কামলা মানুষ হাতে সময় বড্ডো কম। ছুটির বিষয়ে এতটাই গরীর যে সপ্তাহে এক দিনের বেশি ভাগ্যে জোটে না এমন মানুষ যদি হন আপনি তবে, আপনার জন্যেই একদিনের মাঝেই অনেক কিছু ঘুরে আসার জন্য যদি ঘোরার স্থান খুঁজে ফেরেন তবে আছে ঢাকার দুই উপজেলা দোহার ও নবাবগঞ্জ। সকালে শুরু করে সন্ধ্যাতেই যদি শেষ করতে পারেন ঘুরাঘুরি তবে আর যাইহোক কৈফত দেবার বাধ্যবাধকতা হতে যে অনেকেই মুক্তি পাবেন সেটা মোটামুটি নিশ্চিত। যাইহোক শুরু করতে পারেন যেকোন দিন সকালে, ঢাকার গুলিস্তান এর গোলাপ শাহ এর মাজার হতে। সেখান থেকেই ছাড়ে নবাবগঞ্জ গামী এন.মল্লিক, যমুনা ও দ্রুত পরিবহনের বাস। সেই বাসে চেপেই শুরু করে দিতে পারেন দিনের শুরু।

মাত্র ৭০-৭৫ টাকা জন প্রতি ভাড়ায় ২ ঘন্টায় পৌছে যাবেন নবাবগঞ্জ। ঘোরাঘুরির শুরু করতে পারেন কলাকোপা হতেই। বাসের হেলপার-সুপার ভাইজার কে বললেই নামিয়ে দেবে কলাকোপা কোকিল প্যারি হাই স্কুলের সামনেই। এর পর রাস্তা পার হয়ে স্কুলের অপজিটের ডান দিকের পথ ধরে হাটা শুরু করলেই পাবেন ছোট্ট মন্দিরের মত তার মাঝে মাথা বিহীন এক মূর্তি। না ভাই আবেগ আপ্লুত হবার দরকার নেই সেই সাথে ভয় পাবারো কিছু নেই। সেই মূর্তির মাথা টি কেটে পদ্মা সেতু তৈরীতে দেওয়াও হয় নি সেই সাথে সেটি হিন্দু বা বৌদ্ধ কোন দেব দেবীরও মূর্তি নয়, যদি এই মূর্তির মাথাটি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী উড়িয়ে দিয়েছিল। এই মূর্তিটি মূলত কোকিল প্যারি জমিদারের বাবার মূর্তি। যাই হোক মূর্তি কে পাশ কাটিয়ে পথ ধরে যদি এগিয়ে যান তবে কিছু দূর যাবার পরেই অনেক গাছ ঘেরা একটি পুরনো প্রাসাদ দেখতে পাবেন। জি, এটাই কোকিল প্যারি জমিদার বাড়ি। বাসাটি যদিও বা জরাজীর্ণ অবস্থা তারপরেও।ঘুরে দেখতে পারেন পুরো বাড়ি টি।

বাসাটি যদিও ঝুঁকি পূর্ন তার পরেও সেটি এখন ব্যবহার হয় কোকিল প্যারি স্কুলের শিক্ষকদের আবাস স্থল হিসেবে। প্রাসাদ ঘুরেই বের হয়েই মেঠো পথ ধরে পা বাড়ালেই, কিছু দূর সামনেই আনসার ক্যাম্প ইছামতী নদী তীরে, এখানে যে বাড়িতে ২৯ আনসার ব্যাটালিয়নের বাস, তা তেলিবাড়ি নামে খ্যাত ছিল, অনেকের কাছে মঠবাড়ি। শোনা কথা, বাড়ির একদা মালিক বাবু লোকনাথ তেল বিক্রি করে ধনী হয়েছিলেন। সে জন্য বাড়িটির এমন নামকরণ। এখানে তিন-চারটি বাড়ি নিয়ে তেলিবাড়ির বিস্তৃতি। যে বাড়িগুলো হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার রাখতো, সেসব বাড়ি এখন দখল হয়ে যাচ্ছে। নবাবগঞ্জ যে এক কালে নবাবদের আখড়া ছিল তা পথ ধরে হাটতে হাটতে চারপাশের প্রাচীন সব জমিদার বাড়ি আর তাদের ধ্বংসাবশেষ দেখলেই বুঝতে পাবেন।

