বাংলাদেশের আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে প্রাচীন সভ্যতা। মসজিদের শহর হিসেবে বাগেরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জের অনেক খ্যাতি। কিন্তু ক’জন মানুষ জানে এর বাইরেও একটা প্রাচীন শহর আছে? যার অস্তিত্ব এখনও জানান দিচ্ছে কালের সাক্ষী হিসাবে। প্রাচীন এই শহর মোহাম্মদাবাদের ইতিহাস অনেক পুরনো। ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারের প্রায় তিন বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এখনও মোহাম্মদাবাদ বেঁচে আছে সভ্যতার শেষ স্মৃতি হিসেবে।

হারানো এই শহরের শেষ স্মৃতির খোঁজে কোনো একদিন বের হয়েছিলাম এই ইট পাথরের শহর থেকে। সাথে ছিল ভ্রমণ সঙ্গী কায়েস। আমার অফ ট্রেইল ঘোরাফেরার সঙ্গী-সাথীরা সব আজব কিসিমের। কোনো জায়গায় যেতে নেই তাদের মানা। তাই দেই সব আজব জায়গায় হানা। ঝিনাইদহ কোনো ট্র্যাভেলিং ডেস্টিনেশন না। তবে সরকার চাইলে কি না পারে? প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাকে ট্যুরিজমের একটা বিশাল অংশ করা যায়। কিন্তু আফসোস এটা তো বাংলাদেশ, তাই তো আমরা দেশের সৌন্দর্য ছেড়ে বিদেশ পানে ছুটি।

মিশরের পিরামিড, আগ্রার তাজমহল টানে আমাদের চুম্বকের মতো৷ কিন্তু পুণ্ড্রনগর, সুবর্ণগ্রাম, উয়ারী-বটেশ্বর, খলিফাতাবাদ, মোহাম্মদাবাদের নাম কহিলে কহিবে- মশাই, এইগুলো কোথায়? নিজেদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, বাঙাল মুলুকের ইতিহাসই যদি না জানলাম, কী হবে কোন দূর দেশের শাহজাহানের তাজমহল দেখে? তাই আগে দেখি নিজের দেশ। মাহমুদ ভাইয়ের এই পাঞ্চ লাইনে দীপ্ত হয়ে বের হয়ে গেলাম ঝিনাইদহের পথে।

ডিসেম্বর মাসের এই হাড় কাঁপানো শীতে কেউ এসি বাসের টিকেট কাটে শুনলে খ্যা খ্যা করে হাসার কথা৷ তবে পাটুরিয়া ঘাটের সেই ভয়ংকর এক জ্যামের আত্মকথা জানলে তাদের হাসিখানা মলিন হয়ে যেত৷ আমার জীবনের সর্বকালের সেরা জ্যাম উপভোগ করলাম সেদিন। জ্যাম নিয়ে যদি কোনো দিন উপন্যাস লিখি, আমি সেই পাটুরিয়া ঘাটের ভয়াল দিনের কথা অবশ্যই লিখবো৷ ১৭ ঘণ্টার সেই এক মহাজার্নির হাতছানি দিয়ে গাবতলী থেকে সোনারতরি বাসে উঠে বসলাম আমি আর কায়েস ভাই রাত ১২ ঘটিকায়৷ যথারীতি বাস পাটুরিয়া ফেরি ঘাট এসে পৌঁছালো ৩টার দিকে। এরপর যেন এক প্রগাঢ় অপেক্ষা।

সে অপেক্ষার নেই কোনো শেষ। ভোরের প্রথম সূর্যের আলোর সাথে আমাদের ও বাধ ভেঙে গেল৷ নেমে পড়লাম বাস থেকে৷ চোর গেলে বুদ্ধি বাড়ে৷ তাই সবাই আলাপে মত্ত। আহারে যদি ভেঙে ভেঙে যেতাম, কত তাড়াতাড়ি চলে যেতাম৷ এখন টাকার মায়াও ছাড়তে পারে না, আবার বাসে বসে থাকাও সহ্য করতে পারে না। এই বুঝি ছেড়ে দিল, এরপর তো পুরো টাকা লস হয়ে যাবে। এই ছেড়ে দিল ভাবতে ভাবতে দুপুর গড়িয়ে গেল।

আমরা যাত্রী ভাইরা নিজেদের মধ্যে সুখ দুঃখের প্যাচালে ব্যস্ত। এরপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ দুপুর ৩ ঘটিকার দিকে যখন বাস ফেরীতে উঠলো সবাই উল্লাসে এক সাথে চিৎকার দিয়ে উঠলো। কালীগঞ্জ যখন এলাম তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। খাওয়া শেষে এবার হোটেলের খোঁজে বের হলাম। কালীগঞ্জে পর্যটক আসে খুবই কম। তাই এখানে ফাইভ স্টার মানের সার্ভিসের চিন্তা করা বিরাট বড় পাপ।

