একজন মানুষের ভাগ্য কতটা সুপ্রসন্ন হলে ভ্রমণের শেষে এসে এমন একজন মানুষের সাথে দেখা হতে পারে আমি এখনো ভেবে পাইনা। আর সেই প্রায় ভ্রমণ শেষের শুরুতে পেলাম কতশত অজানা তথ্য, শুনলাম রোমাঞ্চকর কত অভিজ্ঞতা, প্রাচীন, অপূর্ব, অভূতপূর্ব, অবিশ্বাস্য কিন্তু সত্যি শরীরে রোমে রোমে শিহরণ জাগানো এক গল্প।

আমার গোমুখ অভিযান শেষ করে দেরাদুন থেকে দিল্লী ফেরার পথে সেই দুর্লভ মানুষের সাথে বসে বসে করা অনেক গল্পের মাঝে এটি একটি। যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশী রোমাঞ্চিত করেছে, আলোড়িত করেছে, এখনো আবেশে জড়িয়ে রেখেছে। তবে মুল গল্পটা শুরু করার আগে সেই দুর্লভ মানুষটি সম্বন্ধে দুই একটি কথা না বললেই নয়।

দেরাদুন থেকে দিল্লীর শতাব্দী এক্সপ্রেস ট্রেন ছিল বিকেল ৪:৫০ এ। তাই সকাল থেকে দেরাদুন শহরের অলিগলি, রাস্তা-ঘাট, দোকান-পাট, পার্ক-ফুটপাথে হেটে হেটে ভাঁজা ভাঁজা করে শেষ দুপুরে ক্লান্ত শরীরে স্টেশনের ডরমেটরিতে ফিরলাম। ধীর লয়ে, অলস পায়ে গোসল করে ফ্রেস হয়ে জানালায় তাকিয়ে রইলাম মোবাইল চার্জে দিয়ে। তারপর পুরো দেরাদুন রেল স্টেশনটাকে খুব ভালো করে দেখে নিতে প্লাটফর্মের শেষ মাথায় আমার রুম থেকে শুরু পর্যন্ত হাটা শুরু করলাম। একবার পুরো স্টেশন এপাশ-ওপাশ করতেই ঘড়ির কাটা চারটা পেরিয়ে গেল।

রুমে ফিরে ব্যাগ কাঁধে করে নিজের কামরায় গিয়ে উঠলাম। নির্ধারিত সিট খুঁজে নিয়ে বসে পড়লাম। আমার সিট ছিল জানালার ধারে। অন্য সিটে এক নিপাট ভদ্রলোক বসে আছেন। তিনি একটু ঘুরে বসতেই আমার সিটে ঢুঁকে পরলাম। আমি বসতে বসতেই তিনি ফোনে অন্যপ্রান্তে কারো সাথে পুরো দুস্তর ইংরেজিতে শতভাগ ব্যবসায়ী কথাবার্তা বলতে লাগলেন। তবে তার কথাবার্তার অনেকটাই সদ্য ফেলে আশা হারশিল নিয়ে, যেটা তার কথার প্রতি আমাকে কিছুটা মনোযোগী করে তুলেছিল। কারন হারশিল আর হারশিলের আপেলের অরণ্য আমার হ্রদয়ে আসন গেঁড়ে ফেলেছে। এখানে আমাকে আবার আসতেই হবে। সেই গল্প মুগ্ধতার তো আছেই আলাদা করে।

ট্রেন ছেড়ে দিল যথা সময়ে। ট্রেনের টিকেটের সাথে যুক্ত বেশ ভালো মানের আর পরিমানের প্রাথমিক নাস্তা নিয়ে এলো। নাস্তা থেকেই আমাদের হালকা পরিচয় শুরু হল, সেই সাথে কত যে অজানা আর রোমাঞ্চে ভরপুর গল্পে পুরোটা সময় চোখের পলকে কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। কথায়, কথায় জানলাম আমি আর কোন ছাতার ট্রেকার বা সোলো ট্র্যাভেলার। আমি যদি নিজেকে ট্রেকার বলি, তবে তিনি তো এই জগতের কিংবদন্তী তুল্য। কত যে কঠিন কঠিন অজানা পথে তিনি তার গ্রুপ নিয়ে এক্সপ্লোর করেছেন সেই গল্প পরে বলবো অন্য কোনদিন। আজকে শুধু হারশিলের রোমাঞ্চকর ইতিহাসের গল্প।

ফ্রেডরিক উইলসন একজন ব্রিটিশ নাগরিক। সিপাহী বিদ্রোহের পরে তিনি কোন একটা কারনে দণ্ডপ্রাপ্ত হন। বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয় তার। কিন্তু তাকে সেই সময়ের প্রথা অনুযায়ী মৃত্যুর পরিবর্তে কোন জঙ্গলে নিজ থেকে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। ধরে নেয়া হত যে সেই সময় গহীন জঙ্গলে গিয়ে কেউই বেঁচে থাকতে পারবেনা। খাবারের অভাব, থাকার যায়গা, আর ভীষণ বৈরি আবহাওয়ায় কেউই নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবেনা।

সেই সাথে বন্য হিংস্র পশুর আক্রমণ তো আছেই। সুতরাং পূর্ণ জীবন পাবার কোন সম্ভাবনাই নেই। আজ বা কাল মৃত্যু জঙ্গলের এই শহুরে বাবুকে আলিঙ্গন করবেই। তবুও সেই সময় তিনি নিজের প্রান বাঁচাতে হারশিলের অরণ্য বেছে নিয়েছিলেন। প্রাথমিক ভাবে আশ্রয় নিয়েছিলেন ছোট্ট একটি গ্রামে। পরে একটা আশ্রয় আর বেঁচে থাকার জন্য কিছু কর্মের জন্য তেহরিকের রাজার সাথে দেখা করলেন। কিন্তু রাজা তার ব্রিটিশ আনুগত্যের কারনে উইলসনকে কোন প্রকার সাহায্য করতে পারলেননা বা চাইলেন না।

