অনেকের ধারণা বিদেশ ভ্রমণে অনেক অর্থের প্রয়োজন।কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে হাতে হাতে ৮-১০০০০ টাকা থাকলে ভারতবর্ষের অনেক জায়গা দেখে আসা সম্ভব।গত ০১-০২-২০১৯ ইং তারিখে আমার দ্বিতীয় বারের মত ভারত ভ্রমণে সেই অভিজ্ঞতাটাই পাকাপোক্ত হল।
দিল্লী ভ্রমণের জন্য আপনার পাসপোর্ট ভিসা যদি রেডি থাকে তাহলে বেড়িয়ে পড়ুন যশোর বেনাপোল বর্ডারের উদ্দেশ্যে।বর্ডারে পৌঁছার সাথে সাথে দালালরা ছেকে ধরবে আপনাকে।টাকার বিনিময়ে ইমিগ্রেশন পার করে দিতে চাইবে।মনে রাখবেন এরা চরম লেভেলের বাটপার।এদের কথায় কান না দিয়ে সবকিছু নিজেই করার চেষ্টা করুন,দেখবেন খুব সুন্দর ভাবে ইমিগ্রেশন শেষ হয়ে যাবে।এক্ষেত্রে আপনার শুধুমাত্র ৫৪০ টাকা ট্রাভেল ট্যাক্স দিতে হবে।ট্রাভেল ট্যাক্স দেয়ার বুথ ইমিগ্রেশন অফিসের মধ্যেই পাবেন।

ইমিগ্রেশন শেষ করে সেখান থেকেই টাকা ভাঙিয়ে রুপী করে নিন।এরপর সেখান থেকে বের হয়েই পেয়ে যাবেন বনগাঁ যাওয়ার অটো।৩০ রূপিতে বনগাঁ যেয়ে সেখান থেকে ট্রেনে ২০ রূপিতে চলে যান শিয়ালদাহ।এর পরের কাজ হবে দিল্লী যাওয়ার টিকিট নিশ্চিত করা।টিকিট কাটার জন্য বাসে চলে যান ডালহৌসি ফেরলি প্লেসে।ফেয়ারলি প্লেস হল ইস্টার্ণ রেলওয়ের হেডঅফিস এবং ফরেনারদের জন্য ট্রেনের টিকিট বুক করার জায়গা।দিল্লী যাওয়ার নন এসি স্লিপার টিকিটের দাম ৮৮৫ রূপি।ফেয়ারলি প্লেসে পরেরদিন বিকালে দিল্লী যাওয়ার টিকিট বুক করে চলে যান বড়বাজার যাকারিয়া স্ট্রীট।যাকারিয়া স্ট্রীটে ৬০০-৮০০ টাকার মধ্যে ডাবল বেডের রুম পেয়ে যাবেন।ইচ্ছা করলে নিউমার্কেট এলাকাতেও যেতে পারবেন।তবে সেখানে রুমের রেট অনেক বেশি।১৫০০-২০০০ এর নিচে কোন রুম পাবেন না।বড়বাজার ফেয়ারলি প্লেসের কাছেই।হেটেই চলে যেতে পারবেন।রুম ঠিক করার পর এবার সিম কেনার পালা।দেখে শুনে পছন্দ মত একটি সীম কিনে সেদিনের মত রেস্ট করুন।

পরদিন সকালবেলা নাস্তা করে বেড়িয়ে পড়ুন কলকাতা শহর দেখার জন্য।কলকাতা শহর একদিনে পুরোটা দেখা সম্ভব না।তাই বেছে বেছে কিছু জায়গা দেখতে পারেন।কলকাতা ময়দানের আশে পাশে বেশকিছু জায়গা আছে দেখার মত।যা দেখতেই পুরো একদিন লেগে যাবে।এরমধ্যে আছে টিপু সুুলতান মসজিদ,সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল,ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল,ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম সহ বেশকিছু জায়গা।গুগল ম্যাপের সাহায্য নিয়ে জায়গা গুলো দেখে ফেলতে পারেন।যাকরিয়া স্ট্রীটের পাশে মহাত্মা গান্ধী মেট্রো বা সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশন থেকে মাত্র ৫ রূপি টিকিটে খুব সহজেই আন্ডার গ্রাউন্ড মেট্রো রেলে চলে যেতে পারবেন ময়দান।তবে ময়দান স্টেশনে না নেমে এসপ্লানেড স্টেশনে নামলে আপনার স্পট গুলো সিরিয়ালি দেখতে সুবিধা হবে।

