আমার তুরস্ক আসাটা অনেকটা লটারী পাওয়ার মত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটা স্কলারশীপে তুরস্কের রাজধানী আংকারায় আসলাম পিএইচডি কোর্সের একটা সেমিস্টার পড়াশুনা করার জন্য। আর সেই সুবাদে তুরস্কের তথা ইউরোপের বৃহত্তম শহর অনন্য অসাধারন ইস্তানবুল দেখার সৌভাগ্য হল। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ইস্তানবুল পৃথিবীর বুকে একটি অনন্য শহর। ইস্তানবুলকে কত নামেই না ডাকা যায়! ইউরোপের প্রবেশদ্বার, আন্তঃ মহাদেশীয় শহর, ইউরোপের বৃহত্তম শহর, রোমান, বাইজেন্টাইন ও অটোম্যান সম্রাজের রাজধানী। ইস্তানবুলকে প্রথমে চিনতাম বা জানতাম মসজিদের শহর হিসাবে। তখনও তুরস্কের নাম শুনিনি। আমার মত এখনও অনেকে আছে তুরস্ক থেকে ইস্তানবুলকে বেশী চেনে। আবার অনেকেই জানে ইস্তানবুল তুরস্কের রাজধানী। সংক্ষেপে ইস্তানবুলের ইতিহাস এমন- রাজা বাইজাস খ্রীস্টপূর্ব ছয়শত শতাব্দীতে এই শহরটি তৈরি করেন। তাই রাজার নাম থেকেই শহরের নাম হয় বাইজান্টিয়ান। এরপর পারস্য ও গ্রিসের হাত ঘুরে রোম সাম্রাজ্যের অধীনস্ত হলে সম্রাট কনস্টান্টিন এটিকে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বলে ঘোষণা করেন এবং কনস্ট্যান্টিনের নামানুসারে এই শহরের নাম হয় কনস্ট্যান্টিপল। রোম সাম্রাজ্যের পতনের পরও এই পূর্ব রোম সাম্রাজ্য প্রায় এক হাজার বছর টিকে ছিল।

সম্রাট কনস্ট্যান্ট খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়ে হাজিয়া সোফিয়া বা আয়া সোফিয়ার মতো এক অপূর্ব সুন্দর চার্চ নির্মাণ করেন। চতুর্দশ খ্রিস্টাব্দে অটোমন সুলতান দ্বিতীয় মেহমুদ রোমানদের পরাজিত করে কনস্টান্টিনোপলের নাম পরিবর্তন করে ইস্তানবুল নাম দেয় এবং ইসলামী খেলাফত বা অটোম্যান সম্রাজের রাজধানী বুরসা থেকে ইস্তানবুলে স্থানান্তর করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আধুনিক তুরস্কের জনক মোস্তফা কামাল আতার্তুক ইস্তানবুল থেকে রাজধানী আংকারায় স্থানান্তর করলেও এর গুরুত্ব বিন্দু পরিমান কমেনি। এখনও তুরস্কের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু প্রায় ১.৫ কোটি লোকের আবাসস্থল এই ইস্তানবুল। তুরস্কের অর্থনীতিতে যার অবদান চারভাগের একভাগ। কৃষ্ণ সাগর ও মারামারা সাগরের মধ্যবর্তী এবং বসফরাস প্রনালীর দুই কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই শহরের প্রতিটি ইট, কাঠই এক একটি ইতিহাস। আর ইতিহাসকে জানতে, নিজের চোখ দিয়ে ইতিহাসকে পরখ করতে এবং নিজেও ইতিহাসের অংশ হতে প্রতি বছর সারা পৃথিবী থেকে কোটির উপরে পর্যটক আসে এই ইস্তানবুলে। মুসলিম নিদর্শনে ভরপুর এই শহর পর্যটক আগমনের দিক দিয়ে পৃথিবীতে ৪র্থ।