তারপর উইলসন নিজের সংস্থান নিজেই করার সিদ্ধান্ত নিলেন। হারসিলের অরণ্য থেকে গাছ কাটতে শুরু করলেন আর সেগুলোকে নদী পথে হৃষীকেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে লাগলেন। কারন হৃষীকেশে তখন রেল লাইন তৈরির জন্য ভালো কাঠ থেকে স্লিপার তৈরির কাজ করছিল ব্রিটিশরা। হৃষীকেশের সমিলের মালিকের সাথে বাৎসরিক চুক্তি করলেন উইলসন।

আর রাজাকে পঞ্চাশ পয়সা বাৎসরিক কর হিসেবে দিতে লাগলেন গাছ কাটার জন্য। কিন্তু এখানে প্রশ্ন এসে যাবে সেই সময়, এতো দুর্গম পথে কিভাবে এতো এতো বিশাল বিশাল গাছ হারশিল থেকে হৃষীকেশে পৌছাতে? রাজাও এই ভেবে অনুমোদন দিয়েছিলেন যে গাছ কাটে কিছু কাটুক, সেগুলো তো আর পৌছাতে পারবেনা কোথাও। নেবে কিভাবে? না আছে পথ, না আছে বাহন।

ঠিক এই যায়গাতেই ব্রিটিশ বুদ্ধির কাছে রাজার ভারতীয় বুদ্ধি মার খেয়ে গিয়েছিল। কারন, এক অভিনব উপায়ে বছরের পর বছর কাঠ হারশিল থেকে হৃষীকেশে পৌঁছে গিয়েছিল উইলসনের বুদ্ধিমত্তায়। উইলসন যেটা করেছিলেন সারা বছর গাছ কেটে কেটে জমিয়ে রাখতেন গঙ্গা বা ভাগরথী নদীতে বা তার আশেপাশে। আর বর্ষাকাল এলে নদী যখন প্রবল যৌবনা হয়, নদীর স্রোত যখন সব বাঁধা ভেঙে চুড়ে, পাহাড়, পাথর আর অনন্ত পথ পেরিয়ে যেত, ঠিক তখন জমিয়ে রাখা গাছ ও কাঠ নদীতে ভাসিয়ে দিতেন। হৃষীকেশে উইলসনের লোকজন সেগুলো তুলে নিতেন। সমিলে দিয়ে দিতেন রেলের স্লিপার বানানোর জন্য।

এভাবে অরণ্য উজাড় করতে করতে উইলসন এতো এতো সম্পদের মালিক হয়ে গেলেন যে, রাজাকেই তার অধিনস্ত করে ফেলেছিলেন! এমনকি স্থানীয় মুদ্রার সাথে নিজের নামে মুদ্রা পর্যন্ত চালু করেছিলেন। খুবই দুর্গম দুই পাহাড়ের দুরত্ত কমাতে তিনি শুধু কাঠ দিয়ে তৈরি করেছিলেন টোল ব্রিজ! সম্ভবত ভারতবর্ষের প্রথম টোল ব্রিজ। যে ব্রিজ পাহাড়ি ভাঙনে ভেঙে গেছে ঠিক-ই কিন্তু এখনো পাহাড়ি ভাঙনের মাঝে রয়ে গেছে সেই ব্রিজের অনেকাংশই।

যেখানে আর একটি নতুন সেতু তৈরি করা হয়েছে। হারশিলে তৈরি করেছিলেন বিশাল প্রাসাদ। মুশৌরিতে তৈরি করেছিলেন হোটেল যা এখনো ভারতীয় প্রশাসনিক ভবন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। হারশিল আর রাজা উইলসন বা পাহাড়ি উইলসনকে নিয়ে এমন নানা রকম গল্প, মিথ, রূপকথার মত অনেক কিছুই প্রচলিত ছিল, আছে পুরো হারশিল জুড়েই।

উইলসনের এসব কর্মকাণ্ডের জন্যই তিনি শুধু ফ্রেডেরিক ই উইলসন থেকে স্থানীয়ভাবে পাহাড়ি উইলসন নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। শুধু এই গল্পটি নয়, এমন রোমাঞ্চকর আরও কত গল্প যে শুনিয়েছেন আমার সেই সহযাত্রী। সেসব গল্প একটি গল্পে লিখে শেষ করার মত নয়, সেটা সম্ভবই নয়। আমার সেই সহযাত্রীর নাম আশু।

যিনি পুরো ট্রেনে, দেরাদুন থেকে দিল্লী আসার পথের ছয় ঘণ্টা এমন গল্পে, তার পাহাড়ের নেশা, ট্রেকিং প্রেম, অজানাকে জানার ভালোবাসা, নিজের ব্লগ, ক্লাব নিয়ে শত গল্পের মাঝে কখন যেন দিল্লী চলে এলাম বুঝতেই পারিনি। অবশেষে একে অন্যের সাথে ফেসবুকে বন্ধু হয়ে। বিদায় নিয়েছিলাম আবার কখনো দেখা হবে সেই প্রত্যাশায়।

হারশিল যেতেঃ কলকাতা থেকে প্লেন বা ট্রেনে দেরাদুন, দেরাদুন থেকে বাস বা জীপে হারশিল।

পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব সবার, সেটা মনে রাখবেন।

Source: Sajol Zahid‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)