Daily Archives

Monday, April 15, 2019

15 Apr 2019

একদিনে ঢাকা শহর থেকে ঘুরে আসা যায় এমন অনেক যায়গা আছে। তারমধ্যে তেওতা ভ্রমন নিয়ে তেমন পোস্ট এই গ্রুপে দেখা যায়না, কিংবা অনেকেই এই সুন্দর এলাকাটি সম্পর্কে জানেন না। আজ আপনাদের বলবো তেওতা জমিদার বাড়ী ভ্রমণ ও আরিচা থেকে পদ্মার টাটকা ইলিশ খাওয়ার গল্প। হ্যা আরিচা যমুনা নদীর তীরে। আর আরিচা থেকে ৫-৭ কিমি দূরে পদ্মা ও যমুনা নদীর মিলনস্থল।

দেশের পুরাকীর্তি স্থাপনার মধ্যে মানিকগঞ্জের তেওতা জমিদার বাড়ী ইতিহাস অন্যতম। মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর কূলঘেঁষা সবুজ-শ্যামল গাছপালায় ঢাকা তেওতা গ্রামটিকে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে দিয়েছে জমিদার শ্যামশংকর রায়ের প্রতিষ্ঠিত নবরত্ন মঠটি।

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার এই তেওতা গ্রামটি আরও বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী প্রমীলার স্মৃতি জড়িয়ে থাকায়। তেওতা গ্রামের মেয়ে প্রমীলা।

কীভাবে যাবেন?
প্রথমে গাবতলী চলে আসুন। গাবতলী থেকে আরিচা ঘাটে যায় এমন বাসে উঠে পড়ুন। ভাড়া ৯০-১০০ টাকা চাইবে, দরদাম করে নিলে ৭০-৮০ তেও রাজী হয়ে যাবে।

সরাসরি আরিচা ঘাটে যায় বি.আর.টি.সি, পদ্মা লাইন বাস। সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা মত।

কিছু কিছু বাস পাটুরিয়া যায়। যারা পাটুরিয়া কিংবা দুর পাল্লার বাসে উঠবেন তারা তারা উথুলি বাজার নেমে সেখান থেকে অটো/সিএনজি ধরে আরিচা ঘাটে চলে যাবেন। অটো ভাড়া ১০ টাকা প্রতিজন। সময় লাগবে ১০ মিনিট মত।

আবার ঢাকার নিউমার্কেট কলাবাগান, শ্যামলী হয়ে পাটুরিয়া পর্যন্ত নীলাচল বাস চলাচল করে। তারা উথুলি বাজার নেমে অটো/সিএনজি ধরে আরিচা ঘাটে চলে যাবেন।

আরিচা ঘাটে নেমে বিস্তৃত যমুনা নদী দেখতে পাবেন। সেখানে পানির শব্দ, পানির আছড়ে পড়া বিস্তৃত জলরাশি আপনাকে মুগ্ধ করবে। সেখানেই কাটিয়ে দিতে পারবেন অনেকটা সময়। চাইলে স্পিড বোটে করে নদীর ওপার কিংবা নদীর মাঝে জেগে উঠা চরে গিয়ে ঘুরে আসতে পারবেন। আপনার মন ভালো হতে বাধ্য।

এখানে ঘোরা হয়ে গেলে দুপুরের খাবার আরিচা ঘাটেই খেয়ে নেবেন, এবং অবশ্যই ইলিশ মাছ দিয়ে। খাবার আগে দামদর করে নিয়ে টাটকা ইলিশ ভেজে দিতে বলবেন। দাম হাতের নাগালেই। আর হ্যা এখানের পানি তেমন একটা ভালো লাগেনি, তাই সম্ভব হলে বোতলের পানি কিনে খাবেন।

