হটাৎ একদিন সান্ধ্য আড্ডায় ঠিক হল সপ্তাহান্তে কাছাকাছি কোথাও বেরিয়ে এলে মন্দ হয় না। কাছাকাছি যাওয়ার মতো জায়গা কলকাতার আশেপাশে কোথায় আছে সে নিয়ে বিশেষ আলোচনা চললো । কেউ একজন বলে উঠলো নেতারহাটে যাওয়া যেতে পারে,বাকি সবাই বেশ আগ্রহ ও প্রকাশ করল। কিভাবে যাওয়া যেতে পারে দুদিন বেড়ানোর জন্য ঠিক জায়গা হবে কিনা। শেষমেশ ঠিক হলো এবার আমরা বাইক এ যাবো , দূরত্ব ও বেশী নয় মাত্র ৫৫০ কিলোমিটার, একদিনেই পৌঁছে যাওয়া যাবে। একদিন দু-রাত থেকে পরের দিন আবার কলকাতা ফেরত আসা যাবে। গুগলে সার্চ করে রাস্তার একটা ধারণা করে নিলাম কলকাতা থেকে কোলাঘাট হয়ে মেদিনীপুর ধরে সোজা জঙ্গলমহল, ওখান থেকে ঘাটশিলা হয়ে জামসেদপুর তারপর দলমা হয়ে সোজা রাঁচি বাইপাস, ওখান থেকে লোহারদাগা হয়ে একদম নেতারহাটে।

অনলাইনে হোটেল ও বুক করে ফেলা হলো । ঝাড়খণ্ড ট্যুরিজম এর ওয়েবসাইটে গিয়ে খুব সহজেই খুঁজে পেলাম হোটেল প্রভাত বিহার, রেটিং ও খুব ভালো দেখলাম আর খরচ ও আমাদের একদম বাজেটের মধ্যে। ৬ জনের জন্য দুটো রুম এর ভাড়া ৭২০০ ট্যাক্স সহ । আমাদের দুটো এক্স্ট্রা বেড নিতে হয়েছিল যেটা বেড প্রতি ৩০০ টাকা মতো এক্স্ট্রা চার্জ করেছিল।

এবারে ব্যাগ গোছানোর পালা। বাইক যেহেতু বাহন খুব জরুরী জিনিস পত্তর ই নেয়া হলো। তিনটে বাইক ছয় জন আরোহী।শনিবার ভোর ৪ টে নাগাদ কলকাতা থেকে বেরিয়ে পড়লাম নেতারহাট এর দিকে । হাইওয়েতে বড়ো বড়ো ট্রাক গুলো কে পাস কাটিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া খেতে খেতে এগিয়ে চললাম। কোলাঘাট এসে প্রথম থামা হলো , হাইওয়ের ধারের ধাবা গুলো বেশ ভালো চা বানায়। শের ই পাঞ্জাব তো খুব বিখ্যাত ধাবা। চা পান করে আবার এগিয়ে চললাম হাইওয়ে ধরে। সকালের আবছা আলো আর লম্বা হাইওয়ে চারপাশে শুধু সাঁ সাঁ গাড়ির আওয়াজ ।চারপাশে হালকা কুয়াশার চাদর এ মোড়া , আকাশ ফুটে লাল সূর্য আস্তে আস্তে উকি মারছে অসাধারণ অনুভূতি। যতটা সময় আমরা ভেবেছিলাম তার থেকে অনেকটা বেশি সময় লাগছিলো। জঙ্গলমহলে ঢুকলাম প্রায় সকাল ৯.৩০ এর দিকে। উঁচু নিচু ঢেউ খেলানো রাস্তা দুপাশে সবুজ বনানী কেটে এগিয়ে চলেছে। কিছু জায়গায় রাস্তা বাড়ানোর কাজ চলছে দেখলাম। আমরা বেশ খানিকক্ষণ একটু জিরিয়ে নিলাম গাছের ছায়া আর মৃদু শীতল বাতাসে। চার পাশে মহুয়ার গন্ধ মাতাল করা এক পরিবেশ। সন্ধ্যের একটু পর পর রামপুর পৌঁছে গেলাম। তারপর রাস্তা একদম ফাঁকা । ভেবে ছিলাম রাত ১১ টার দিকে হোটেল এ পৌঁছে যাবো। লোহারদাগা পৌঁছলাম প্রায় রাত ১.৩০। এর পর শুরু হলো পাহাড়ি পথ। দু একটা শিয়াল ছাড়া কেউ কোথাও নেই। হোটেল এ পৌঁছলাম রাত ২.৩০। ফোন করে বলাই ছিল তো ঢুকতে অসুবিধা হয়নি। সবাই বেশ ক্লান্ত ছিলাম ঘুম এ চোখ বুজে আসছিল।

