২০১৯ সালে আপনি যদি নিজের বিশ্ব ভ্রমণ লিস্টে ১৯টি জায়গাকে প্রাধান্য দেন তাহলে তার মধ্যে একটিকে কিরগিজিস্তানই ধরতে হবে।

১৯৯১ সালে স্বাধীনতা পাওয়ার আগ পর্যন্ত দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি অংশ ছিল। কিন্তু সহস্রেরও অধিক বছরের ইতিহাস নিজের মধ্যে ধারণ করে দেশটি এখন মধ্য এশিয়ার। অবস্থান করছে উজবেকিস্থান ও চীন দেশের মধ্যভাগে।

দেশটি আগে সিল্ক রোডের একটা অংশ ছিল। কিরগিজস্তানের মনোমুগ্ধকর অতুচ্চ্য প্রাকৃতিক ভূ-খণ্ড দেখলে মনে হয় মানব জীবনের যাযাবরবৃত্তির অর্ধেকটা স্বভাব ছড়িয়ে আছে এখনো, ঠিক প্রাচীনকালেও যেমন ছিল।

আপনি যদি মনে করেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা এই সংস্কৃতি যা কিনা এখনো রাজত্ব করছে স্বীয় শক্তিতে তা অনুসন্ধানে নেমে যাবেন কিরগিজিস্তানের ভূ-খণ্ডে তাহলে ‘একজন শিক্ষানবিশ হিসেবে কিরগিজিস্তানে ভ্রমণ’ অংশটি পড়ে নিতে পারেন এখান থেকে।

ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি:
প্রাচীনকালে কিরগিজরা মূলত একটি যাযাবর উপজাতি ছিল যাদের কাছে আতিথেয়তা হচ্ছে জীবন মরণের মতো একটি বিষয়। এই দিকটি দিয়ে এখনো তারা আগের মতোনই আছে, অতিথিসেবক তার সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চটা করে তার অতিথির জন্য। অধিকাংশ ভ্রমণকারীই কিরগিজস্তান থেকে ফিরে আসেন এক অন্যরকম আন্তরিকতা আর বদান্যতা নিয়ে যা তারা সেখান থেকে পেয়ে এসেছে।

এই দেশের লোকেদের কাছে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহনের জন্য ঘোড়া হচ্ছে উৎকৃষ্ট বাহন। গরমকালে দেখবেন, এখানের লোকজনেরা তাদের ঘোড়া নিয়ে নেমে গেছে জাতীয় খেলা ‘কক বরো’ (নীল নেকড়ে) খেলার জন্য। তাদের ভাষ্যমতে, প্রাচীনকালে তাদের আদিম উপজাতির লোকেরা নিজেদের মেষপালকে নেকড়ের থাবা থেকে বাঁচানোর জন্য ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করতো নেকড়েদের সাথে। তাই তাদের কাছে ঘোড়ার রক্ষক বা মালিক হওয়া বরং গৌরবের।

খাদ্য এবং পানীয়:
ভেড়া আর ঘোড়ার পাল ঝাঁক বেঁধে চলে এই কিরগিজিস্তানে। তাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এদের মাংসই সবচেয়ে পছন্দের তালিকায় আছে এখানে। নুডুলস এবং পেঁয়াজের সসের সাথে ভাপে সেদ্ধ করা ভেড়া কিংবা ঘোড়ার মাংস হচ্ছে এখানের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার। ঐতিহ্যগতভাবে এটি হাত দিয়েই খাওয়া হয় তাই নামটাও তেমন, ‘বেশবারমাক’ (পাঁচ আঙ্গুল)।

মাংসের তুলনায় শাকসবজিতে খুব কম আগ্রহ এই দেশের লোকেদের। যদিও কিরগিজিস্তানের সেরা শহরগুলোতে আধুনিক রন্ধন প্রণালীসহ নানা ধরনের খাবার যেমন ইটালিয়ান, থাই এবং ফাস্ট ফুডের ঢের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

চিরাচরিত প্রতিটা খাবারের সাথেই আপনি পাবেন গোলাকার একটি নান রুটি যেটি সমগ্র মধ্য এশিয়াতেই দেখা যায়। যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনার আয়েশ মিটবে ছোট এক কাপ করে সবুজ বা রং চা পাবেন আপনি অনবরত।

আরেকটি অভিনব খাদ্য হচ্ছে কুমিস (দুধের ছানার তৈরি) যেটি আপনাকে ভিন্ন একটা স্বাদ দিতে সক্ষম। রাশিয়াতে এই পানীয়টি বেশ পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে বিবেচিত। এখানে আপনি লাচ্ছি, টক দই, গম, মিলেট, ভদকার মতো আরো নানারকমের আকর্ষণীয় পানীয় খুঁজে পাবেন যেগুলো সাধারণত কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিতরণ করা হয়।

কেনাকাটা :
কিরগিজিস্তানের রঙ বেরঙের দোকানগুলো আদিমতম যাযাবর জীবনের সাক্ষ্য যেমন বহন করে, তেমন নানান মালপত্রে ঠাসা। পশু-লোমজ কম্বল, উলের তৈরি লেপ থেকে শুরু করে লেদারের তৈরি বিভিন্ন জিনিস যেমন লাগাম, গদি বা জিন, চাবুক সবই পাওয়া যায় এখানে।