তারপর আরিচা ঘাট/বাজার/বাসস্ট্যান্ড থেকে অটো বা সিএনজি করে তেওতা জমিদার বাড়ী যাবেন। ভাড়া ১০ টাকা জনপ্রতি। সময় ১০-১৫ মিনিট মত। এই ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য যাবার পথেই পাবেন। যে রাস্তা দিয়ে যাবেন সেই রাস্তার বাম পাশ থেকে শুরু হয়ে যমুনা নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি, যতদুর চোখ যায় ততদুর শুধু পানি আর পানি। আর রাস্তার ডানপাশে রাস্তার সাথে লাগোয়া সব টিনের বাড়ী। এ যেন আমাদের কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমাদের বন্ধুরা কেউ কেউ মজা করে বলছিলো গরীবের মেরিন ড্রাইভ। (এটার একটা ভিডিও দিলাম)

এই অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে আপনি পৌছে যাবেন তেওতা জমিদার বাড়ী। এই জমিদার বাড়ীর সামনে একটা বড় দিঘি আছে। দিঘিটা এখন বাধাই করা। এই দীঘিতে গোসল করতে আসতো প্রমীলা দেবী। কবি নজরুল ইসলামকে তিনি কবিদা বলে ডাকতেন। একদা প্রমীলা যখন বাড়ির পুকুরে গোসল করাতে যেত, তখন তার রূপে মুগ্ধ হয়ে কবি বলে উঠেন-
“তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়,
সেকি মোর অপরাধ”

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তেওতা জমিদার বাড়িটির বয়স ৩০০ বছর ছাড়িয়েছে। জেলার ইতিহাস থেকে জানা গেছে, সপ্তদশ শতকের শুরুতে পাচুসেন নামের পিতৃহীন দরিদ্র এক কিশোর তার সততা আর চেষ্টায় তামাকের ব্যবসা করে বিপুল ধন সম্পদ অর্জন করেন। দরিদ্র পাচুসেন দিনাজপুরের জয়গঞ্জে জমিদারী কিনে হয়ে যান পঞ্চানন সেন। তারপর শিবালয়ের তেওতায় তিনি এই জমিদার বাড়িটি তৈরি করেন।

জমিদার বাড়ির মূল ভবনের উত্তর দিকের ভবনগুলো নিয়ে হেমশংকর এস্টেট এবং দক্ষিন দিকের ভবনগুলো নিয়েছিল জয়শংকর এস্টেট। প্রতিটি এস্টেটের সামনে বর্গাকৃতির অট্টালিকার মাঝখানে আছে নাটমন্দির। পুবদিকের লালদিঘী বাড়িটি ছিল জমিদারদের অন্দর মহল। অন্দর মহলের সামনে দুটি শানবাঁধানো ঘাটলা, এর দক্ষিন পাশের ভবনের নীচে রয়েছে চোরা কুঠুরী যাকে এলাকার মানুষেরা বলে অন্ধকুপ। উত্তর ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ৪ তলা বিশিষ্ট ৭৫ ফুট উচ্চতার নবরত্ন মঠ। এর ১ম ও ২য় তলার চারদিকে আছে ৪টি মঠ। তেওতা জমিদার বাড়িটি ৭.৩৮ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই জমিদার বাড়ি।

সম্পুর্ন বাড়ী ও তার আশেপাশের আনুসাঙ্গিক জিনিস দেখতে দেখতে অনেকটা সময় অজান্তে কেটে যাবে।

বাড়ীটি দেখাশোনার কেউ আছে বলে তেমন মনে হলোনা, জরাজীর্ণ দেওয়াল, স্থানে স্থানে ভেঙ্গে যাওয়া, রঙ চটে যাওয়া, দেওয়ালে নানা রকম শ্যাওলা ও দেওয়াল ফেরে গাছ বেড়িয়ে গেছে। তাছাড়া যে যেমন পারছে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেখানে সেখানে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, বিরিয়ানির প্যাকেট কিংবা সিগারেট এর প্যাকেট ফেলে দিচ্ছে।

