১৮ জানুয়ারি রাত ১১ টায় ম্যানিলা থেকে Cebu Pacific এয়ারলাইনসে রওনা দিয়ে যখন আমি সাড়ে তিন ঘন্টা প্লেন জার্নি করে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় পৌঁছাই তখন অলরেডি রাত ২ টা বেজে গেছে। ট্রাবেল পার্মিট ডকুমেন্ট ইতিমধ্যেই ছিলো কিন্তু নিয়ম হলো ওখানে ফরম পূরন করে আপনার পাসপোর্ট জমা দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে স্টাম্প ভিসাটা নিতে হয়।ভিসা ফি ২৫ USD বাংলাদেশীদের জন্য।ইমিগ্রেশন পার হয়ে যখন ডলার ভাঙ্গাতে গেলাম তখন একটু গুলিয়ে গেলাম, যদিও জানা ছিলো ব্যাপারটা আমার আগের থেকেই!১০০ ইউ এস ডি ভাঙ্গিয়ে আমায় দিলো ২৩০২০০০ ভিয়েতনামিজ ঢং! পরবর্তীতে ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে পৌঁছে দেখি মিটারে বিল আসছে চার লাখের কাছাকাছি বুঝতে আর বাকি রইলো না যে এখানে থাকাকালীন সময়টা গাণিতিকভাবে আবার নতুন করে নিজেকে যোগ বিয়োগ আর গুণ ভাগে সম্ভৃদ্ধ করে তোলা যাবে!আর ভাবতে লাগলাম পৃথিবীর বাজার অর্থনীতির মূদ্রা কেন্দ্রীক কিছু সমীকরণকে!

রাত সাড়ে চারটায় একটু ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।হাতে সময় মাত্র দুইদিন হ্যানয়ে। ৩/৩.৫ ঘন্টা বেডে গড়াগড়ি করেই সকাল ১০টার দিকে পৌঁছালাম তাদের জাতীয় নেতা হো চি মিন এর মিজোলিয়ামের(সংরক্ষিত মৃত দেহের মমির সমাধিস্থল)।জায়গাটা মস্তোর ক্রেমলিনে যেখানে লেনিনকে মমি করে রাখা হয়েছে তার থেকে ৫/৬ গুন বড় হবে।দুঃখজনকভাবে দেরি হয়ে যাওয়ায় ভিতরে যেতে পারলাম না, তাই সরাসরি নিজ চোখে না দেখার আক্ষেপটা থেকে গেলো বৈকি! এটা দেখতে এলে আপনাকে একদম ৭/৮ টার ভিতরই চলে আসতে হবে। এরপর হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম টেম্পল অফ লিটারেচারে ( Temple of Literature)।টেম্পল অব লিটারেচারের একটা লম্বা হিস্ট্রি আছে যেটা কিনা এটাকে নিয়ে দেওয়া আমার ফেসবুকে এটাকে নিয়ে সিঙ্গল পোস্টিংটি থেকে জানতে পারবেন। তবে এটার একটা নূন্যতম প্রবেশমূল্য রয়েছে যেটা কিন্তু আবার হো চি মিনের সমাধির ক্ষেত্রে নাই। হো চি মিন এর সমাধি থেকে হেঁটে যেতে যেতে দেখলাম এক অদ্ভুত কিন্তু সাউথ ইস্ট এশিয়ার চিরাচরিত দৃশ্যপট; হাজার হাজার বললে আসলেই ভুল হবে, লক্ষ লক্ষ মটর সাইকেল যেনো পুরো হ্যানয় শহরটিকে সাঁই সাঁই শব্দে মাতিয়ে রেখেছে।এরা প্রাইভেট কার মনে হয় চালাতেই পছন্দ করে না!এমন চিত্রটি আরো পরিলক্ষিত হয়েছে কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড আর ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে। আর এরা রাস্তার ডান দিক দিয়ে চলাচল করে, ঠিক আমাদের উল্টোটা, তাই প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হয়েছে বেশ কয়েকবার।ফিলিপিনেও দেখে এলাম এমনটি। এটা আসলে যাতায়াত ব্যাস্থার উপর কলোনিয়ালিজম( উপনিবেশবাদে) এর প্রভাবমাত্র।ওরা যেমনটি করে রেখে গিয়েছে আমরা তেমনটিই অনুসরণ করি মাত্র। রাস্তাঘাট আমাদের দেশের তুলনায় অনেক অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ম্যানিলার রাস্তাগুলোও অনেক পরিপাটি আর গোছানো ছিলো।