একদম শেষ বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা নামার মুখে আমরা আমাদের অভিজাত হোটেলের আরামের বিছানা থেকে নেমে লেকের পাড়ের রাস্তায় নামলাম। সূর্য তখন লেকের শেষ প্রান্তে দুই পাহাড়ের ঠিক মাঝখানে তার রক্তিম আভা ছড়িয়ে সেদিনের মতো বিদায়ের ক্ষণ গুনছিল। আমাদের সবার পেটে দারুণ ক্ষুধা থাকা সত্ত্বেও, সেই আলো-আধারি আর গোধূলি বেলার অপার্থিব আলো দেখে কিছু সময় থমকে দাঁড়িয়েছিলাম লেকের পাড় ঘেঁষে থাকা রেলিং ধরে। কেউ কেউ ক্যামেরায় ধারণ করে রাখছিলাম সেই সময়ের স্মৃতি আর ছবি।

সূর্যের শেষ আলো লেকের জলে পড়ে একটা সোনালী-রূপালী ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছিল ক্ষণে ক্ষণে। লেকের পাড়ে রাস্তার উপরের পর্যটকে গমগম করতে থাকা দোকানগুলো তাদের ঝলমলে আলো ছড়াতে শুরু করেছিল এক এক করে। মল রোড তখন শুধুই পায়ে হাঁটা পর্যটকদের দখলে। এই সময়, মানে বিকেল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এই পথে কোনো রকম যানবাহন চলাচল একদম নিষিদ্ধ। এবং সবাই সেটা মেনেই চলছে। তাই পর্যটকদের আনন্দ আর হেঁটে হেঁটে নৈনিতাল লেক, লেকের পাড়ের পাহাড়, আলো ঝলমলে দোকান উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল দারুণ আর ছন্দময়, নির্ভাবনার আর নিশ্চিন্তের।

এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে চারপাশের ঝলমলে পরিবেশ, ঝিলিক দিয়ে যাওয়া লেকের জল আর পাহাড়ি ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে মেখেই দিনের আলোর শেষ রেশটুকুও নিভে গিয়ে চারদিকে জ্বলে উঠেছিল শত রঙের আলোর ঝলকানি। তখন আবারো নতুন করে মনে হলো, ওরে আমাদের যে দারুণ ক্ষিদে পেয়েছে সে কথা সবাই বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। ঝটপট সেখান থেকে উঠে সামনের দিকে পা বাড়ালাম। এখনই খাবার না খেলেই নয়। খাবার দাবার খেয়ে তারপর না হয় আয়েশ করে উপভোগ করা যাবে, এই নৈনিতাল, এই অভিজাত পাহাড়ি শহরের রঙ, রূপ, রস আর গন্ধ।

সামনের দিকে এগোতে এগোতেই, পথ চলতি দুই একজনের কাছে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিলাম, এই বাঙালি বাবুদের অন্যতম আকর্ষণ কাবাব, বিরিয়ানি বা মাছ ভাত কোথায় পাওয়া যায় বা যাবে। জানালো একটু এগিয়ে রাস্তার মোড়ে গিয়ে বামের পথে গেলেই চোখে পড়বে একটি কাবাব বিরিয়ানির দোকান। ব্যস ঝটপট চল তবে। হ্যাঁ সত্যিই তিন বা চার মিনিট হেঁটে সামনের মোড়ে গিয়ে বামের পথে কিছুদূর এগিয়েই পেয়ে গেলাম কাঙ্ক্ষিত বিরিয়ানির দোকান। কাবাব আর বিরিয়ানি দেখেই সবাই দারুণ খুশি, চোখে মুখে খুশির ঝিলিক দিয়ে গেল। ঝটপট বসে পড়লাম আলোকিত দোকানের একটি টেবিল দখল করে।

কেউ ৮০ টাকা করে চিকেন, কেউ ফ্রাইড রাইস ১১০ টাকার আর কেউ কাবাব আর চাপাতির অর্ডার দিয়ে গল্পে আর আড্ডায় মেতে উঠলাম। ১০ মিনিটের মধ্যেই গরম গরম ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানি, কাবাব আর ফ্রাইড রাইস চলে এলো। সেই সাথে পিঁয়াজের সাথে চাটনি কয়েক রকমের। দেখেই জিভে জল টসটস করতে লাগলো। সবাই মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম যার যার প্লেটের খাবার খেয়ে সারা দিনের ক্ষুধা দূর করতে। এবং দারুণভাবেই সবাই সেই খাবার উপভোগ করে তৃপ্তি পেয়েছিলাম, দাম, মান আর স্বাদের সমন্বয়ে। এরপর আবার বেরিয়ে পড়লাম, অভিজাত নৈনিতালের ঝলমলে পাহাড়ের বর্ণীল আলোর ঝলকানি উপভোগ করতে।