আমরা যারা ভ্রমণে যাচ্ছি সেখানে যদি একটু সাবধানতা অবলম্বন করি ও নোংরা না করি তাহলে এই ঐতিহাসিক স্থানটি আরো সৌন্দর্যময় হয়ে উঠতে পারে। তেওতা এলাকা ও জমিদার বাড়িটি নজরুল-প্রমীলার স্মৃতিধন্য একটি স্থান। এখানে নজরুলের বেশ কিছু স্মৃতি খুঁজে পাওয়া গেছে। তাই বাড়িটিকে কিছুটা সংস্করন ও সংরক্ষণ করে এর হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা দরকার। তাহলে খুব দ্রুতই এটা হতে পারে অন্যতম এক দর্শনীয় এক স্থান।

Source: দ্রীক্ক ধূম্রজাল‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)

15 Apr 2019

প্রথমে বলে নিচ্ছি গ্রুপে কোন এক ভাই পোস্ট দিয়েছিল রুট প্লান ..উনার কাছ থেকে ইন্সপায়ার হইয়া প্লান করছি…এছাড়া ও আমার ভিসা করা আছে ডাউকি পোর্ট দিয়ে ….আম রা তিন আছি …ঈদের ২য় দিন রাতে রউনা হব ইনশাআল্লাহ্‌ ..এর আগে অবশ্য আমরা মেঘালয় ঘুরে আসছি..যাই হউক আমাদের রুট প্লান বিস্তারিত :

1. ঈদের ২য় দিন রাত 10 টায় ইউনিক পরিবহন এ সিলেট কদমতলী ..ভোর 5 টায় পৌছাব ইন শা আল্লাহ
2.৩য় দিন সকালে ডাইরেট বাস এ তামাবিল বর্ডার ..30 মিনিট এর ইমিগ্রাশন শেষে ডাউকি বাজার ..এর পর লোকাল জিপ অথবা রিজার্ব টেক্সি নিয়া শিলং আঞ্জলী বাস স্টান্ড ….বাস স্টান্ড থেকে স্লিপার ভলভো তে শিলিগুড়ি ( 567 কি .মি)
3.৪র্থ দিন শিলি গুড়ি থেকে নাস্তা করে বাস বা কার করে রাংপো পারমিট অফিস হয়ে দেওরালী স্টান্ড .. তারপর অই খান হতে কার এ করে গ্যাংটক (116 কি.মি)
এরপর হোটেল এ রাত্রী যাপন
4. ৫ম দিন গ্যাংটক থেকে সাং গু এর পর সাইট সিন গ্যাংটক
5.৬ষ্ট দিন গ্যাং টক টু লাচুং ইয়ামতাং এর গাড়ি হোটেল ফুড প্যাকেজ এজেন্সির মাধ্যমে ( রাত্রীযাপন)
6. ৭ম দিন শিলিগুড়ি এবং শিলি গুড়ি টু শিলং .. ( রাত্রীযাপন)
7. ঈদের ৮ম দিন শিলং টু ডাউকি টু সিলেট টু ঢাকা
8. ঈদের ৯ম দিন ঢাকা
বি.দ্র. বাজেট পার পারসন 15 হাজার (বেশি হবে না এর থেকে আর ও কম হবে ..যত মানুষ তত কম)

Source: Tutul Ahmed Ajhor‎ <ToB Helpline

15 Apr 2019

একজন মানুষের ভাগ্য কতটা সুপ্রসন্ন হলে ভ্রমণের শেষে এসে এমন একজন মানুষের সাথে দেখা হতে পারে আমি এখনো ভেবে পাইনা। আর সেই প্রায় ভ্রমণ শেষের শুরুতে পেলাম কতশত অজানা তথ্য, শুনলাম রোমাঞ্চকর কত অভিজ্ঞতা, প্রাচীন, অপূর্ব, অভূতপূর্ব, অবিশ্বাস্য কিন্তু সত্যি শরীরে রোমে রোমে শিহরণ জাগানো এক গল্প।