পড়াশুনার সুবাদে আমি থাকি তুরস্কের রাজধানী আংকারার মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে। যার অবস্থান তুরস্কে প্রথম এবং বিশ্বে ৮৫ তম। পড়াশুনার যথেষ্ট চাপ থাকা সত্ত্বেও প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্রমন গ্রুপের সাথে। ইস্তানবুলের পালা আসতেই চোখের ঘুম উধাও। সময় যেন আর কাটেনা। প্রথমবারের মত ইউরোপে যাবার হাতছানি। আংকারায় থাকলেও মন পড়ে আছে স্বপ্নের শহর ইস্তানবুলে। মনে হচ্ছে সপ্তাশ্চর্য হাজিয়া সোফিয়া, সুলতান সুলেমানের প্রাসাদ তপকেপি প্যালেস, ব্লু মস্ক ও বসফরাস প্রনালী যেন আমায় প্রতিনিয়ত ডাকছে। অবশেষে আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। রাত ৩ টায় রিজার্ভ বাসে রওনা দিয়ে সকালে মারমারা সাগরের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে বসফরাস প্রনালী পার হয়ে ইস্তানবুলের ইউরোপিয়ান অংশের সুলতান আহমেদ স্কয়ারের পাশে একটি হোটেল উঠে ব্যাগ রেখে গেলাম ইস্তানবুলের সবচেয়ে দর্শনীয় স্থান হাজিয়া সোফিয়া, বসফরাস প্রনালীর পাশে সুলতান সুলেমান তথা অটোম্যান সম্রাটদের প্রাসাদ তপকেপি প্যালেস এবং তুরস্কের অন্যতম আকর্ষন ও ইসলামী ইতিহ্যের নিদর্শন সুলতান আহমেদ মসজিদ বা ব্লু মস্ক দেখতে। পরেরদিন সকালে গেলাম বসফরাস প্রনালীতে ক্রুজ ট্যুরে। সে এক অসাধারন দৃশ্য। গোল্ডেন হর্ন থেকে আমাদের জাহাজ ছুটে চলেছে বসফরাসেরর নীল পানির বুক চিরে। উপরে নীল আকাশে সাদা গাংচিলের খেলা, সাথে দুপাশের মনরোম দৃশ্য। একদিকে ইউরোপ, অন্যদিকে এশিয়া। এক সংগে দুটো মহাদেশ দেখার বিরল অভিজ্ঞতা শুধু এখানেই সম্ভব। বসফরাস ভ্রমন শেষে মাছ দিয়ে পাউরুটি খেয়ে কিছু কেনাকাটা করে শেষ করলাম সেদিনের মত ইস্তানবুল দর্শন। শহর বা নগর আমাকে টানে না, যেভাবে টানে পাহাড় ও প্রকৃতি। কিন্তু ইস্তানবুলের ক্ষেত্রে পুরাই উল্টো। দুটি পাতা একটি কুঁড়ির মত দুটি মহাদেশ একটি নগর খ্যাত ইস্তানবুল ইতিহাস ও ঐতিহ্যে অনন্য। ইস্তানবুলের তুলনা শুধু ইস্তানবুলই হতে পারে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি সৌন্দর্যের দিক দিয়েও অসাধারন। এখানকার মানুষগুলো যেমন দেখতে সুন্দর, তেমন সুন্দর রাস্তাঘাট ও তাদের ঘরবাড়ী। তুরস্কের সবকিছুই গোছানো ও পরিকল্পিত। অসংখ্য ও বিশাল বিশাল চওড়া রাস্তাগুলির দুইধারের সুন্দর সুন্দর ইমারত গুলো দেখে চোখ জুড়ায়ে যায়। এছাড়া ট্রাম, মেট্রোতো আছেই। তাই এত জনবহুল শহর হওয়া সত্ত্বেও যানজট নাই বললেই চলে। তুর্কীরা জাতিগত ভাবে যোদ্ধা হলেও আচার আচরনে অনেক বিনয়ী। পুরো তুরস্ক ঘুরেও আমার কখনো নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা হয় নাই। বাংলাদেশকে সবাই চেনে না। তবে রোহিংগা সমস্যার কারনে এখন অনেকেই বাংলাদেশ সম্পর্কে জানে। প্রায় শতভাগ মুসলমানের এই দেশে যারা চেনে তারা বাংলাদেশকে বেশ ভালবাসে। এমনও হয়েছে দোকানে চা খাওয়ার পরে মুসলিম জানার পরে বিলতো নেই নাই। উপরন্তু টিব্যাগ উপহার দিয়েছে। ভারতের কাশ্মীরেও বাংলাদেশী ও মুসলিম হওয়ার কারনে ভাল আতিথেয়তা পেয়েছিলাম। তুরস্কের সবকিছু ভাল লাগলেও দুটি ব্যাপার আমাকে খুব পীড়া দিয়েছে। এক, এখান লোকের ইংরেজী জ্ঞান। ইয়েস নো ভেরীগুড টাইপের ইংরেজী জানে না। আর দুই, ভাত পাওয়া যায় না। আমার মতো ভেতো বাংগালীর তাই অনেক কস্টও হয়েছে। তুর্কীরা ভাতের পরিবর্তে পাউরুটি খায়। আবার সেগুলো লোহার মত শক্ত। তবে এখানে গমের ভাত খাওয়ার এক বিরল অভিজ্ঞতা হয়েছে। যাহোক এরপর একে একে ডলমাবেচ প্যালেস, গালাটা টাওয়ার, ঐতিহাসিক তাকসিম স্কয়ার ও তাকসিন স্কয়ারে অবস্হিত মাদাম তুসোর মিউজিয়াম, ক্যাবল কার, বেয়ারলীবে প্যালেস, মিসরীয় মসলার বাজার, গ্রান্ড বাজার, আ্যাকুরিয়ামে ডলফিন ও শীল মাছের অসাধারন কলা কৌশল দেখে শেষ করলাম স্বপ্নের ইস্তানবুল দর্শন।