রুপার তৈরি নানা রকম অলংকারের জন্যও সমৃদ্ধ এই কিরগিজিস্তান। তাই মেয়েদের নানা রকম গহনা তৈরির জন্য পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে স্যাকরারা ছুটে আসেন এখানে নিজের পরিবারের কথা চিন্তা করেই।

তাছাড়া ‘ওশ’ নামক মার্কেটে আপনি দেখা পাবেন বিভিন্ন রকম কারুশিল্পের। সোভিয়েতের ছোঁয়া লাগানো বিভিন্ন সামগ্রীও আছে এখানে। আছে শুকনো ফল, বাদাম, মধু, রুটির মতো নানা জাতের খাবার।

বিশকেকেও বহু জিনিস সংরক্ষকের মতোন পেয়ে যাবেন সাম সেন্টার যেখানের জিনিসপত্রগুলোতে এখনো প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে সোভিয়েত যুগের, পাবেন বৈচিত্রপূর্ণ নানা স্মারকগ্রন্থ।

যেগুলো দেখা আবশ্যক:
সারি সারি গাছের ছায়া, জনবহুল বিশাল বিশাল পার্ক এবং সোভিয়েত ধাঁচে বানানো বড় বড় বিল্ডিংয়ে সমাদৃত শহর বিশকেক হচ্ছে কিরগিজস্তানের রাজধানী।

এখানে গেলে আপনি কোনোভাবেই যেন দারুণ শৈল্পিক ছোঁয়ায় নির্মিত স্টেট মিউজিয়াম এবং স্টেট হিস্টোরি মিউজিয়াম দেখার সুযোগ হাতছাড়া না করেন সেদিকে খেয়াল রাখবেন। মিউজিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ভ্লাদিমির লেনিনের আলো বিচ্ছুরিত স্ট্যাচুটি। এটি আগে আলা-টু স্কয়ারে (পূর্বকালের লেনিন) অবস্থিত ছিল।

শহরটিতে যথেষ্ট পরিমাণে রেস্টুরেন্ট, ক্লাব বা বিনোদনমূলক নানা জায়গার দেখা পাবেন আপনি। বিশকেক থেকে সামান্য দূরেই পাবেন ২০০ বর্গমাইলের আলা আর্চা ন্যাশনাল পার্ক।

জলপ্রপাত, জঙ্গল দেখা, হাইকিংয়ের জন্য জায়গাটি বেশ মনোরম। এমনকি এখানের ৫,০০০ মিটার উচ্চতার চূড়াতেও হিমবাহ পৌঁছে যায়।

ঘোড়াতে চড়ার জন্য আর হাইকিংয়ের জন্য কিরগিজস্তানের অধিকাংশ শহরেই নানা জায়গা খুঁজে পাবেন আপনি। এখানের দারুণ নেটওয়ার্কের দরুণ খুব সহজেই যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবেন বড় বড় ট্যুরিজম প্রজেক্ট কিংবা নিজের দেশের সাথে।

মাউন্টেইনের সীমানার ভেতরে সবচেয়ে সেরা ও আকর্ষণীয় হাইকিং স্পটটি হচ্ছে ‘টিয়ান শান’ (মেঘে আচ্ছাদিত) যেটি আলা আর্চারই একটি ছোট অংশ। এই ঐশ্বর্যশালী পর্বতটি নিজের সীমানা বিস্তৃত করেছে উজবেকিস্তান থেকে চীন পর্যন্ত বরাবর ৭,৫০০ মি. উচ্চতার জেঙ্গিস চকুশু (ভিক্টোরি পিক কিরগিজিস্তান পর্যন্ত।

বসন্তের সময়টাতে আপনি যেতে পারেন আল্টিন আরাশানে যেটি প্রায় ৪,০০০ মি. উচ্চতার আলা-কুলকে অতিক্রম করেছে। এই পথেরই কারাকুল পার হওয়ার সময় আপনি দেখতে পাবেন সারি বেঁধে যাওয়া বন্য ঘোড়ার পালকে।

সং কুল হচ্ছে আরেকটা অন্যতম সুন্দর স্থান যেটি মূলত বিচ্ছিন্ন একটি হ্রদ। যেকোনো বিশাল জনবসতির চেয়ে দূরত্বে অবস্থিত হ্রদটি প্রায় ৩,০১৬ মি. উচ্চতায় অবস্থিত। এর চারপাশে চারণভূমি থাকায় সারাবছরই আপনি পাবেন ঘোড়া, ভেড়া, গরু কিংবা চমরের পালের উপস্থিতি।

অবশেষে বলবো ভ্রমণপিয়াসী কারোরই কিরগিজিস্তানের ভূখণ্ডের কোনো এক অংশে বসে চ্যালাকাঠের আগুনে শরীর গরম করে রূপকথা কিংবা মানব জীবনের অতীতের রাখাল বৃত্তির স্বাদ গ্রহণ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া উচিত না।

source: https://tripzone.xyz/travel-in-kyrgyzstan/