তবে যে হোটেলই পেলাম ছারপোকা আর বাতির রাজা ফিলিপস দেখে ওঠার আগ্রহ পেলাম না। হতাশ হয়ে যখন নাপিতের দোকানের সামনে সিগারেট টানছি উনি ডেকে আমাদের বললেন, একটা নতুন হোটেলের কথা। তার কথা মতো সেখানে গিয়ে অবাক। খুবই পরিপাটি পরিচ্ছন্ন একটা হোটেল৷ নতুন হয়েছে এই শহরে। স্মৃতি প্রতারক। এতক্ষণের চেষ্টায় নাম বের করতে পারলাম না।

রাতের খাবার সেরে একবারে কাক ডাকা ভোরে বের হয়ে গেলাম। ঘড়ির কাঁটায় তখন সাড়ে পাঁচটা। হাড় কনকনে শীতে জবুথবু হয়ে পকেটে হাত ঢুকিয়ে আমি আর কায়েস ভাই হাঁটছি৷ রাত্রি শেষে কুয়াশা যেন ক্লান্ত মুখে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে একটা চমৎকার শীতের সকালের৷ প্রতি শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে বের হচ্ছে শীতের সাদা ধোয়া। যত দূর দেখা যায় কুয়াশা ঘেরা অন্ধকারে জড়িয়ে পুরো ধরনী৷ লেপ-কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমানো এই সকালে রাস্তায় মানুষের সংখ্যা খুবই নগণ্য৷

রিক্সা না পাওয়া যাওয়ায় বাস স্ট্যান্ডের মোড় পর্যন্ত হেঁটেই যেতে হলো। এরপর উঠে পড়লাম যশোরের বাসে। গন্তব্য আমাদের বারোবাজার। বর্তমানের ঝিনাইদহের বারোবাজার এলাকা প্রাচীন কালে ছাপাইনগর হিসেবে খ্যাত ছিল। রাজত্ব চলতো এখানে বৌদ্ধ হিন্দু রাজাদের। খান জাহান আলী তার বারোজন সহচর নিয়ে আসেন এই ছাপাইনগর। সেখান থেকেই এর নাম বারোবাজার। যুদ্ধ কিংবা মহামারিতে ছাপাইনগর ধ্বংস হয়ে যায়। থেকে যায় প্রাচীন ইতিহাস।

১৯৯৩ সালের প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বের হয়ে আসে ১৫টি স্থাপনা যার বেশির ভাগই প্রাচীন মসজিদ। এগুলো হচ্ছে সাতগাছিয়া মসজিদ, ঘোপের ঢিপি কবরস্থান, নামাজগাহ কবরস্থান, গলাকাটা মসজিদ, জোড়বাংলা মসজিদ, মনোহর মসজিদ, জাহাজঘাটা, দমদম প্রত্নস্থান, গোড়ার মসজিদ, পীর পুকুর মসজিদ, শুকুর মল্লিক মসজিদ, নুনগোলা মসজিদ, খড়ের দীঘি কবরস্থান, পাঠাগার মসজিদ ও বাদেডিহি কবরস্থান। এত ছোট জায়গার মধ্যে কতগুলো প্রত্নস্থান।

বারোবাজার নেমে আগে সকালের নাস্তা পর্ব সেরে নিলাম। শহর মোহাম্মদাবাদ যাবার আগে যাব আর এক কিংবদন্তি গাজী কালু চম্পাবতীর মাজারে। বাংলাদেশে এই প্রথম মনে হয় কোনো নারীর নামে মাজারের সন্ধান পেলাম। গাজী কালু চম্পাবতীর মাজারে প্রতিদিন ভিড় করে দর্শনার্থী। এটি এমন একটি মাজার যেখানে হিন্দু মুসলিম সব ধর্মের মানুষের সমাবেশ হয়৷ গাজী কালু চম্পাবতীকে নিয়ে হয়েছে পালা গান, যাত্রা, মঞ্চ নাটক৷ গাজী কালু চম্পার মাজারে যাবার জন্য আমরা ভ্যান ঠিক করলাম। চলা শুরু করলো ভ্যান গ্রামের মেঠো পথ ধরে৷

এক সময় পৌঁছে গেলাম গাজী কালু চম্পাবতীর মাজারে। এত সকালে মাজারে আমরাই দর্শনার্থী। দূরে এক সাধু বসে আছে। সাধু বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম প্রতিদিন এখানে কেমন মানুষ হয়। সাধু বাবা চিন্তা সাগরে ডুবে গিয়ে বললেন, বিশ্বাসে মেলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। আপনি বিশ্বাস করবেন না শহরের মানুষ। গাজী কালু চম্পা কোনো লোক সাহিত্যের চরিত্র নয়৷ উনি জীবন্ত কিংবদন্তি৷ প্রতিদিন এখানে বৃহত্তর যশোরের অনেক লোক আসে৷ এখানে এসে মানত করে।