আমার গোমুখ অভিযান শেষ করে দেরাদুন থেকে দিল্লী ফেরার পথে সেই দুর্লভ মানুষের সাথে বসে বসে করা অনেক গল্পের মাঝে এটি একটি। যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশী রোমাঞ্চিত করেছে, আলোড়িত করেছে, এখনো আবেশে জড়িয়ে রেখেছে। তবে মুল গল্পটা শুরু করার আগে সেই দুর্লভ মানুষটি সম্বন্ধে দুই একটি কথা না বললেই নয়।

দেরাদুন থেকে দিল্লীর শতাব্দী এক্সপ্রেস ট্রেন ছিল বিকেল ৪:৫০ এ। তাই সকাল থেকে দেরাদুন শহরের অলিগলি, রাস্তা-ঘাট, দোকান-পাট, পার্ক-ফুটপাথে হেটে হেটে ভাঁজা ভাঁজা করে শেষ দুপুরে ক্লান্ত শরীরে স্টেশনের ডরমেটরিতে ফিরলাম। ধীর লয়ে, অলস পায়ে গোসল করে ফ্রেস হয়ে জানালায় তাকিয়ে রইলাম মোবাইল চার্জে দিয়ে। তারপর পুরো দেরাদুন রেল স্টেশনটাকে খুব ভালো করে দেখে নিতে প্লাটফর্মের শেষ মাথায় আমার রুম থেকে শুরু পর্যন্ত হাটা শুরু করলাম। একবার পুরো স্টেশন এপাশ-ওপাশ করতেই ঘড়ির কাটা চারটা পেরিয়ে গেল।

রুমে ফিরে ব্যাগ কাঁধে করে নিজের কামরায় গিয়ে উঠলাম। নির্ধারিত সিট খুঁজে নিয়ে বসে পড়লাম। আমার সিট ছিল জানালার ধারে। অন্য সিটে এক নিপাট ভদ্রলোক বসে আছেন। তিনি একটু ঘুরে বসতেই আমার সিটে ঢুঁকে পরলাম। আমি বসতে বসতেই তিনি ফোনে অন্যপ্রান্তে কারো সাথে পুরো দুস্তর ইংরেজিতে শতভাগ ব্যবসায়ী কথাবার্তা বলতে লাগলেন। তবে তার কথাবার্তার অনেকটাই সদ্য ফেলে আশা হারশিল নিয়ে, যেটা তার কথার প্রতি আমাকে কিছুটা মনোযোগী করে তুলেছিল। কারন হারশিল আর হারশিলের আপেলের অরণ্য আমার হ্রদয়ে আসন গেঁড়ে ফেলেছে। এখানে আমাকে আবার আসতেই হবে। সেই গল্প মুগ্ধতার তো আছেই আলাদা করে।

ট্রেন ছেড়ে দিল যথা সময়ে। ট্রেনের টিকেটের সাথে যুক্ত বেশ ভালো মানের আর পরিমানের প্রাথমিক নাস্তা নিয়ে এলো। নাস্তা থেকেই আমাদের হালকা পরিচয় শুরু হল, সেই সাথে কত যে অজানা আর রোমাঞ্চে ভরপুর গল্পে পুরোটা সময় চোখের পলকে কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। কথায়, কথায় জানলাম আমি আর কোন ছাতার ট্রেকার বা সোলো ট্র্যাভেলার। আমি যদি নিজেকে ট্রেকার বলি, তবে তিনি তো এই জগতের কিংবদন্তী তুল্য। কত যে কঠিন কঠিন অজানা পথে তিনি তার গ্রুপ নিয়ে এক্সপ্লোর করেছেন সেই গল্প পরে বলবো অন্য কোনদিন। আজকে শুধু হারশিলের রোমাঞ্চকর ইতিহাসের গল্প।

ফ্রেডরিক উইলসন একজন ব্রিটিশ নাগরিক। সিপাহী বিদ্রোহের পরে তিনি কোন একটা কারনে দণ্ডপ্রাপ্ত হন। বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয় তার। কিন্তু তাকে সেই সময়ের প্রথা অনুযায়ী মৃত্যুর পরিবর্তে কোন জঙ্গলে নিজ থেকে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। ধরে নেয়া হত যে সেই সময় গহীন জঙ্গলে গিয়ে কেউই বেঁচে থাকতে পারবেনা। খাবারের অভাব, থাকার যায়গা, আর ভীষণ বৈরি আবহাওয়ায় কেউই নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবেনা।

