কেরালায় যারা বেড়াতে আসেন তারা সচরাচর হাতে একটা নির্দিষ্ট সময় রাখেন এখানকার চা-বাগান আর ফ্যাক্টরি ঘুরে দেখার জন্য এবং সেই কাজটা তারা মুন্নারে থাকতেই সেরে ফেলেন। আমাদের মুন্নার ভ্রমণের সময়ে আমরা সেটার সুযোগ পাইনি তাই আমাদের আজকের দিনের পরিকল্পনা শুনে ইসমাইল ভাই (ড্রাইভার) নিজে থেকেই প্রস্তাব দিলেন চা-বাগানে নিয়ে যাওয়ার। ভ্রমণে এরকম বোনাস প্রাপ্তি নিতে আমাদের কারোরই আপত্তি ছিলোনা কেননা হাউসবোটে চেকইন হবে সকাল ১১.৩০ টায়। ঠেক্কাডি থেকে আলেপ্পি যাওয়ার পথেই আমাদেরকে তিনি নিয়ে গেলেন এমন এক জায়গায় যেখানে চা-পাতা তৈরি হয়, বিক্রি হয় এবং একইসাথে পুরো চা-তৈরির প্রক্রিয়াটা দর্শনার্থীদেরকে দেখানোও হয়।

১০০ রুপির বিনিময়ে ভেতরে ঢুকে চা-পাতা প্রসেস করার সমস্ত কার্যকলাপ দেখলে যে কারোরই চা সংক্রান্ত পূর্ববর্তী ধারণা পাল্টে যেতে বাধ্য। চা-পাতা প্রসেসের পুরো প্রক্রিয়া দেখা শেষে আমরা গেলাম তাদের আউটলেটে। সেখানে হরেক প্রজাতির চা-পাতা বিক্রি হয় যার দাম ৪০০ রুপি থেকে শুরু করে ১২,০০০ রুপি পর্যন্ত। প্রতিটা প্রজাতির বিশেষত্বও তারা বর্ণনা করে শোনায় দর্শনার্থীদের। বাড়ির জন্য চা-পাতা কেনাকাটা শেষে আবার গাড়িতে চড়ে বসলাম আমরা এবং সেখান থেকে সোজা আলেপ্পিতে। আলেপ্পির শহরের প্রবেশমুখেই চোখ চলে যায় পার্শ্ববর্তী ক্যানেলের দিকে। সেখানে সারি সারি বোটহাউস আর শিকারা। আলেপ্পিতে প্রথমেই যেতে হল আমাদের বুকিং করে রাখা বোটহাউসের অফিসের ঠিকানায়। সেখানে টাকা পরিশোধ এবং অন্যান্য ফর্মালিটি শেষ করে তারা আমাদের ঘাটে নিয়ে গেলেন যেখানে ভেড়ানো ছিল আমাদের কাঙ্ক্ষিত বোটহাউসটি।

আমাদের বোটহাউসের বর্ণনা দেওয়ার আগেই বলে নেওয়া ভালো, কেরালার সবচে ইউনিক আকর্ষণ হল এই বোটহাউস। অন্যান্য জায়গায় বোটহাউস সচরাচর একই জায়গায় অবস্থান করলেও এখানে সেটা হল নৌপথে যাতায়াত করা এক ভাসমান বাড়ি এবং এগুলোতে সাধারণত কাপলদের রোমান্টিকভাবে সময় কাটানোর জন্য খুবই প্রাইভেসি সম্পন্ন রাজকীয় টাইপের ব্যবস্থা থাকে (যাওয়ার আগে আমাদের এইবিষয়ে কোন ধারণাই ছিলোনা) । যাহোক, আমাদের পূর্বেই বোটহাউসের অন্য দুজন গেস্ট উপস্থিত হওয়ায় আমরা ওঠার পরপরই সেটা তার যাত্রা শুরু করল। বোটহাউসের নীচতলায় টুরিস্ট ও স্টাফদের থাকার ঘর, রান্নাঘর, ওয়াশরুম। নির্ধারিত রুমে ব্যাগ রেখে আমরা দোতালায় উঠে গেলাম। দোতলাতেই মুলত বারান্দা, কমন ডাইনিং কাম রিফ্রেশমেনট রুম। বোটহাউসের যাত্রা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ক্যানাল পাড়ি দিয়ে চলে এলাম খোলা নদীতে। বারান্দায় বসে মৃদুমন্দ বাতাসে জলের উপর ভাসতে ভাসতে দূরের লোকালয়কে দেখতে বেশ ভালই লাগছিল। কিছু সময়ের মধ্যেই আমাদের বোটহাউসের মত আরও অনেক ভাসমান বাড়ি সঙ্গী হল আমাদের। তবে সবচেয়ে মজার বাপার এখানের ভাসমান হকার।

তারা নৌকা নিয়ে এক হাউসবোট থেকে আরেকটায় ভেসে ভেসে তাদের পণ্য বিক্রি করছে। কিছু সময় যেতে না যেতেই নামলো ঝুম বৃষ্টি। ঠেক্কাডির (পর্ব ৪) এর অপূর্ণতাটা এবার ঘোচানো গেল। ধোঁওয়া ওঠা এক কাপ চা হাতে নিয়ে ভাসমান বাড়ির বারান্দায় বসে চলতে লাগলো বৃষ্টিবিলাস। দুপুর নাগাদ খাবার সারভ করা হল। সারাদিন পানিতে ভেসে বেড়ালেও সন্ধ্যার পর থেকে বোটহাউসগুলো নির্দিষ্ট গ্রামে নোঙ্গর করে রাখা হয়। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ করার কিছুক্ষণ পরই আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের সেই নির্দিষ্ট গ্রামে যেখানে বোটহাউস সারারাতের জন্য নোঙ্গর করা থাকবে। বোটহাউস থামার পর আশেপাশের এলাকাটা হেঁটে হেঁটেই ঘুরে দেখা হল সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যার পর বোটহাউসে ফিরে এসে একটা হৈ হৈ রব পরে গেল বরশি দিয়ে নদীতে মাছ ধরার।

গাছের ডালের মাথায় নাইলনের দড়ি বেঁধে হাতে তৈরি বড়শিতে আঁধার গেঁথে ঘণ্টাখানেক ব্যর্থ চেষ্টার পর রণে ভঙ্গ দিলাম আমরা। বড়শি যুদ্ধে ব্যর্থতার পর আমরা চলে গেলাম দোতলার টিভি রুমে। সেখানে মুভি চালানো হল “এভারেস্ট”। মুভি যখন টান টান ক্লাইম্যাক্সে ঢুকতে যাচ্ছে তখনই হাজির হল রাতের ডিনার। ডিনার শেষ করে আমাদের নেমে আসতে হল নিজেদের রুমে কেননা ডাইনিং রুমটাই স্টাফদের শোবার জায়গা। আমাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে আমরা যখন ফিরলাম তখন রাতের কেবল শুরু (মাত্র ৯ টা বাজে), বাহিরের চারিপাশে ঘুরঘুটটি অন্ধকার, করারও তেমন কিছু নেই। তাই পরের দিনের প্ল্যানটা আরেক দফা মিলিয়ে আর আগামী দিনে তাড়াতাড়ি ওঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে পাড়ি জমাতে হল ঘুমের দেশে।

Source: Safayet Hossain‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)