ইছামতী নদীর ধারে চলে আসলে নদীর ধার ধরে ডান পাশের পথে পথ চলা শুরু করলে ৫-৭ মিনিট হাটার পরেই পেয়ে যাবেন অত্যাধুনিক নানান রাইড সহ এক জমকালো রাজবাড়ি। আপনাকে অভিনন্দন কারন আপনি চলে এসেছেন আদনান প্যালেসে। পুরনো সেই রাধানাথ সাহার বাড়িটিই এখনো দাঁড়িয়ে আছে আদনান প্যালেস হয়ে। সুন্দর সাজানো গোছানো থিম পার্ক করার চেস্টা এই আদনান প্যালেস ঘিরেই। আদনান প্যালেসে চাইলে হালকা পেট পূজো করে বেরিয়ে পরতে পারেন। তবে যে পথে এসেছিলেন সেই পথে না ফিরে, অন্য পথে এবার পা বাড়ান কারন সামনেই রয়েছে খেলারাম দাতার মন্দির। আদনান প্যালেস হয়ে মাত্র ৬০০-৭০০ গজ দুরেই এই সুন্দর খেলারাম দাতার মন্দির। কিংবদন্তী অনুসারে, খেলারাম দাতা ছিলেন তৎকালীন সময়ের উক্ত অঞ্চলের বিখ্যাত ডাকাত সর্দার। তিনি ইছামতি নদীতে ডাকাতি পরিচালনা করতেন।

জনশ্রুতি অনুসারে, ডাকাতির ধনসম্পদ তিনি ইছামতি নদী থেকে সুড়ঙ্গপথে তার বাড়িতে নিয়ে রাখতেন ও পরবর্তীতে সেগুলো গরীবদের মাঝে দান করতেন। তিনি পূজা-অর্চনার জন্য একটি মন্দিরও নির্মাণ করেছিলেন। সেই মন্দিরটি খোলারাম দাতার বিগ্রহ মন্দির নামে পরিচিত, এই মন্দিরেই এখনো আছে তার সেই সুড়ঙ্গপথ। যা মন্দির হতে ইছামতী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ধারনা করা হয়, যদিও নিরাপত্তা জনিত কারনে তা এখন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মন্দির দেখে মূল রাস্তায় এসে একটু সামনেই পাবেন বিখ্যাত জজ বাড়ি নামক আরেক জমিদার বাড়ি। নবাবগঞ্জে গিয়ে আপনি যদি জজ বাড়ি এবং উকিল বাড়ি (ব্রজ কুটির নামে পূর্বে পরিচিত) না দেখতে যান তবে আপনার ভ্রমন অপূর্ণই থেকে যাবে।

প্রায় শতবছর পূর্বে এটি জমিদারদের বাসস্থান হিসেবে নির্মাণ করা হয়। ১৯৮৪ সালে একজন বিচারক ব্রজ নিকেতন অধিগ্রহন করলে এই ভবনটির নাম হয়ে যায় জজ বাড়ি। জজ বাড়ির ঠিক সামনেই বিশাল খেলার মাঠের কোণায় রয়েছে ১৯৪০ সালে মহাত্মা গান্ধীর আগমনের ফলে জনপ্রিয় আরেকটি জমিদারবাড়ি যেটির নতুন নাম একজন আইনজীবি অধিগ্রহন করার ফলে হয়ে যায় উকিল বাড়ি। এই সব ঘুরাঘুরি শেষে চড়ে বসতে পারেন যমুনা বা দ্রুত পরিবহন বাসে। চলে যেতে পারেন পদ্মার নদীর তীরে মৈনট ঘাটে। যা কিনা মিনি কক্সবাজার নামে পরিচিত। খুব বেশি প্রত্যাশা করা উচিত নয় এখানে তবে পদ্মার ইলিশ দিয়ে দুপুরের ভরপেট খাবার জন্য অন্যতম অসাধারণ জায়গা এটি।

যদি চান তবে নৌকা বা স্প্রিড বোটে চেপে চলে যেতে পারেন পদ্মার চড়ে ঘুরে আসতে পারেন সেখান হতেও। বিকালে ফেরার পথে ঘাট হতেই পাবেন ঢাকার গুলিস্তান পর্যন্ত সরাসরি বাস যমুনা ও দ্রুত পরিবহন। আর হাতে যদি খানিক টা সময় বেঁচে থাকে তবে সেখান হতে গাড়িতে না চড়ে ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে এগিয়ে আসতে পারেন কার্তিকপুর বাজারে। এই বাজারের মুসলিম সুইটসের মিস্টি খুবি বিখ্যাত। তাদের জল শিরা নামক সাধারণ মিস্টিও অসাধারণ সুস্বাদু। এর পর ধরতে পারেন ফিরতি পথ। বাসে কিংবা সিএনজিতে। ২-২.৫ ঘন্টা জার্নি করে ফিরে আসবেন আবার এই ইট কাঠের জঙ্গলে। ওহ ভাল কথা, দেশ বিদেশ যান, ট্যুরে ট্র‍্যাকিং এ যান, যেখানে মন চায় যান কিন্তু প্রকৃতির ক্ষতি হয় এমন কিছুই করবেন না। প্লিজ লাগে।

Source: ইসতিয়াক আহমেদ <Travelers of Bangladesh (ToB)