অন্ধকারের ঘোর কাটিয়ে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় শিলং পৌঁছে আমাদের ভ্রামণিকদল পুলকিত। চারদিকের দৃশ্যে যেমন নয়ন জুড়ায়, তেমনি জলহাওয়ার শীতলতা অনুভূতিকে প্রশান্ত করে দেয়। কবি নজরুল বলেছেন ‘ আমার নয়নে নয়ন রাখিয়া প্রাণ করিতে চাও কোন অমিয়’…আমরা যেন প্রকৃতির এক অমিয়সুধা পান করছি। এ-ই পরিভ্রমণরত মেঘদলে ঢেঁকে যাচ্ছে অদূরের পাহাড়, তো পরক্ষণেই রোদের ঝিলিক। সৃষ্টির এই অবারিত বৈভব দেখে অজান্তে এর স্থপতির প্রতি মাথা নুয়ে আসে। সেই মাথাকে আরও নত করে দিতে আমাদের অন্যতম ভ্রমণগাইড খাসি ভাষার কবি ও কলেজশিক্ষক বাখিয়ামুন রিনজার এর গাইডেন্সে গাড়ি ছুটে চলে লাবান এলাকায়। সেখানে শিলংয়ের নতুন বিস্ময় গ্রান্ড মদীনা মসজিদ- বা গ্লাস মসজিদ। ভারতের একমাত্র গ্লাস এবং উত্তরপূর্ব ভারতের বৃহত্তম মসজিদ।

ব্লগ ও ভ্রমণ গাইডে শিলংয়ের প্রচুর দর্শনীয় স্থানের মধ্যে গ্লাস মসজিদের উল্লেখ পাওয়া যায় না বললেই চলে। আগ্রহ আকুল পর্যটকই কেবল পাহাড়ি সরু রাস্তা পেরিয়ে লাবানে ছূটে যায় মসজিদ পরিদর্শনে। আমাদের ভ্রমণলিস্টের ওপরের দিকেই রয়েছে গ্রান্ড মদীনা মসজিদ। সেই আগ্রহের কারণও বাখিয়ামুন। কারণ ‘ভ্রমণগদ্যশিলংট্রিপ’ গ্রুপে সে-ই একটা ভিডিও পোস্ট করেছিল, যা দেখার পর ভ্রমণসূচীতে সেটি না রেখে পারিনি। মনে হলো শিলং ভ্রমণটি নামাজের মধ্য দিয়ে শুরু হলে খুব খারাপ হবে না। ভ্রামণিক দলের সবাই উৎফুল্ল। খাসি গোস্টগণ আমাদের মসজিদ দেখাতে পেরে, আমরা দেখতে পেরে। তাঁরা খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বী হলেও অন্যধর্মের তুলনায় ইসলাম ও মুসলমিদের সঙ্গে সাজুয্য বোধ করে বলে আগেই জানিয়েছে। বাখিয়ামুন বললো, ‘আই থিঙ্ক দ্য মস্ক অফার টু প্রেয়ার সার্ভিসেস এভরি ডে, মর্নিং এ্যান্ড ইভেনিং টাইম। ইউ উইল গেট ইভেনিং প্রেয়ার’।

বললাম, ওহ নো, দেয়ার আর প্রেয়ারস ফর ফাইভ টাইমস এ্যা ডে’।

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে গাড়ি লাবান এলাকা পৌঁছল। একটি সরুগলি দিয়ে নিচে নামতেই ডানদিকে তিনতলা ভবন। ভবনের নিচ দিয়ে ভিতরে ঢোকার রাস্তা। সামনে ঘাসে ছাওয়া প্রশস্ত প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণে ঢুকলে চোখ জুড়ানো বহুবর্ণিল ফোয়ারা আগন্তুককে স্বাগত জানায়। সামনে তাকিয়ে দেখি, অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত বহুতলবিশিষ্ট গ্রান্ড মসজিদ চোখের সামনে চকচক করছে। মসজিদের একটি গম্বুজ, চারটি মিনার। পুরো মসজিদ সবুজাভ কাঁচে মোড়ানো বলে এর আরেক নাম গ্লাস মসজিদ। পূর্বপ্রান্তের চত্ত্বর দিয়ে ঢুকে মসজিদের ডানদিক বা উত্তরে মেয়েদের ওজু ঘর। ভেতরে ডানদিকে ঘেরা জায়গায় তাদের নামাজের ব্যবস্থা। মসজিদ ও সংলগ্ন ঈদগাহ মিলে আটহাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারে। মসজিদের ধারণক্ষমতা দু্ই হাজার। উইকি তথ্য দিচ্ছে, শিলং শহরে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৫ শতাংশ বা সাতহাজারের মতো।

বামদিকে পুরুষ ওজখানা। ভ্রমণদলের দু’দল দু’দিকে ওজুর জন্য ছুটলাম। ওজুখানায় বসার জায়গা থাকলেও বুঝতে পারলাম এ্রখানে সবাই দাঁড়িয়ে ওজু করে। আমি তুসু ও কবি কামরুল হাসান ওজু করে নিলাম। ওজুখানার প্রবেশপথের বামদিকে একটি ব্লাকবোর্ডে চক দিয়ে ৩১ মে জুম্মা কালেকশনের পরিমাণ লেখা। মনে হলো, গোটা মাসে জুম্মা নামাজের সময় মসজিদ তহবিলে যে অর্থ আদায় হয়, তার পরিমাণ লেখা হয় বোর্ডটিতে। ৩১ মে পর্যন্ত জুম্মা কালেকশনের পরিমাণ ১০হাজার ১১০ টাকা। ভাবলাম, গ্লাস মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর স্বচ্ছতার মতোই স্বচ্ছ এর হিসাব-নিকাশও।