#কি_কি_দেখবেনঃ
ইস্তানবুল মোটামুটি দেখতে হলে কমপক্ষে এক সপ্তাহ হাতে রাখতে হবে। কারন এখানে ২ টা সাগরে রয়েছে অনেকগুলো সমুদ্র সৈকত, একটি প্রনালী, মিউজিয়াম,অসংখ্য প্রাসাদ ও মসজিদ সহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। যাহোক মোটামুটি যে জায়গাগুলো না ঘুরলেই নয়ঃ
১। #হাজিয়া_সোফিয়াঃ মধ্যযুগের সপ্তাশ্চার্য হাজিয়া সোফিয়া অর্থ পবিত্র জ্ঞান। এটি প্রথমে অর্থোডক্স গির্জা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তীতে ক্যাথলিক গির্জায় রুপান্তর করা হয় এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি তুরস্ক মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলে এটি “ইম্পিরিয়াল মসজিদ” নামে তুরস্কের প্রধান মসজিদ হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। আধুনিক তুরস্কের স্থপতি ও স্বাধীন তুরস্কের প্রথম রাষ্ট্রপতি “মুস্তফা কামাল আতার্তুক” ১৯৩৫ সালে এটিকে যাদুঘরে রূপান্তর করেন। বর্তমানে এটি মুসলমান ও খ্রীস্টান উভয় ধর্মের নিদর্শন বহন করছে। যাদুঘরে রূপান্তরের পর যীশু খ্রিস্টের ছবি এবং আল্লাহু ও মুহাম্মদ (সঃ) ” এর নাম আরবিতে অঙ্কিত মার্বেল পাথরে সংরক্ষিত আছে।
২। #তপকেপি_প্যালেসঃ দ্বিতীয় মুহাম্মদ পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই প্রাসাদের নির্মাণকাজ শুরু করান। এই প্রাসাদ প্রায় ৪০০ বছর ধরে উসমানীয় সুলতানদের বাসস্থান হিসেবে বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীতে ১৭ শতকে সুলতানগনের আবাস স্থল ও রাজকীয় কাজকর্ম ডোলমাবাঞ্চ প্রাসাদে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে এটি মিউজিয়াম হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে মুসা (আঃ) লাঠি, হজরত মোহাম্মদ( সাঃ) পদ চিহ্ন, দাঁড়ি, তরবারী, দাউদ (আঃ) সহ অনেক নবী ও রাসুলের ব্যবহৃত সরঞ্জাম এবং খালিদ বিন ওয়ালিদ, হজরত আল হযরত ওমর, হযরত ওসমান সহ অনেক সাহাবীর তরবারী সংরক্ষিত আছে।