আমাদের খাবার হোটেলের পাশেই সিনেমা হল, একদম লেকের পাড় ঘেঁষে। ভাবলাম সিনেমা দেখবো কিনা। দারুণ ঠাণ্ডায় অনেকটা জমে যাওয়ার মতো অবস্থা সবার। কিন্তু লম্বা সময়ের সিনেমা সবাই ঠিক উপভোগ করতে পারবো কিনা সেই ভাবনা থেকেই সিনেমার চিন্তা বাদ দেয়া হলো সেদিনের মতো। এরচেয়ে বরং ঘুরে ঘুরে, হেঁটে বসে ধীরে ধীরে লেকের পাড়ের মল রোডের আভিজাত্য উপভোগ করাটাই ভালো হবে। তাই সেদিকেই পা বাড়ালাম। ততক্ষণে পুরো মল রোড তার সবটুকু জৌলুস ছড়িয়ে দিয়েছে লেক, পাহাড়, আকাশ আর উন্মুক্ত পথজুড়ে।

নানা রকম ব্র্যান্ডের শোরুম, চকলেট, কেক, কফি শপ, ছোট ছোট খাবার দোকান, পানীয়র বাহারি রূপ, দেশী বিদেশী পর্যটকে পুরো লেকের পাড় গমগম করছে। এমন পরিবেশে সিনেমা দেখে সময় নষ্ট করাটা সত্যি বোকামি হতো সেটা বুঝতে পারলাম। পুরো মল রোড জুড়ে তখন বড় দিনের উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। মানুষে মানুষে প্রায় গিজগিজ করছিল শত রঙের, বর্ণের আর ঢঙের মুখগুলো। আমরা কিছুটা হেঁটে, ক্লান্ত হয়ে আমাদের হোটেলর ঠিক সামনের কাঠের বেঞ্চিতে বসেছিলাম আরাম করে। সামনেই আমাদের হোটেল রুমের বেলকোনি, রাস্তার ওপাশে হাজার আলোর ঝলকানি আর অন্যপাশে লেকের জলে শত রঙের ঝিলমিলে আয়োজন।

গরম কফির মগ হাতে, প্রিয়জনের সাথে এমন রাজকীয় পরিবেশে, পাহাড়ি আভিজাত্য উপভোগ করতে পারাটা একটা বিশেষ সৌভাগ্যই বলতে হবে। আমি, আমরা সবাই দারুণ একটি বিকেল, অপূর্ব একটা সন্ধ্যা আর মনে রাখার মতো একটি রাত উপভোগ করছিলাম লেকের পাড়ের বেঞ্চিতে বসে থেকে, অলস সময় কাটিয়ে, কখনো হাতে হাত ধরে, কখনো ধীরে লয়ে হেঁটে হেঁটে আর কখনো ঝলমলে সাজানো, গোছানো ব্র্যান্ডের শোরুমগুলোতে উঁকিঝুঁকি মেরে।

অবশেষে রাত প্রায় অনেকটা হয়ে যাওয়াতে আর শীতের প্রকোপ বেড়ে যাওয়াতে, মল রোড ফাঁকা হতে শুরু করলো। সেই সাথে দোকানগুলোও যখন তাদের আলো নিভিয়ে ঝাঁপ ফেলে দিতে শুরু করলো, তখন উঠতেই হলো। তবুও নেশাতুর হয়ে বসেছিলাম পথ প্রায় শুন্য হয়ে যাবার পূর্ব পর্যন্ত। কারণ এমন দিন, এমন সন্ধ্যা আর এমন অপূর্ব রাত আবার কবে পাবো কে জানে? আর আমাদেরও যেহেতু কোনো তাড়া নেই তাই।

প্রাণ ভরে উপভোগ করেছিলাম, অভিজাত পাহাড়ি শহর নৈনিতালের সবটুকু রঙ, রূপ আর গন্ধ। যে রাত, যে শহর, যে পাহাড় আর যে লেকের টলটলে জল স্মরণীয় হয়ে থাকবে অনন্তকাল।