তবে হো চি মিন এর রাস্তাগুলো হ্যানয় থেকে বেশী পরিচ্ছন্ন মনে হয়েছে আমার কাছে। হ্যানয় আসলে ওল্ড আর পুরানোর সমন্বয়ে গঠিত রাজধানী। তবে ট্যুরিস্টরা সাধারণত পুরানো সিটিকেই বেছে নেয় যেমনটি নিয়েছিলাম আমিও। ওখানেই আসলে প্রকৃত ভিয়েতনামের পরিচয় খুঁজে পেতে সাহায্যে হয়। ছোট ছোট রাস্তা, অনধিক ২/৩ তলা বিল্ডিং, মধ্যবিত্ত আর উচ্চ মধ্যবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্তের আনাগোনা, এদের প্রাত্যহিক খাদ্যাভাস, পুরানো হেরিটেজ, ঐতিহ্যবাহী হোটেল আর খাবারের সমারহ। ছোটো ছোটো রাস্তায় বয়স্কা মহিলারা এক ধরনের ভ্যানে করে বিভিন্ন ধরনের পোশাক নিয়ে ফেরি করে বেড়াচ্ছে আর সব থেকে ভালো লেগেছে তাদের রাস্তার পরতে পরতে ফ্রেস সব ফলের দোকানগুলো। ফরমালিনমুক্ত এসব সহজপ্রাপ্য আর সুলভমূল্যের ফলগুলো সবাই খেয়েই চলেছে, বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকার ট্যুরিস্টরা এগুলোর দাম শুনে তো মহা খুশীতে আটখান! সব কিছু মিলিয়ে ভিয়েতনামের চিরন্তন জীবন ব্যাবস্থার প্রতিবিম্ব হলো এই ওল্ড হ্যানয়।

এরপর আমরা গুগলের জিপিএস ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম হ্যানয় ওয়্যার জাদুকরে। যদিও হো চি মিনের ওয়্যার জাদুঘরের থেকে এটা সাধারণ তবুও এখানে অনেক কিছুই দেখার আছে। প্রবেশ মূল্য হবে বাংলাদেশী টাকার ৫০০ এর মতো।১ ঘন্টার মতো দেখে আমরা অ্যালেক্সের সাজেশনে( পরিচয় টেম্পল অফ লিটারেচরে যে কিনা আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এসেছে) গেলাম ভিয়েতনামের একটা ট্রেডিশনাল রেস্টুরেন্টে। অদ্ভুত সব আইটেমের খাবারগুলো খেতে কেমন যেনো করছিলো। তারপর ভাবলাম অ্যালেক্স পারলে আমি কেনো নয়? বাট কনফার্ম হয়েছিলাম এই লিস্টে কোনো কুকুরের মাংস অন্তত ছিলো না!এখানকার খাবারের ছবিগুলো আমার ফেসবুক ওয়ালে পাবেন।এরপর ওরই রেফারেন্সে গেলাম লেকের পাড়ের একটা কফি শপে কফি খেতে। কফি খেতে খেতে সন্ধ্যা নেমে এলো আর আমরা লেকের পাড় দিয়ে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন ট্যুরিস্টিক এক্টিভিটিজগুলো( Touristic activities)দেখতে লাগলাম!একটা পর্য়ায়ে হ্যানয়ের বিখ্যাত পাপেট শো তে ঢুকে পড়লাম রাত ৬.৩০ এর দিকে। এখানে আসলে ৮০% ই ফরেন ট্যুরিস্টই পেয়েছি ভিতরে এবং এই শোর মূল উপজীব্যতা হলো পুতুলের মাধ্যমে পুরো ভিয়েতনামের প্রাগৌতিহাসিক সমাজ ব্যাবস্থা থেকে বর্তমান সমাজ ব্যাবস্থাকে ধারাবাহিকভাবে চিত্রাঙ্কৃত করা। এনিওয়ে এই জায়গা গুলো কিন্তু সবই পুরোনো হ্যানয়তেই অবস্থিত এবং হেঁটে হেঁটে দেখা সম্ভব যদি আপনার ডেইলি ৬/৭ ঘন্টা হাঁটার মানসিকতা থাকে! এরপর আমরা চলতি পথে পরিচিত ভিন্ন ভিন্ন দেশের ৪/৫ জন একসংঙ্গে ডিনার করে যে যার হোটেলের দিকে রওনা দিলাম।