ওজুখানা থেকে দক্ষিণ দিকের দরজা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। দিনমানের ভ্রমণক্লান্তি নিমেষে উধাও। একটি পবিত্রতার আবেষ্টনীর মধ্যে ঢুকে গেলাম। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের মেঘালয় রাজ্য গারো ও খাসি প্রধান। এদের প্রাচীন ধর্ম অনেকটাই লুপ্ত। বেশিরভাগ এখন খ্রীষ্ট ধর্মদীক্ষিত। এমন একটি রাজ্যের রাজধানীর প্রধান মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারায় ভিন্ন অনুভূতিতে তৃপ্ত হচ্ছে মন।

ঘড়িতে ছয়টার কিছু বেশি বাজে। আজান হয়ে গেছে। নামাজ শুরু হতে যাচ্ছে। দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম কোন নামাজের নিয়ত করবো? আকাশ তখনও পরিস্কার। ভারতের সময় আধাঘন্টা এগিয়ে। মাথার মধ্যে তখন মাগরিবের সময়টা আসেনি। মনে হলো, তাড়াতাড়ি মাগরিব? নামাজে দাঁড়ানোর পর দেখি, ইমাম সাহেব উচ্চস্বরে পড়া শুরু করেছেন-‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, আররাহমানির রাহিম’….

নিয়ত করলাম মাগরিবের। মাগরিবে উচ্চস্বরে সুরা পড়া হয়।

নামাজ শেষ করে দেখি, প্রশস্থ মসজিদের পেছনের একটি সারিতে কবি কামরুল হাসান নামাজে দাঁড়িয়েছেন। জামাতে ফরজ শেষ করে সুন্নত পড়ছেন। জানামতে, ব্যবস্থাপনার এই প্রফেসরকে ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে আগ্রহাকুল দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বরং ধর্ম-বিশ্বাস এসব নিয়ে আলাপচারিতায় তিনি বিজ্ঞানের প্রসঙ্গ তোলেন। সেই এখানকার ভাবগাম্ভীর্যময় পরিবেশ ও পবিত্রতার বেষ্টনি সেই মানুষকেও নামাজিদের কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ব্যতিক্রমী মসজিদটি থেকে শুধু দেখার স্মৃতি নিয়েই তিনি ফিরতে চান না, নামাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে সঙ্গে সংযুক্ত করার স্মৃতিটিও রেখে যেতে চান।

নামাজ শেষে বাইরে বেরিয়ে দেখি সামনের চত্ত্বরের ফোয়ারাটি ইতোমধ্যে বিদ্যুতের বহুবর্ণিল আলোয় ঝলমল করছে। গম্বুজ ও চারমিনার ও মুল মসজিদ থেকে সবুভ আলো ঠিকরে বের হচ্ছে। চত্ত্বরে দাঁড়িয়ে আমরা নানা কৌণিকে মসজিদকে পেছনের রেখে ছবি তুলে যাচ্ছি। নামাজে শামিল হওয়া ত্রিশ জনের মতো মুসল্লি তখন চত্ত্বর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কবি কামরুল হাসান আলাপী মানুষ, নিরন্তর নেটওয়ার্কিংয়ের বিশ্বাসী, দেখি একজনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। শিক্ষিত, মার্জিত শ্রুশ্মমন্ডিত যুবক। আমিও যোগ দিই। জানা গেল, তাঁর নাম ডা. জামাল সিদ্দিক। ডেন্টাল বিশেষজ্ঞ। মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি। বললেন, বিভিন্ন ওয়াক্তের নামাজে মুসল্লি খুব বেশি হোক বা না হোক, শুক্রবার জুম্মার নামাজে পাঁচ শতাধিক মুসল্লির জমায়েত হয়। এই আলাপের সময় ইমাম সাহেব বের হয়ে যাচ্ছিলেন, ইতোমধ্যে যাঁর নামাজ পড়তে গিয়ে আমরা সুললিত কন্ঠে ক্বেরাত শুনে আমার প্রতীতি হয়েছে যে তিনি একজন ক্বারী-যারা ক্বোরআন শরীফ শুদ্ধ করে পড়তে পারেন। দেখি, ভদ্রলোক কমবয়স্ক মাওলানা। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, তিনি বিহার থেকে এখানে এসেছেন। নাম সাদ্দাম হোসেন।

বেরিয়ে আসার সময় মনে হলো, এ অঞ্চলের ঝর্ণা, জাদুঘর, মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশনসহ বহু দর্শণীয় স্থানের কথা ভ্রামণিকদের লেখালেখিতে এন্তার পাওয়া যাচ্ছে। নয়ানাভিরাম মসজিদটি রয়েছে এখনও অনাবিস্কৃত। এ রচনার ভ্রমণপিপাসুদের দৃষ্টিতে পড়লে গ্রান্ড মদীনা মসজিদ হয়ে উঠতে পারে ধর্মীয় পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় কেন্দ্র।

ভ্রমণের সময় অবশ্যই পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। মনে রাখবো, ফেলে আসবো স্মৃতিময় পদচিহ্ন, নিয়ে আসবো ব্যবহার্য আবর্জনা।

Source: Mahmud Hafiz‎<Travelers of Bangladesh (ToB)