সেই সাথে বন্য হিংস্র পশুর আক্রমণ তো আছেই। সুতরাং পূর্ণ জীবন পাবার কোন সম্ভাবনাই নেই। আজ বা কাল মৃত্যু জঙ্গলের এই শহুরে বাবুকে আলিঙ্গন করবেই। তবুও সেই সময় তিনি নিজের প্রান বাঁচাতে হারশিলের অরণ্য বেছে নিয়েছিলেন। প্রাথমিক ভাবে আশ্রয় নিয়েছিলেন ছোট্ট একটি গ্রামে। পরে একটা আশ্রয় আর বেঁচে থাকার জন্য কিছু কর্মের জন্য তেহরিকের রাজার সাথে দেখা করলেন। কিন্তু রাজা তার ব্রিটিশ আনুগত্যের কারনে উইলসনকে কোন প্রকার সাহায্য করতে পারলেননা বা চাইলেন না।

তারপর উইলসন নিজের সংস্থান নিজেই করার সিদ্ধান্ত নিলেন। হারসিলের অরণ্য থেকে গাছ কাটতে শুরু করলেন আর সেগুলোকে নদী পথে হৃষীকেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে লাগলেন। কারন হৃষীকেশে তখন রেল লাইন তৈরির জন্য ভালো কাঠ থেকে স্লিপার তৈরির কাজ করছিল ব্রিটিশরা। হৃষীকেশের সমিলের মালিকের সাথে বাৎসরিক চুক্তি করলেন উইলসন।

আর রাজাকে পঞ্চাশ পয়সা বাৎসরিক কর হিসেবে দিতে লাগলেন গাছ কাটার জন্য। কিন্তু এখানে প্রশ্ন এসে যাবে সেই সময়, এতো দুর্গম পথে কিভাবে এতো এতো বিশাল বিশাল গাছ হারশিল থেকে হৃষীকেশে পৌছাতে? রাজাও এই ভেবে অনুমোদন দিয়েছিলেন যে গাছ কাটে কিছু কাটুক, সেগুলো তো আর পৌছাতে পারবেনা কোথাও। নেবে কিভাবে? না আছে পথ, না আছে বাহন।

ঠিক এই যায়গাতেই ব্রিটিশ বুদ্ধির কাছে রাজার ভারতীয় বুদ্ধি মার খেয়ে গিয়েছিল। কারন, এক অভিনব উপায়ে বছরের পর বছর কাঠ হারশিল থেকে হৃষীকেশে পৌঁছে গিয়েছিল উইলসনের বুদ্ধিমত্তায়। উইলসন যেটা করেছিলেন সারা বছর গাছ কেটে কেটে জমিয়ে রাখতেন গঙ্গা বা ভাগরথী নদীতে বা তার আশেপাশে। আর বর্ষাকাল এলে নদী যখন প্রবল যৌবনা হয়, নদীর স্রোত যখন সব বাঁধা ভেঙে চুড়ে, পাহাড়, পাথর আর অনন্ত পথ পেরিয়ে যেত, ঠিক তখন জমিয়ে রাখা গাছ ও কাঠ নদীতে ভাসিয়ে দিতেন। হৃষীকেশে উইলসনের লোকজন সেগুলো তুলে নিতেন। সমিলে দিয়ে দিতেন রেলের স্লিপার বানানোর জন্য।