পরের দিন ২০ জানুয়ারী আবার ভোরে চোখ মুছতে মুছতে দৌড় দিলাম হা লং বের উদ্দেশ্য। ট্যুর অপারেটরদের বাস ছেড়ে দিলো সকাল ৭.৪০ এ এবং ১৬৫ কিলোমিটার পাড়ি দেওয়ার পর আমরা পৌঁছালাম হা লং বে তে।এটি ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় থেকে ১৬৫ কিলোমিটার নর্থসাউথ এ চায়না বর্ডারের পাশেই অবস্থিত। এটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসাবে ঘোষনা করেছে। এর সামগ্রিক আয়তন ১৫০০ স্কয়ার কিলোমিটার এবং এখানকার মোট ছোটোখাটো আইল্যান্ড/ লাইমস্টোন এর সংখ্যা ১৬০০০ হাজারের উপর। এখানে ভ্রমণের বেস্ট টাইম হলো ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের ভিতর আর আমি যে সময়টাতে এখানে ভ্রমণ করেছি তখন কুয়াশাচ্ছন্নতা এর অপার সৌন্দর্যকে কিছুটা ঢেকে রেখেছে। যাইহোক এখানকার বিভিন্ন আইল্যান্ডে রয়েছে অসংখ্য গুহা এবং একটা থেকে অন্যটায় যেতে কখনও এক ঘন্টা কিংবা এর কম বেশী সময় লেগে যায়। যাতায়াতের জন্য রয়েছে অসংখ্য ছোট বড় জাহাজ কিংবা কাঠের নৌযান যেগুলো আপনার ট্যুর অপারেটররা আগের থেকেই বুকিং নিয়ে রাখে এবং এরা ভোর বেলাতেই আপনার হোটের সামনে থেকে আপনাকে তাদের বাসে করে উঠিয়ে নিয়ে আসে। সাধারণত ৪ ঘন্টা/ ৬ ঘন্টা বে তে থাকার উপর নির্ভর করে এই ট্যুরের মূল্য নির্ধারন হয়ে থাকে ৩৫/ ৪০ USD ডলার।অাপনি অবশ্যই একদিন আগের থেকেই এটা কনফার্ম করে রাখবেন। যাই হোক আমরা বাস থেকে ১২ঃ৩০ মিনিটে ছোট আকৃতির জাহাজে উঠলাম এবং বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছের একটি লান্স করে নিলাম যেটা এই প্যাকেজের সংঙ্গেই ছিলো। এর পর আমরা মোট তিনটা আইল্যান্ডে ঘুরলাম, নৌকায় ভ্রমণ করলাম লাইফ জ্যাকেট নিয়ে এবং সন্ধ্যার হওয়া সংঙ্গে সংঙ্গে আবার বাসে ফিরে বাসে হ্যানয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।মনোমুগ্ধকর এই স্হানটি ছাড়তেই ইচ্ছা হচ্ছিল না একদমই! আবার ৪ ঘন্টার বাস জার্নি করে রাত ৯.৩০ এর দিকে ফিরে এলাম হ্যানয়তে এবং হালকা ডিনার শেষে হোটেলে ফিরে এলাম। গোসল না করেই আবার একটু বেরিয়ে পড়লাম রাতের ওল্ড হ্যানয়ের নাইট স্ট্রিট মার্কেট এর উদ্দেশ্যে। হ্যানয়তে এলে আমি অবশ্যই আপনাদের সাজেস্ট করবো ওখানে একটা ঢুঁ মারার জন্য কারন এখানে আপনি সুলভ মূল্যের সব ধরনের ভিয়েতনামিজ পণ্য সামগ্রি দেখতে বা কিনতে পারবেন। যাইহোক মধ্যরাতের ঠিক আগে আগেই হোটেল ফিরে আগামীকাল সকালের ফ্লাইট হো চি মিন সিটিতে যাওয়ার প্রিপারেশন নিয়ে ঘুমানো চেষ্ঠা করলাম।

পরের দিন ২১শে জানুয়ারী সকাল ভোর ৬ টায় রওনা দিলাম হ্যানয় এয়ারপোর্টে এবং ভিয়েত জেটের প্লেনটি ১ ঘন্টার মতো ফ্লাইট ডিলে করে ২ ঘন্টার জার্নিতে দুপুর ১ টার দিকে ভিয়েতনামের সব থেকে বৃহত্তম এবং বানিজ্যিক শহর হো চি মিন সিটিতে পৌঁছালাম।এয়ারপোর্ট থেকে সিটিতে আসতে সময় লাগে ২৫/৩০ মিনিটের মতো এবং ১৫০০০০ থেকে ২০০০০০ ঢং এর মতো। এটা সহজেই অনুমেয় যে এটি তাদের জাতীয় নেতার নামে নামকরণ করা হয়েছে এবং এটি দেশটির দক্ষিণে অবস্থান করছে।এটি মেট্রো ম্যানিলার মতো অসংখ্য ডিস্ট্রিকে বিন্যস্ত এবং এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তর মহানগরীর একটি। এটাকে অত্যন্ত সাজানো গোছানো আর প্রি প্লান আধুনিক শহর মনে হয়েছে আমার কাছে। পাশ্চাত্য ধাঁচের এই মহানগরীতে রয়েছে পর্যাপ্ত সংখ্যক গাছ পালা আর অসংখ্য সবুজাভ পার্ক, ওয়েল অরগানাইজড্ ট্রাফিকিং সিস্টেম, হাইজিনিক খাদ্যাভাসের অসংখ্য লোকাল আর কন্টিনেন্টাল রেস্টুরেন্টস এবং বিভিন্ন ক্যাটাগেরির আবাসন ব্যাবস্থা। নিরাপত্তার কথা না বললেই নয়।