এই যে অশ্বত্থ গাছ দেখছেন এখানে ভক্তরা সুতা বেঁধে আগরবাতি জ্বালায়৷ পূর্ণ ভক্তিতে বিশ্বাস রাখলে তার মানত পূর্ণ হয়৷ আপনি শহরের ছেলে, দেখেই বোঝা যায় এসব বিশ্বাস করেন না। জানেন এই মাজারে অনেক প্রেমিক প্রেমিকা আসে। তাদের মনবাসনা কাগজে লিখে এই অশ্বত্থ গাছে বেঁধে দেয়৷ গাজী বাবা আর মা চম্পাবতীর কল্যাণে কত ছাও পোলার প্রেম সফল হলো। ভক্তি ভরে আপনিও সুতা ঝুলিয়ে দেন, মানত পূর্ণ হবে৷ এ কথা বলে সাধু বাবা আবার ধ্যানে গেলেন। গুনগুনিয়ে গাইতে থাকলেন গাজী কালু চম্পার পালা গান৷

আমরা মাজারটা ঘুরে ঘুরে দেখছি৷ মাজারের দক্ষিণ পাশে শ্রীরাম রাজার দীঘি। মাজারে পাশাপাশি তিনটি কবর। মাঝের বড় কবরটি গাজীর, পশ্চিম দিকে কালুর কবর আর পূর্ব দিকের ছোট কবরটি চম্পাবতীর। পুরো মাজার জুড়ে আছে বিশাল একটা অশ্বত্থ গাছ৷ এই অশ্বত্থ গাছের ফোঁকরে নাকি আছে একটা গোপন কবর৷ কার কবর তা জানা না গেলেও গাজী কালু চম্পাবতীর গল্প বা জনশ্রুতি সম্পর্কে অবগত থাকলে কিছুটা ধারণা করা যায়৷

লোক শ্রুতি থেকে জানা যায় দরবেশ শাহ সিকান্দার ছিলেন প্রাচীন বৈরাট নগরের রাজা। তার রানী ছিলেন আজুপা সুন্দরী। তাদের প্রথম পুত্র জুলহাস শিকারে গিয়ে নিরুদ্দেশ হন। বরখান গাজী ছিল রাজা-রানীর দ্বিতীয় পুত্র আর কালু ছিল তাদের পালক সন্তান৷ দুই ভাইয়ের মধ্যে ছিল দহরম মহরম সম্পর্ক৷ যেখানে গাজী সেখানেই কালু৷ সে সময় ছাপাইনগরে অপরূপ রূপবতী এক রাজকন্যা চম্পাবতীর নাম শোনা যায়৷ চম্পাবতী ছিলেন সামন্ত রাজা রামচন্দ্র ওরফে মুকুট রাজার কন্যা। চম্পাবতীর রূপের নহর দেখে তার প্রেমে পড়ে যান বরখান গাজী৷

চম্পাবতীর টানে তিনি এসে পড়লেন এই ছাপাইনগর৷ হিন্দুরাজার মেয়ের প্রেম গাজীকে ভুলিয়ে দিল সে মুসলমান। বরখান গাজীর টানে তার সাথে চলে আসলেন ভাই কালু৷ বলুহর বাওরের তমাল গাছ তলায় প্রতিদিন মিলিত হতো গাজী চম্পা। মুকুট রাজা এই খবর পেয়ে রেগে আগুন৷ গাজীকে শায়েস্তা করার ভার দিলেন তার সেনাপতি দক্ষিণ রাওকে৷ কিন্তু বিধিবাম সেনাপতি যুদ্ধে করুণভাবে পরাজয় বরণ করে বরখান গাজীর কাছে ইসলাম ধর্মের দীক্ষা নিয়ে মুসলিম হয়ে যান।

অপরদিকে মুকুট রাজা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চলে আসেন ঝিনাইদহের বাড়িবাথান। যেখানে চম্পাবতী সেখানেই গাজী আর কালু৷ বরখান গাজী চম্পাবতীকে উদ্ধার করে নিয়ে যান তার রাজ্যে। কিন্তু দরবেশ রাজা শাহ সিকান্দার এই সম্পর্ক কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। তাদেরকে রাজ মহল থেকে বিতাড়িত করা হলো ভগ্ন হৃদয়ে কালু চম্পাকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন।

শেষ পর্যন্ত গাজী প্রেমের জন্য দরবেশ বেশে ঘুরতে ঘুরতে সুন্দরবন হয়ে আবার এসে পড়েন এই ছাপাই নগর। সাথে দক্ষিণ রাও, কালু, চম্পাবতী সঙ্গী হলেন। এখানে তাদের আস্তানা গাড়া হয়৷ শুরুতে অশ্বত্থ গাছের কোটরে একটা কবরের কথা বলেছিলাম। ধারণা করা হয়, এটা সেনাপতি দক্ষিণ রাও’র কবর৷ গাজী কালু চম্পাবতীকে নিয়ে মিথ চলে আসছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই৷ কবিতা পুঁথিতে যুগ যুগ ধরে প্রচারিত হয় তাদের প্রেমের গীত৷

ইতিহাসের পাতা থেকে এবার বাস্তবে ফেরার পালা। আবার ভ্যানে করে এসে পড়লাম বারোবাজার মোড়ে। এবার যাত্রা শহর মোহাম্মদাবাদের পথে৷

“পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ঈমানের অংশ। দেশ ঘুরি,মাতৃভূমি কে পরিষ্কার রাখি।”

Source: Ashik Sarwar‎ < Travelers of Bangladesh (ToB)