গত কয়েক মাস ধরেই ভাবছিলাম বৌ আর ছেলেকে নিয়ে ইন্ডিয়ার কোনো শহর থেকে ঘুরে আসবো যেহেতু ওদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছিলো। তাই অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম আন্দামান যাবো। সমুদ্র আমার সবসময় অনেক ভালো লাগে তাই আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ কে ঠিক করলাম। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ৫৭২ টি দ্বীপ আছে যার মাঝে মাত্র ৩৭ টি দ্বীপে মানুষ বসবাস করে। বাকি গুলো তে স্থায়ীভাবে কেউ থাকে না। ওখানকার মূল দ্বীপ বা দ্বীপগুলোর রাজধানী হলো পোর্ট ব্লেয়ার । পোর্ট ব্লেয়ার এ একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও রয়েছে। যাই হোক যাওয়ার প্রায় এক মাস আগেই আমি এয়ারটিকেট করে ফেলি আর বুকিং ডট কমের সাহায্যে একটি রিসোর্টএ রুম বুক করে ফেলি। আমরা জুলাই এর ৬ তারিখ যাই এবং বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখে জুলাই এর ১২ তারিখ দেশে ফিরে আসি। আমার সাথে যেহেতু আমার এক বছর বয়সী ছেলে ছিল তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান দেখে আসতে পারিনি। তবে ভবিষ্যতে আমার আবার যাওয়ার ইচ্ছে আছে বন্ধুবান্ধবদের সাথে নিয়ে।

এবার আসি পোর্ট ব্লেয়ার এর কথায়। এক কথায় খুব এ সুন্দর দ্বীপ। আল্লাহ তায়ালার অপূর্ব সৃষ্টি এই দ্বীপপুঞ্জ। সবগুলো দ্বীপই সবুজ জঙ্গলে ঢাকা আর সাথে আছে নীল সমুদ্র। সীবিচগুলু দেখলে আপনার মনে হবে হলিউড বা বলিউড এর দেখা কোনো চেনা সীবিচ। একটার চেয়ে আরেকটা বেশি সুন্দর। তার উপর দ্বীপগুলো অসম্ভব রকম পরিষ্কার পরিছন্ন। কোথাও এতটুকু ময়লা আবর্জনা দেখবেন না। যদিও অবাক করার বিষয় হলো পোর্ট ব্লেয়ার এ প্রায় পঁচাত্তর ভাগ লোকই বাংলা ভাষাভাষী। এদের বেশির ভাগ লোকই কলকাতা থেকে আগত এবং এরা এখানেই স্থায়ীভাবে থেকে গিয়েছে। তাই ওখানে গেলে আপনাকে ভাষা নিয়ে মোটেও ঝামেলা পোহাতে হবে না। এই সব দ্বীপগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশি নামকরা হলো হ্যাভলক আইল্যান্ড । এই আইল্যান্ড এর রাধানগর সীবিচ কে বলা হয় এশিয়ার সবচেয়ে সুন্দর বিচ। হ্যাভলক আইল্যান্ড ই যেতে হয় ফেরি দিয়ে। প্রায় দু ঘন্টার পথ। আপনি আন্দামান গেলে হ্যাভলক আইল্যান্ড এ অন্তত একটি রাত কাটাতে ভুলবেন না যেন। এই হ্যাভলক এবং নীল আইল্যান্ড এ অনেক সিনেমার শুটিং ও হয়ে থাকে। আমি অবশ্য এই দুটি আইল্যান্ড এ যাই নি কারণ আমার ছেলে অনেক ছোট আর ও এতো দৌড় ঝাঁপ এ ঝক্কি নিতে পারবে না। কিন্তু আপনারা গেলে অবশ্যই এই দুটি দ্বীপ ঘুরে আসবেন। পোর্ট ব্লেয়ার এর পাশেই আছে রস আইল্যান্ড এবং নর্থ বে আইল্যান্ড একদিন সারা দিন সময় নিয়ে এই দুটো দ্বীপ থেকে ঘুরে আসতে পারেন। ওখানে আপনি স্নোরক্লিং, স্কুবা ডাইভিং ইত্যাদি একটিভিটিস করতে পারেন। সমুদ্র তীর এ অসাধারণ সব প্রবাল আর রংবেরং এর মাছ দেখতে চাইলে এই সব একটিভিটিস এর জুড়ি নাই। রস আইল্যান্ড এ আপনি জাপানীজদের এই অঞ্চলে রেখে যাওয়া অনেক স্থাপত্য দেখতে পাবেন। ভালো কথা পোর্ট ব্লেয়ার এ সময় করে একদিন সেলুলার জেল অবশ্যই ঘুরে আসবেন। আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় এই ভারতবর্ষ থেকে অনেক রাজনৈতিক কয়েদিদের “কালাপানি” নামক স্থানে পাঠানো হতো শাস্তি দেয়ার জন্য। এই সেলুলার জেল হলো সেই “কালাপানি”। যেখানে আমাদের দেশের অনেক মানুষ জেল খেটেছে এবং ইংরেজদের নির্দয়তার শিকার হয়েছে। ঐখানে আমাদের দেশের অনেক স্বাধীনতাকামী মানুষকে ফাঁসি ও দেয়া হয়। এইসব শহীদ দের নাম আপনি সেলুলার জেল এর ভেতরে দেখতে পাবেন। এই সেলুলার জেল এ প্রতিদিন সন্ধ্যায় লাইট এন্ড সাউন্ড নাম একটি একঘন্টার অনুষ্ঠান হয়। এই অনুষ্ঠান এ আপনি এই দ্বীপ এবং এই জেল এর সব ইতিহাস জানতে পারবেন। প্রথম দুইটি শো হয় হিন্দি তে আর শেষটি হয় ইংরেজিতে।