আপনার ট্রেন যদি হাওড়া থেকে হয় তবে সারাদিন কলকাতা শহর ঘুড়ে ট্রেনের সময়ের ১ ঘন্টা আগেই চলে আসুন হওড়া স্টেশনে।স্টেশনের পাশেই ঐতিহাসিক হওড়া ব্রিজ।ব্রিজের নিচে কিছুক্ষণ হুগলি নদীর চমৎকার আবহাওয়া উপভোগ করে রওনা দিন দিল্লীর উদ্দেশ্যে।
দিল্লীতে নেমে হোটেলের জন্য চলে যান পাহাড়গঞ্জ।এখানে পেয়ে যাবেন ৬০০-আনলিমিটেড রেটের মধ্যে হোটেল।হোটেল নেয়ার সময় অবশ্যই দরদাম করে নিবেন।শুধু হোটেলে না, দিল্লীতে রিকশা থেকে শুরু করে প্রতিটা ক্ষেত্রেই দরাদরি আবশ্যক।আপনি বাইরে থেকে এসেছেন এটা যেই বুঝবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই আপনাকে ঠকাতে চাইবে।সুতরাং এদিকটা খেয়াল রাখবেন।ইচ্ছা করলে চাদনি চক এলাকাতেও হোটেল নিতে পারেন।এটা মুসলিম প্রধান এলাকা এবং হোটেল ভাড়াও অনেক কম।ও আরাকটি বিষয় হল নিউদিল্লী স্টেশনে ফরেন কোটার টিকিট পাওয়া যায়।সুতরাং এখান থেকে রিটার্ণ টিকিট নিতে ভুলবেন না।

দিল্লী এতবড় শহর যা আসলে এক সপ্তাহেও দেখে শেষ করা সম্ভব নয়।তবে একটু টেকনিক করে ঘুড়লে ৩ দিনে অনেকটাই দেখা সম্ভব।দিল্লীর মূল স্পট গুলোর মধ্যে রয়েছে জামা মসজিদ,লাল কেল্লা,পুরানা কেল্লা,কুতুব মিনার,হুমায়ুনস টোম্ব,চাদনি চক,ইন্ডিয়া গেট,আকসার ধাম,বিড়লা মন্দির,লোটাস টেম্পল,জন্তর-মন্তর,লোদি গার্ডেন,নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগাহ,রাষ্ট্রপতি ভবন,রাজঘাট,সফদারজঙ্গ টোম্ব ইত্যাদি।আমার সফরে অবশ্য আবহাওয়া খারাপ থাকায় আমি জন্তর-মন্তর,আকসার ধাম ও সফদরজঙ্গ টোম্বে যেতে পারি নি।এসব জায়গায় যাওয়ার জন্য আপনি জায়গা গুলোকে তিনভাগে ভাগ করবেন।অর্থাৎ কাছাকাছি স্পটগুলো কে এক করে তিনটি গ্রুপ করবেন তাহলে তিন দিনে তিনটি গ্রুপ দেখে শেষ করতে পারবেন।এক্ষেত্রে গুগল ম্যাপের সাহায্য নিতে পারেন।স্পটগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রপতি ভবনে অবশ্যই সন্ধ্যার সময় যাবেন।রাষ্ট্রপতি ভবনে রাতের লাইটিং দেখে আপনি মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না।

দিল্লী শেষে এবার আগ্রার পালা।আগ্রাতে অনেক ভাবেই যাওয়া যায়।আপনি চাইলে ট্রেনে বা বাসে আগ্রা যেতে পারবেন।অথবা দিল্লী থেকে ট্যুরিস্ট এজেন্সির মাধ্যমে যেতে পারবেন।এরা সকালে রওনা হয়ে সারাদিন আগ্রা ঘুড়ে আবার দিল্লীতে পৌঁছে দেবে আপনাকে।আমি এদের সাথেই গিয়েছিলাম।তবে আমি আপনাকে এদের মাধ্যমে যেতে নিষেধ করব।কারণ এদের সাথে গেলে আপনি মনমত দেখতে পারবেন না।পুরো আগ্রা দেখার জন্য একরাত আগ্রাতে থাকা আবশ্যক।আমি তো মনে করি তাজমহল এমন এক জায়গা যা সারাদিন বসে থেকে দেখলেও মন ভরবে না।যাই হোক আগ্রার মূল জায়গা গুলো হল আগ্রা ফোর্ট,তাজমহল এবং ফতেহপুর সিক্রি এবং সিকান্দ্রার আকবরের টোম্ব।তবে এর বাইরেও আরও কিছু স্পট রয়েছে।দিল্লী থেকে এজেন্টদের সাথে গেলে ওরা ফতেহপুর সিক্রী ও সিকান্দ্রা দেখাবে না।তাই এদের সাথে না যাওয়াই ভাল।
আগ্রা ভ্রমণ শেষে আবারও চলে আসুন দিল্লী অথবা সোজা আগ্রা থেকেও সরাসরি ট্রেনে চলে যেতে পারেন কলকাতা।

এখানে একটি বিষয় বলে রাখা ভালো আমার ট্যুর প্লান ছিল মূলত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল দেখা।অর্থাৎ দিল্লী-আগ্রা-জয়পুর দেখা।কিন্তু ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় জয়পুর যাওয়া সম্ভব হয় নি।আপনি চাইলে জয়পুরকে আপনার ট্যুরে যোগ করে নিতে পারেন।সেক্ষেত্রে আগ্রা থেকে দিল্লী বা কলকাতা না যেয়ে জয়পুর হয়ে দিল্লী বা কলকাতা যেতে পারেন।

source:  রিয়াদ মোর্শেদ‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)