পৃথিবীর হাতে গোনা কিছু কমিউনিস্ট দেশগুলোর একটি এই ভিয়েতনামের সামাজিক নিরাপত্তা আমার কাছে এশিয়ার অন্যতম শ্রষ্ঠ মনে হয়েছে।সত্য বলতে আমার চার দিনের কোথাও আমি একটি পুলিশও দেখি নাই। ক্ষেত্রবিশেষ যেমন বিশেষ বিশেষ জাতীয় অবস্থানে কিছু নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দেখেছি যারা রুটিন মাফিক তাদের ডিউটি করছে মাত্র। যাইহোক এখানকার রাস্তায়ও মটর সাইকেলের আধিপত্য হ্যানয়ের মতোই প্রকট। হাজারে হাজারে লাখে লাখে মটর সাইকেল। কিন্তু সবাই সিগনাল মেনে চলছে। আসলে কমিউনিজম এমন একটা রাস্ট্রীয় ব্যাবস্থা যেখানে প্রকাশ্যে ধর্ম চর্চা নিষিদ্ধ থাকে যেমন চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা কিংবা নর্থ কোরিয়া, অন্যদিকে রাস্ট্র ব্যাবস্থায় ডিসিপ্লিনকে ধর্মের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এটার বিরুদ্ধে গেলেই চলে আসে নির্মম শাস্তি। তাই সমাজে ল এন্ড অর্ডার এর সামগ্রিক অবস্থা সমান স্ট্যান্ডারের অন্য যেকোনো পূজিবাদী দেশগুলোর থেকে অনেক ভালো থাকে। অন্যদিকে দেশটি দ্রুতই ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড্ দেশের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। আপনি হো চি মিন সিটির নদীর পাশে গেলেই দেখতে পারবেন এর দুপার দিয়ে গড়ে উঠছে শত শত স্কাই স্কেপারস( সুউচ্চ অট্টালিকা) এবং এখানকার একটা প্রোজেক্টে কানাডার একটি কোম্পানিই ইনভেস্ট করছে ৫.৬ বিলিয়ন ইউ এস ডলার।আপনারা খুব দ্রুতই দেখতে পাবেন যে দেশটি এশিয়া একটি অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠছে।

এবার ট্রাভেল জার্নিতে ফিরে আসা যাক।আমি দুপুর ১টার দিকে ল্যান্ড করে ট্যাক্সি করে ২ টার ভিতর হোটেল চলে এলাম। আমার হোটেলটা ছিলো ডিস্ট্রিক্ট ১ এর ভিতর এবং এখান থেকে সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ ট্যুরিস্ট স্পট গুলো পায়ে হেঁটে চলে যাওয়া যায় ২০/৩০ মিনিটের ভিতর। গোসল না দিয়েই ব্যাগটা হোটেলে ফেলেই হাঁটা শুরু করলাম আমরা দুইজন। উল্লেখ্য এই সিটি পর্যন্ত আমার সাথে ছিলো আমারই কাছের এক ছোটভাই যে কিনা আমার একজন বিজিনেজ অ্যাসোসিয়েটস আর ওর নাম হলো সাইফ্।অত্যন্ত ফ্লেক্সিবল্( Flexible) প্রকৃতির ছেলে; আমি রিয়েলি লাকী যে ওর মতো একজন ট্রাবেল পার্টনার পেয়েছিলাম।এনিওয়ে গুগল ম্যাপ ধরে ধরে আমরা ২০/২৫ মিনিটের ভিতরই পৌঁছে গেলাম Notre Dam Cathedral এর সামনে। ঠিক এর সাথেই রয়েছে বিশালাকৃতির সেন্ট্রাল পোস্ট অফিসটি যেটা এদের শত বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে রয়েছে। কিছুক্ষন ধরে ওখানকার হিস্ট্রি পড়লাম এবং পরবর্তীতে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম ভিয়েতনামের সুউচ্চ টাওয়ার( বিল্ডিং) Bitexlo Saigon Skydeck এর কাছে। এর পাশ দিয়েই বয়ে গেছে Saigon River নদীটি।