এভাবে অরণ্য উজাড় করতে করতে উইলসন এতো এতো সম্পদের মালিক হয়ে গেলেন যে, রাজাকেই তার অধিনস্ত করে ফেলেছিলেন! এমনকি স্থানীয় মুদ্রার সাথে নিজের নামে মুদ্রা পর্যন্ত চালু করেছিলেন। খুবই দুর্গম দুই পাহাড়ের দুরত্ত কমাতে তিনি শুধু কাঠ দিয়ে তৈরি করেছিলেন টোল ব্রিজ! সম্ভবত ভারতবর্ষের প্রথম টোল ব্রিজ। যে ব্রিজ পাহাড়ি ভাঙনে ভেঙে গেছে ঠিক-ই কিন্তু এখনো পাহাড়ি ভাঙনের মাঝে রয়ে গেছে সেই ব্রিজের অনেকাংশই।

যেখানে আর একটি নতুন সেতু তৈরি করা হয়েছে। হারশিলে তৈরি করেছিলেন বিশাল প্রাসাদ। মুশৌরিতে তৈরি করেছিলেন হোটেল যা এখনো ভারতীয় প্রশাসনিক ভবন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। হারশিল আর রাজা উইলসন বা পাহাড়ি উইলসনকে নিয়ে এমন নানা রকম গল্প, মিথ, রূপকথার মত অনেক কিছুই প্রচলিত ছিল, আছে পুরো হারশিল জুড়েই।

উইলসনের এসব কর্মকাণ্ডের জন্যই তিনি শুধু ফ্রেডেরিক ই উইলসন থেকে স্থানীয়ভাবে পাহাড়ি উইলসন নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। শুধু এই গল্পটি নয়, এমন রোমাঞ্চকর আরও কত গল্প যে শুনিয়েছেন আমার সেই সহযাত্রী। সেসব গল্প একটি গল্পে লিখে শেষ করার মত নয়, সেটা সম্ভবই নয়। আমার সেই সহযাত্রীর নাম আশু।

যিনি পুরো ট্রেনে, দেরাদুন থেকে দিল্লী আসার পথের ছয় ঘণ্টা এমন গল্পে, তার পাহাড়ের নেশা, ট্রেকিং প্রেম, অজানাকে জানার ভালোবাসা, নিজের ব্লগ, ক্লাব নিয়ে শত গল্পের মাঝে কখন যেন দিল্লী চলে এলাম বুঝতেই পারিনি। অবশেষে একে অন্যের সাথে ফেসবুকে বন্ধু হয়ে। বিদায় নিয়েছিলাম আবার কখনো দেখা হবে সেই প্রত্যাশায়।

হারশিল যেতেঃ কলকাতা থেকে প্লেন বা ট্রেনে দেরাদুন, দেরাদুন থেকে বাস বা জীপে হারশিল।

পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব সবার, সেটা মনে রাখবেন।

Source: Sajol Zahid‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)

15 Apr 2019

রাতের খাবারের পাট চুকিয়ে লঞ্চের ব্রিজে এসেছি কিছুক্ষণ হলো। এতক্ষণে যারা ঘুমোবার ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার মতন গুটিকতক লোক হয়ত জেগে সুন্দরবনের রাতের রোমাঞ্চ উপভোগ করছে, তবে ব্রিজটাকে মোটামুটি জনশূন্যই বলা চলে। কেবল দুপাশের সোফাদুটো দু’জনে দখল করে বসে আছি। ভদ্রলোকের কথায় নড়েচড়ে বসলাম। আমার কেবিনটা স্টারবোর্ডের দিকে, সুতরাং এপাশটার সোফায় একটা অধিকার জন্মে গেছে। রাতে এপাশটায় যখন আসি তখন মোজা পরে, গরম কাপড়ে আপাদমস্তক ঢেকে ক্যামেরাটা কোলে নিয়েই বসি। ধূমপানের অভ্যেস নেই কিন্তু কড়া কফিটার অভাববোধ করি বেশ।