পরদিন উঠতে একটু বেলাই হয়ে গেলো। ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিযে পড়লাম আসে পাশের পরিবেশ দেখতে। আমাদের হোটেল টা পাহাড়ের একদম ঢালে। বেশ কয়েক ধাপ উঠে তবে রাস্তায় উঠতে হয় । হোটেল থেকে বেড়িয়ে সামনে একটা পুলিশ ক্যাম্প । আইজিআই গেমে র মতো একটা উঁচু টাওয়ার ও রয়েছে। পিছনে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে অনেক গরু চড়ে বেড়াচ্ছে। লোকজন খুব একটা নেই। পাখির আওয়াজ শুনতে শুনতে বেশ খানিকটা পথ নীচে নেমে আবার উপরে উঠে বাঁক ঘুরেই নেতারহাট বাসস্ট্যান্ড। আমরা বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে অনেকটা এগিয়ে একটা টিলা র উপর উঠে বসলাম চার পাশের মাটি শুকনো পাতার আস্তরনে ঢেকে আছে । লম্বা গাছ গুলোর ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো পড়ে জায়গাটা অসম্ভব সুন্দর করে দিয়েছিল। উঠতে ইচ্ছে করছিল না। হোটেল থেকে ফোন করে খাবার খেতে না ডাকলে আরো বেশ খানিকটা সময় থাকতাম আমরা।
হোটেলের সামনের খাবার জায়গাতে বসে চারপাশের পাহাড় দেখতে দেখতে খাওয়া আর বিকেল এ কোথায় যাবো সেটা নিয়েও ভেবে নেয়া হলো। এবার যাবো সানসেট পয়েন্ট এ।

খেয়ে উঠে একটু জিরিয়ে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সানসেট পয়েন্ট এর দিকে। কিছুটা বনের পথ পেরিয়ে খোলা মাঠের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললাম আসে পাশে কিছু কিছু চা বাগান চোখে পড়লো । আমাদের দার্জিলিংয়ের চা গাছের মতো বেঁটে নয় একটু লম্বা। সামনে বেশ ভিড় পাশে এক বিশাল জলাভূমি, ভিড়ের কারণ এ আমরা আর দাঁড়ালাম না। দেখে লাগলো কোনো কিছুর শুটিং চলছে, নয়তো জায়গাটা বেশ সুন্দর ছিল।
সানসেট পয়েন্ট এ পৌঁছে দেখলাম সামনে পাহাড়ের সারি র নীচে গভীর বন। পালামো টাইগার রিজার্ভ এর বোর্ড ঝোলানো রয়েছে কয়েক জায়গায়। আমরা বেশ খানিকটা এগিয়ে একটা জায়গায় গিয়ে বসলাম সামনে ছবির মতো একটা একটা পাহাড় গায়ে লেগে লেগে দাঁড়িয়ে আছে। আস্তে আস্তে সারা আকাশ লাল হয়ে এলো, এই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সূর্য এবার অস্ত যাবে। নিস্তব্ধ পরিবেশ চার পাশে শুধু পাখির আওয়াজ। আমরা নির্বাক হয়ে দৃশ্য টা উপভোগ করতে করতে একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলাম । ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসলো বুঝতেই পারিনি। এবার হোটেল এ ফেরার পালা ।

Source: Arghadeep Sikdar‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)