সুন্দর করে বাঁধানো নদীর পাশের পেভমেন্টগুলো এবং মাইলের পর মাইল ধরে চলে গেছে ছোট পার্ক আকৃতির অবকাঠামোটি।শীতল বাতাস আর মনোমুগ্ধকর লাইটিং পুরো এলাকাটিকে অদ্ভুত এক রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে।মানুষের সন্ধ্যাকালীন ব্যায়ামে সদাই কর্মচঞ্চল এ স্হানটি বড়ই উপভোগ্য ছিলো। রাত হয়ে গেলো, হাঁটতে হাঁটতে হোটেলের পাশে এসে ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে পেট ভরে নান রুটি, মুরগীর ভুনা, পালক পনির আর মিক্সড্ ভেজিটেবল দিয়ে ডিনারটা সেরে রাত ১টায় ৬ ঘন্টার একটা বড় ঘুম দিলাম। একটা ব্যাপার শেয়ার করতে চাই সেটা হলো পৃথিবীর যেখানেই যাবেন ইন্ডিয়ার খাবার খুবই এক্সপেনসিভ্!

আসলে বিগত কয়দিন আমি ৩/৩.৫ ঘন্টার বেশী ঘুমানোর সময়ই পাই নাই। সকালে উঠে হোটেল থেকে ব্রেক ফার্স্ট টা সেরে রওনা দিলাম আমার বহু প্রতীক্ষিত ওয়্যার রেমনেন্ট মিউজিয়ামে।৪০০০০ ভিয়েতনামিজ ঢং দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম। মিউজিয়ামের এতো সুন্দর গ্রাফিক প্রেজেন্টেশন আমি পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখেছি। ভয়াবহ ভিয়েতনামিজ যুদ্ধের পুংখানু পুংখানুতা এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো দেখলে কেউই আবেগে হতবিহ্বল না হয়ে থাকতে পারবে না। আমার বার বার মনে হচ্ছিলো আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি বর্বর সৈন্যদের নির্লজ্জ নিমর্ম অত্যাচার আর নির্যাতনের কথা। এর সামগ্রিক বর্ননা আমি আমার ফেসবুকের পোস্টিটিং এ ইতিমধ্যে দিয়েছি। কিছু ভিডিও চিত্র আর স্থির চিত্র নিয়ে চললাম ওদের ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্যালেস বা প্যালেস অফ রিইউনিফিকেশন এর দিকে এবং ৬৫০০০ ঢং দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকলাম বিশাল আকৃতির এই প্যালেসে।এটা তাদের যুদ্ধকালীন দক্ষিণের প্রসিডেন্টের বাসভবন ছিলো এবং আরো পূর্বে এটা ফ্রান্সের গভর্নরের বাসভবন ছিলো এবং পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে হো চি মিনের উত্তরের রেভ্যুলেশনারী ফোর্স এখানে ঢুকে পড়ে এবং তাদের কাছে দক্ষিনের প্রসিডেন্টের নিঃ শর্ত আত্নসমর্পণের মাধ্যমে আমেরিকার পরাজয় নিশ্চিত হয়( যদিও আমেরেকা ১৯৭৩ সালে সৈন্য উঠিয়ে নেয়) এবং উত্তর আর দক্ষিণের মিলনের মাধ্যমে স্বাধীন ভিয়েতনামের আবির্ভাব ঘটে। এটা দেখা শেষে কর্মক্লান্ত দেহে হোটেলে এসে গোসল দিয়ে ৩০ মিনিটের একটা রেস্ট নিয়ে আবার সিটি সেন্টারের দিকে রওনা দিলাম; উদ্দেশ্য ছিলো ওখানকার নাইট স্ট্রিট মার্কেটের সাথে হ্যানয়ের মার্কেটটির একটা তুলনামূলক চিত্র বের করা। কিন্তু দুরত্বের কারণে না যেয়ে ওখানকার ট্যুরিস্ট স্ট্রিটগুলোতে ঘুরে বাইরে হালকা ডিনার সেরে হোটেলে ফিরে এলাম।পরের দিন ২৩ জানুয়ারি সকাল ৯ টায় আবার ফ্লাইট; গন্তব্য এবার সিঙ্গাপুর!

source:  Proshun Ray‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)