মাহফুজ ভাই আছেন আমার উল্টোপাশে, পোর্টহোলের দিকে, কাজেই হরিণ দেখার লোভে কনকনে শীতের মাঝেও সোফার আরামদায়ক ওম ছেড়ে উঠতে হল। তীর থেকে এক/দেড়শো গজ দূরে নোঙর করে আছি আমরা। তীরের কাছটা বেজায় অন্ধকার। আকাশে হলুদাভ চাঁদটা কেমন যেন মলিন একটা আলো ছড়াচ্ছে, ভালোমতো দেখা যায় না সব। ওর মধ্যেই চিত্রগ্রাহক ভদ্রলোক কি খুঁজে পেলেন আল্লাহ মালুম, তবে তার চোখের তারিফ করতেই হবে। অন্ধকার চোখে সয়ে আসতেই দেখলাম কিছু একটা নড়ছে। অবয়ব বোঝা যায় শুধু, এর বেশী কিছু না।

শ’খানেক গজ দূরে একটা ট্যুরিস্ট লঞ্চ জেনারেটর ছেড়ে রেখেছিলো। হরেক রকমের বাতি দিয়ে সাজানোয় দেখে মনে হচ্ছিলো যেন পার্টি চলছে। মাহফুজ ভাই শুধু মাঝে মাঝেই বিড়বিড়িয়ে তাদের চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছিলেন। জেনারেটরের শব্দে নিশাচরদের কেউ আশ পাশে থাকলে নির্ঘাত পালিয়ে গেছে। আজকের রাতটা বেকার জেগে থাকা হবে মনে হচ্ছে। কাজেই রাতের প্রকৃতি দর্শনের বদলে ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করলাম। আগামী ক’টা দিন লঞ্চভর্তি একদল লোকের সঙ্গে থাকতে হবে অথচ কাউকেই চিনি না। এদিকে গায়ে পড়ে খাতির জমানোও আমার জন্য রীতিমতো মর্মান্তিক ব্যাপার। তারপরেও আলাপ কিন্তু জমে উঠলো।

মাহফুজ ভাই সদালাপী ভদ্রলোক। চারুকলা থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন কিছুদিন হলো। বিয়ে থা করেননি। দুর্দান্ত সাইকেল চালান। সময় পেলেই এদিক ওদিক বেরিয়ে পড়েন। তার ওপর শখের ফিল্মমেকার। এদিকে আমার নিজের পরিচয় দেবার মতন তেমন কিছু নেই। অনাহুত প্রশ্ন বাদ দিয়ে ভদ্রলোক যে আমার সাথে প্রকৃতি দর্শন নিয়ে মেতে উঠলেন, আমার জন্য সেটাও কম স্বস্তির নয়। কথার ফাঁকে ফাঁকে নদীতে আলো ফেলে দেখছিলাম কুমির ভেসে যাচ্ছে কি না। মনে পড়ে গেলো, কোন একসময় জলে ছলাৎ করে একটু বেশী শব্দ হওয়ায় মাহফুজ ভাই লঞ্চের রেলিং থেকে সরে এলেন। আমি আশ্বস্ত করলাম, বাঘের মতন ভারী কোন জানোয়ার রেলিং বেয়ে লঞ্চে উঠলে সেটা একপাশে কাত হয়ে যাবেই, অযথা আতংকিত হবার কিছু নেই। মাহফুজ ভাই আমার দিকে পাথর দৃষ্টি হেনে বললেন,
: এখানে কোন কিছুর ভরসা নেই।

মিথ্যে বলব না, মাহফুজ ভাইয়ের বিশ্বাস দেখে আমার যৎসামান্য বাঘ বিষয়ক জ্ঞানও কেমন যেন গুবলেট হয়ে গেলো। ভয় সংক্রমিত হবার জিনিস। আমিও রেলিং থেকে একটু পিছিয়ে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দিলাম। যে জঙ্গলে বাঘ আছে সেটার ভাব গাম্ভীর্যই আলাদা, সবসময়ই কেমন যেন সতর্ক থাকতে হয়। এখানে এক মুহূর্তের অসতর্কতায় মৃত্যু নেমে আসতে পারে। সতর্কতাই এখানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝের সন্ধিরেখা। জঙ্গল অসতর্ককে ক্ষমা করে না।

