গুলো কত এডভান্স৷ কঠিন সেই কনজারভেটিভ যুগে ৫ জন কিশোর বাবা মায়ের অনুমতি নিয়ে, গল্পের ফুলঝুরি শুনিয়ে কোনো মতে রাজি করালো কক্সবাজার যাবার ব্যাপারে। আহা মনে কী আনন্দ! কেউ জানে না তাদের সেন্ট মার্টিনের গোপন বাসনার কথা। তখন কেয়ারী এই রুটে নতুন নতুন এসেছে। কিন্তু এপ্রিল মাসের কাল বৈশাখীর এই উত্তাল সিজনে তার চলার সম্ভবনা একেবারে নেই বললেই চলে। তাই টেকনাফ থেকে ট্রলারে শুরু হলো আমাদের অ্যাডভেঞ্চারের যাত্রা।

নাফ নদীর জলরাশি কেটে কেটে যাচ্ছে আমাদের ট্রলার। চারদিকে নদী পাহাড়ের এক অপূর্ব মিলন মেলা। দূর দিগন্তে হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের বে অফ বেংগল। মায়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে যেন এক অলিখিত বর্ডার এই নাফ নদী। টারকুইশ আর নীল পানির মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে এই কিশোর মন। ট্রলারের চালক রহিম মিয়া আমাদের ব্রিফিং দিচ্ছে৷ দূরে দেখা যাচ্ছে একটা জেটিঘাট।

রহিম মিয়া বলে উঠলো এসে পড়েছি শাহ পরীর দ্বীপ৷ কিংবদন্তি বলে মীর জুমলার ধাওয়া খেয়ে শাহ সুজা আর তার স্ত্রী পরী বানু এই দ্বীপে এসে আশ্রয় নিয়েছিল তখন থেকে এই দ্বীপের নাম শাহ পরী৷ স্মৃতি ঝালাই করে যতটুকু মনে পড়ে তখন জেলে পাড়াটা সাগরের কিনার ঘেঁষে ছিল৷ ঘাট থেকে দেখতে পারলাম জেলেদের সমুদ্রের সাথে রক্তচক্ষুর খেলা। শাহ পরীর দ্বীপে কিছু মানুষ নামিয়ে আবার শুরু হলো আমাদের যাত্রার। এর মধ্যে দেখতে পারলাম আকাশটা ঘন কালো মেঘে ঢেকে গেছে। শোঁ শোঁ করে বাতাস বইছে সাগরে৷ দুর্যোগের ঘনঘটা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে।

এর মধ্যে ট্রলার ঢুকে পড়লো বে অফ বেংগলে৷ কালবৈশাখীর ঝড় শুরু হয়ে গেল সমুদ্রে ঢোকার সাথে সাথে৷ দিনের বেলায় যেন রাতের আঁধার নেমে এলো সমুদ্রে৷ আমাদের পাঁচজনের আত্মারাম কেঁপে উঠলো৷ কূল কিনার দেখা যাচ্ছে না। বড় বড় ঢেউয়ের তালে দুলছে আমাদের ট্রলার। ঢেউয়ের সাথে উপরে উঠছে আর নিচে নামছে৷

মায়ের বলা সেই ছোট বেলার গল্পের নীল পরীর দেশের কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল৷ সাগরের উত্তাল ঢেউগুলো যেন সেই ভাউয়ের মতো আমাদের প্রতিনিয়ত গিলতে আসছে। আর ট্রলারকে মনে হচ্ছে আমার সেই ডলফিন যে আমাকে নিয়ে যাবে নীল পরীর দেশের পানে৷

জীবনে প্রথম মৃত্যুকে এত কাছে থেকে দেখলাম। আয়তুল কুরসি, দোয়া দরুদ পড়তে লাগলাম সবাই। এত রোলিংয়ের মাঝে আমি আল্লাহ’র স্মরণে চলে গেলাম। মনে মনে ভেসে উঠলো প্রিয় সব মুখ। রহিম মিয়ার মুখে এক চিলতে হাসি দেখে আমরা সবাই একটু অবাক হয়ে গেলাম। আমি বিরক্তি হয়ে জিজ্ঞেস করে ফেললাম এই দূর্যোগের ভিতরেও আপনি কীভাবে হাসছেন? রহিম মিয়া জবাব দিল এই সমুদ্র কারও লাশ গ্রহণ করে না। এখানে ট্রলার ডোবে না বড় দুর্যোগেও।

বুকে একটু সাহস যেন ফিরে পেলাম। ১০-১২ মিনিট যেন এক যুগের মতো কেটে গেল। যেমন হঠাৎ করে তার অর্বিভাব, তেমনই হঠাৎ করে তার প্রস্থান। দেহ আর চাপ নিতে পারলো না। বমি করা শুরু করলাম। নিজেকে অনুভূতি শূন্য মনে হতে লাগলো। কতক্ষণ উত্তাল সাগরে আমাদের ট্রলার এভাবে চললো বুঝতেই পারলাম না। হঠাৎ রহিম মিয়ার ডাকে ঘোরের জগৎ থেকে ফিরে এলাম। ছোট বাবু সাহেব ওই দেখেন সেন্ট মার্টিন দেখা যায়। আহা সেন্ট মার্টিন এই তো আমার নীল পরীর দেশ।

Source: https://tripzone.xyz/nil-pori-der-desh-ae-part1/