রাতের খাবারের পাট চুকিয়ে লঞ্চের ব্রিজে এসেছি কিছুক্ষণ হলো। এতক্ষণে যারা ঘুমোবার ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার মতন গুটিকতক লোক হয়ত জেগে সুন্দরবনের রাতের রোমাঞ্চ উপভোগ করছে, তবে ব্রিজটাকে মোটামুটি জনশূন্যই বলা চলে। কেবল দুপাশের সোফাদুটো দু’জনে দখল করে বসে আছি। ভদ্রলোকের কথায় নড়েচড়ে বসলাম। আমার কেবিনটা স্টারবোর্ডের দিকে, সুতরাং এপাশটার সোফায় একটা অধিকার জন্মে গেছে। রাতে এপাশটায় যখন আসি তখন মোজা পরে, গরম কাপড়ে আপাদমস্তক ঢেকে ক্যামেরাটা কোলে নিয়েই বসি। ধূমপানের অভ্যেস নেই কিন্তু কড়া কফিটার অভাববোধ করি বেশ।

মাহফুজ ভাই আছেন আমার উল্টোপাশে, পোর্টহোলের দিকে, কাজেই হরিণ দেখার লোভে কনকনে শীতের মাঝেও সোফার আরামদায়ক ওম ছেড়ে উঠতে হল। তীর থেকে এক/দেড়শো গজ দূরে নোঙর করে আছি আমরা। তীরের কাছটা বেজায় অন্ধকার। আকাশে হলুদাভ চাঁদটা কেমন যেন মলিন একটা আলো ছড়াচ্ছে, ভালোমতো দেখা যায় না সব। ওর মধ্যেই চিত্রগ্রাহক ভদ্রলোক কি খুঁজে পেলেন আল্লাহ মালুম, তবে তার চোখের তারিফ করতেই হবে। অন্ধকার চোখে সয়ে আসতেই দেখলাম কিছু একটা নড়ছে। অবয়ব বোঝা যায় শুধু, এর বেশী কিছু না।

শ’খানেক গজ দূরে একটা ট্যুরিস্ট লঞ্চ জেনারেটর ছেড়ে রেখেছিলো। হরেক রকমের বাতি দিয়ে সাজানোয় দেখে মনে হচ্ছিলো যেন পার্টি চলছে। মাহফুজ ভাই শুধু মাঝে মাঝেই বিড়বিড়িয়ে তাদের চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছিলেন। জেনারেটরের শব্দে নিশাচরদের কেউ আশ পাশে থাকলে নির্ঘাত পালিয়ে গেছে। আজকের রাতটা বেকার জেগে থাকা হবে মনে হচ্ছে। কাজেই রাতের প্রকৃতি দর্শনের বদলে ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করলাম। আগামী ক’টা দিন লঞ্চভর্তি একদল লোকের সঙ্গে থাকতে হবে অথচ কাউকেই চিনি না। এদিকে গায়ে পড়ে খাতির জমানোও আমার জন্য রীতিমতো মর্মান্তিক ব্যাপার। তারপরেও আলাপ কিন্তু জমে উঠলো।

মাহফুজ ভাই সদালাপী ভদ্রলোক। চারুকলা থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন কিছুদিন হলো। বিয়ে থা করেননি। দুর্দান্ত সাইকেল চালান। সময় পেলেই এদিক ওদিক বেরিয়ে পড়েন। তার ওপর শখের ফিল্মমেকার। এদিকে আমার নিজের পরিচয় দেবার মতন তেমন কিছু নেই। অনাহুত প্রশ্ন বাদ দিয়ে ভদ্রলোক যে আমার সাথে প্রকৃতি দর্শন নিয়ে মেতে উঠলেন, আমার জন্য সেটাও কম স্বস্তির নয়। কথার ফাঁকে ফাঁকে নদীতে আলো ফেলে দেখছিলাম কুমির ভেসে যাচ্ছে কি না। মনে পড়ে গেলো, কোন একসময় জলে ছলাৎ করে একটু বেশী শব্দ হওয়ায় মাহফুজ ভাই লঞ্চের রেলিং থেকে সরে এলেন। আমি আশ্বস্ত করলাম, বাঘের মতন ভারী কোন জানোয়ার রেলিং বেয়ে লঞ্চে উঠলে সেটা একপাশে কাত হয়ে যাবেই, অযথা আতংকিত হবার কিছু নেই। মাহফুজ ভাই আমার দিকে পাথর দৃষ্টি হেনে বললেন,
: এখানে কোন কিছুর ভরসা নেই।