৩। #ব্লু_মস্কঃ সুলতান আহমেদ মসজিদ ইস্তানবুলের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। মসজিদের অভ্যন্তরের দেওয়াল নীল রঙের টাইলস দিয়ে সুসজ্জিত বলে এই মসজিদটি ব্লু মস্ক বা নীলমসজিদ নামে পরিচিত। এটি ১৬০৯ থেকে ১৬১৬ সালের মধ্যে উসমানীয় সম্রাজ্যের সুলতান আহমেদ বখতি নির্মাণ করেন।এটি ইস্তানবুলের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ।

৪। #ডলমাবেচ_প্যালেসঃ ইউরোপীয় আদলে তৈরী ইস্তানবুলের প্রথম প্রাসাদ। বসফরাসেরর পাশে ১৭ শতকে সুলতান আব্দুল মজিদ এর শাসন আমলে নির্মিত হয।

৫। #মাদাম_তুসোর_মিউজিয়ামঃ পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিদের মোমের তৈরী মূর্তি আছে।
৬। #গালাটা_টাওয়ারঃ এটি ইস্তানবুল শহরের একটি অন্যতম ল্যান্ড মার্ক। অতীতেএখান থেকে মারমারা সাগরে নজরদারী করা হত।
৭। #গোল্ডেন_হর্নঃ গোল্ডেন হর্ন বসফরাস প্রণালীর একটি মোহনা। এটি অতীতে ইস্তানবুলের পুরোনো অংশকে আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে দুর্গপরিখা হিসেবে কাজ করতো। এছাড়া এখানে উসমানীয় সাম্রাজ্যের নৌবাহিনীর জলযান
নোঙ্গর বাঁধার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হত।
৮। #বসফরাস_প্রনালীঃ একটি জলপ্রণালী যা এশিয়া ও ইউরোপের সীমানা নির্দেশ করে। এটিকে অনেক সময় ইস্তানবুল প্রণালীও বলা হয়। বসফরাস, মারমারা
উপসাগর এবং দক্ষিণ পশ্চিমের দার্দেনেলাস প্রণালী মিলেতুর্কি প্রণালী গঠিত। বসফরাস প্রণালী বিশ্বের নৌ চলাচলে ব্যবহৃত সবচেয়ে সরু জলপথ।
৯। #গ্রান্ড_বাজারঃ ইউরোপের সবচেয়ে বড় বাজার।
১০। #আকুয়ারিয়ামঃ ডলফিন ও শীল মাছের কলা কৌশল ৮০ লিরা টিকেটে ৪০ মিনিটের এই শোটা সত্যিই অসাধারন।

এছাড়া আরো দেখতে পারেন তাকসিম স্কয়ার, বেয়ারলীবে প্যালেস, মারামারা ও কৃষ্ণ সাগর, সুলেমানী ও রস্তমপাশা মসজিদ, ব্যাসিলিকা সিস্টার্ন, হিপ্পোড্রোম, ইস্তানবুল আর্কেওলজিক্যাল মিউজিয়াম, মিউজিয়াম অফ টার্কিশ এন্ড ইসলামিক আর্ট, মিশরীয় মসলার বাজার।

#বিঃদ্রঃ
১। ইস্তানবুল ও তুরস্কে অসংখ্য মিউজিয়াম আছে। প্রতিটি জায়গায় টিকেট কাটার থেকে একটা মিউজিয়াম কার্ড, যার মেয়াদ ১ বছর কিনে নিলে সাশ্রয় হবে।
২। ইস্তানবুলে ঘোরার জন্য ইস্তানবুল কার্ড নিলে ঘোরাঘুরি সহজ ও সাশ্রয় হবে।
৩। সুলতান আহমেত স্কয়ার থেকে Big bus নামে সিটি ট্যুরের গাড়ী করে ইস্তানবুলের দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘোরা সুবিধাজনক হবে।
৪। একটা কথা বলে শেষ করছি, সেটা হলো আমরা দেশে বিদেশে, পাহাড়ে সাগরে যেখানেই যাইনা কেন? পরিবেশের দিকে সব সময় খেয়াল রাখবো। আমরা নিজের ক্ষতি করলেও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক এমন কোনো কাজ করবো না। এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।

Source: ডাঃ মোঃ মিজানুর রহমান <Travelers of Bangladesh (ToB)