রাত গড়িয়েছে অনেকটা। চাঁদটাও হলদেটে ভাবটা ছাড়িয়ে ঝলমলে হয়ে এসেছে। শিশিরে ভেজা গাছপালা সেই আলোয় চকচক করছে। তীরের কাছটা চাঁদের আলোয় পরিস্কার ফুটে উঠেছে, একদম ঝকঝকে। যেখানটায় গাছের ছায়া পড়েছে সেখানে কেমন যেন দুধ্লা অন্ধকার। রাতে বানর নামে না, অনুমান করলাম কাঁকড়ার দল নিশ্চিন্তে চরে বেড়াচ্ছে। এক/আধটা সাহসী বুনো শুয়োর মাঝে সাঝে ছায়ার কাভার ছেড়ে বেরিয়ে আসছে দাঁত দিয়ে মাটি খুঁড়ে রসালো মূল খাবার আশায়। হরিণগুলো তুলনামূলক ভীরু প্রকৃতির, ছায়া ছেড়ে কিছুতেই বের হচ্ছে না। রাতের আঁধারে ওগুলোর চোখ জ্বলতে দেখেই কেবল উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। যাক, রাতের অতিথিরা আসতে শুরু করেছে। আমরা দু’জন চাতক পাখির মতন বসে রইলাম বাঘ দেখব বলে। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তেমন কিছুই ঘটলো না। শেষরাতের দিকে কেবল বিশালাকার একটা পেঁচা দেখলাম। Wood Owl এর সব প্রজাতির চিন্তাভাবনা মাথা থেকে দূর করে দিলাম। ওই সৌভাগ্য নিয়ে আমি আসিনি, কোন ধরণের Fish Owl হবে হয়ত। রাজসিক ভঙ্গিতে ডানা মেলে তীরের দিকে একটা ডাইভ দিয়ে হারিয়ে গেলো উত্তরের গহীন জঙ্গলে।

শিকার পেয়েছে কি না বোঝা গেলো না, পেয়ে থাকলেও শিকারের অন্তিম আর্তনাদ হতচ্ছাড়া জেনারেটর খেয়ে ফেলেছে। আরো একবার ট্যুরিস্ট লঞ্চবাসীদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা গেলো। মাহফুজ ভাই উঠে গেলেন লঞ্চের ছাদে, ছায়াপথটা খানিক সময়ের জন্য দৃশ্যপটে উন্মুক্ত হয়েছে, ছবি তোলার মোক্ষম সময়। আমিও পিছু নিলাম। সারা আকাশ জুড়েই আলোর পসরা সাজিয়ে বসেছে তারার দল। কোথায় পাবো এমন আকাশ? দূরে কোথাও আযান হচ্ছিলো। সুন্দরবনের কোন গহীনে দু/চার ঘর মিলে হয়তো গড়ে উঠেছে কোন মহল্লা। তারই কোন মসজিদে শোনা যাচ্ছে আযান। একসময় পুব আকাশ আভাস দিলো সূর্যোদয়ের। একটা দুটো ওরিয়ল মিঠে গলায় ডাক শুরু করেছে কেবল। ক্ষণিক নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে দিয়ে জলের খুব নীচু দিয়ে একঝাঁক জিরিয়া ফড়ফড় করে উড়ে গেলো। এর কিছুক্ষণ পরই একদল টিয়া ছোট্ট সবুজ মেঘের মতন একজোট হয়ে উড়াল দিলো পূবে। প্রভাতের আকাশে নানান রঙে কোথায় যেন মিশে দিকচক্রবালে হারিয়ে গেলো সব।

অলসতা করে অপচনশীল দ্রব্য যত্রতত্র ফেলে পরিবেশ ও প্রকৃতি নষ্ট করবেন না। বাংলাদেশে বনভূমির পরিমান মাত্র ৬.২৫ শতাংশ (আদর্শ মান ২৫ শতাংশ), সেটাও যদি আমরা নষ্ট করে ফেলি!!!!

source:  Razib Ahmed‎<Travelers of Bangladesh (ToB)