মিথ্যে বলব না, মাহফুজ ভাইয়ের বিশ্বাস দেখে আমার যৎসামান্য বাঘ বিষয়ক জ্ঞানও কেমন যেন গুবলেট হয়ে গেলো। ভয় সংক্রমিত হবার জিনিস। আমিও রেলিং থেকে একটু পিছিয়ে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দিলাম। যে জঙ্গলে বাঘ আছে সেটার ভাব গাম্ভীর্যই আলাদা, সবসময়ই কেমন যেন সতর্ক থাকতে হয়। এখানে এক মুহূর্তের অসতর্কতায় মৃত্যু নেমে আসতে পারে। সতর্কতাই এখানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝের সন্ধিরেখা। জঙ্গল অসতর্ককে ক্ষমা করে না।

রাত গড়িয়েছে অনেকটা। চাঁদটাও হলদেটে ভাবটা ছাড়িয়ে ঝলমলে হয়ে এসেছে। শিশিরে ভেজা গাছপালা সেই আলোয় চকচক করছে। তীরের কাছটা চাঁদের আলোয় পরিস্কার ফুটে উঠেছে, একদম ঝকঝকে। যেখানটায় গাছের ছায়া পড়েছে সেখানে কেমন যেন দুধ্লা অন্ধকার। রাতে বানর নামে না, অনুমান করলাম কাঁকড়ার দল নিশ্চিন্তে চরে বেড়াচ্ছে। এক/আধটা সাহসী বুনো শুয়োর মাঝে সাঝে ছায়ার কাভার ছেড়ে বেরিয়ে আসছে দাঁত দিয়ে মাটি খুঁড়ে রসালো মূল খাবার আশায়। হরিণগুলো তুলনামূলক ভীরু প্রকৃতির, ছায়া ছেড়ে কিছুতেই বের হচ্ছে না। রাতের আঁধারে ওগুলোর চোখ জ্বলতে দেখেই কেবল উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। যাক, রাতের অতিথিরা আসতে শুরু করেছে। আমরা দু’জন চাতক পাখির মতন বসে রইলাম বাঘ দেখব বলে। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তেমন কিছুই ঘটলো না। শেষরাতের দিকে কেবল বিশালাকার একটা পেঁচা দেখলাম। Wood Owl এর সব প্রজাতির চিন্তাভাবনা মাথা থেকে দূর করে দিলাম। ওই সৌভাগ্য নিয়ে আমি আসিনি, কোন ধরণের Fish Owl হবে হয়ত। রাজসিক ভঙ্গিতে ডানা মেলে তীরের দিকে একটা ডাইভ দিয়ে হারিয়ে গেলো উত্তরের গহীন জঙ্গলে।

শিকার পেয়েছে কি না বোঝা গেলো না, পেয়ে থাকলেও শিকারের অন্তিম আর্তনাদ হতচ্ছাড়া জেনারেটর খেয়ে ফেলেছে। আরো একবার ট্যুরিস্ট লঞ্চবাসীদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা গেলো। মাহফুজ ভাই উঠে গেলেন লঞ্চের ছাদে, ছায়াপথটা খানিক সময়ের জন্য দৃশ্যপটে উন্মুক্ত হয়েছে, ছবি তোলার মোক্ষম সময়। আমিও পিছু নিলাম। সারা আকাশ জুড়েই আলোর পসরা সাজিয়ে বসেছে তারার দল। কোথায় পাবো এমন আকাশ? দূরে কোথাও আযান হচ্ছিলো। সুন্দরবনের কোন গহীনে দু/চার ঘর মিলে হয়তো গড়ে উঠেছে কোন মহল্লা। তারই কোন মসজিদে শোনা যাচ্ছে আযান। একসময় পুব আকাশ আভাস দিলো সূর্যোদয়ের। একটা দুটো ওরিয়ল মিঠে গলায় ডাক শুরু করেছে কেবল। ক্ষণিক নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে দিয়ে জলের খুব নীচু দিয়ে একঝাঁক জিরিয়া ফড়ফড় করে উড়ে গেলো। এর কিছুক্ষণ পরই একদল টিয়া ছোট্ট সবুজ মেঘের মতন একজোট হয়ে উড়াল দিলো পূবে। প্রভাতের আকাশে নানান রঙে কোথায় যেন মিশে দিকচক্রবালে হারিয়ে গেলো সব।

অলসতা করে অপচনশীল দ্রব্য যত্রতত্র ফেলে পরিবেশ ও প্রকৃতি নষ্ট করবেন না। বাংলাদেশে বনভূমির পরিমান মাত্র ৬.২৫ শতাংশ (আদর্শ মান ২৫ শতাংশ), সেটাও যদি আমরা নষ্ট করে ফেলি!!!!

source:  Razib Ahmed‎<Travelers of Bangladesh (ToB)