পোর্ট ব্লেয়ার এ আপনি বেশ কিছু জাদুঘর পাবেন দেখার জন্য যেমন: জাতিতত্ত্ব জাদুঘর, সাইন্স মিউজিয়াম, মেরিন মিউজিয়াম, মেরিন লাইফ মিউজিয়াম ইত্যাদি। একদিন সারা দিন সময় করে ঘুরে আসুন আন্দামান এর আদিবাসী দের বাসস্থান বারাটাং থেকে, সাথে দেখতে পাবেন অনিন্দ সুন্দর লাইমস্টোন কেভ। আর এক দিন সারাদিন এর জন্য চলে যেতে পারেন চিড়িয়াটাপু তে। ওখানে আপনি আন্দামান আর নিকোবর এর জীব জন্তু দের একটা সংগ্রহশালা দেখতে পাবেন সাথে দেখবেন অসাধারণ সুন্দর সিবিচ। সব মিলিয়ে আমার মতে অন্তত ৬-৭ দিনের সময় নিয়ে আপনি বেরিয়ে পড়তে পারেন এই স্বর্গরাজ্য দর্শন করতে।

এবার আসি খাওয়া দাওয়ার কথায়, ওখানে খাওয়ার অনেক হোটেলে আছে। বাঙালি খাওয়া চাইলে আদি বাঙালি রেস্টুরেন্ট এ ঢুঁ মারতে পারেন আর যদি ভেজিটেরিয়ান ট্রাই করতে চান তা হলে চলে যান অন্নপূর্ণা রেস্টুরেন্ট এ। তবে ওখানে সি ফুড খেয়ে আমি হতাশ হয়েছি। আমার কাছে মনে হয়েছে ওখানকার সি ফুড রান্নার স্টাইলটা ঠিক যেন আমাদের কক্সেসবাজার বা সেইন্ট মার্টিন এর মতো না। ভালো কথা আন্দামান ও নিকোবর এর ডাব কিন্তু খেতে ভুলবেন না যেন। ওখানকার ডাব অনেক সুস্বাদু। তিন রঙের ডাব পাবেন ওখানে: কমলা, হলুদ আর সবুজ।

আন্দামান এর আবহাওয়া খুবই অদ্ভুত, সারা বছর একই রকম আবহাওয়া থাকে। কোনো ঠান্ডার সময় নেই। আবহাওয়াটা অনেকটা আমাদের দেশের শরৎ কালের মতো। তাপমাত্রা ২৮ – ৩৪ ডিগ্ৰী সেলসিয়াস এর মাঝেই থাকে। বৃষ্টি যে কোনো সময় হানা দিতে পারে আবার হুট্ করে চলেও যায়। ওখানে টুরিস্ট সিজন হলো সেপ্টেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত। টুরিস্ট সিজন এ আন্দামান এ না যাওয়াই ভালো কারণ তখন লক্ষ লক্ষ লোক এখানে ঘুরতে আসে এই দ্বীপপুঞ্জে তাই সব কিছুর দাম থাকে আকাশচুম্বী। এমনকি হ্যাভলক যাওয়ার ফেরির টিকেট ও টুরিস্ট সিজন এ আপনাকে ৩ মাস আগে থেকে কেটে রাখতে হবে। তাই আমি বলবো অবশ্যই অফ সিজন এ যাওয়ার জন্য। অন্তত হোটেল আপনি কম মূল্যে পেয়ে যাবেন। অফ সিজন এ ২০০০ থেকে ৪০০০ রুপির মাঝে আপনি ভালো হোটেল পেয়ে যাবেন। আর ভুলেও অনলাইন বুকিং করবেন না তাহলে তারা আপনাকে সিজন এর রেট চার্জ করবে। যেমন আমি ছিলাম পিয়ারলেস রিসোর্ট এ এবং ওরা আমাকে প্রতি রাতের জন্য ৭০০০ রুপি চার্জ করে। অথচ আমি অনলাইন এ বুক না করে যদি সরাসরি হোটেলে এ চলে আসতাম তাহলে আমাকে দিতে হতো ৪০০০ রুপি প্রতি রাতের জন্য। তাই আমার সাজেশন হবে আপনি এয়ারপোর্ট এ নেমে অটো বা গাড়ি ভাড়া নিয়ে ড্রাইভার কে বলবেন ভালো কিছু হোটেলে এ নিয়ে যেতে (অবশ্যই আপনার বাজেট বলে দিবেন) ওরা আপনাকে বিভিন্ন হোটেল এ নিয়ে যাবে। ওখানে আপনি দাম দর করে নিতে পারবেন। আমি ৬ দিন ছিলাম আর এই কয়দিন বাসুদেব নাম একজন বাঙালি অটো ড্রাইভার আমাকে সব জায়গায় ঘুরিয়েছে। উনি যথেষ্ট বন্ধুবৎসল এবং অমায়িক একজন লোক ছিলেন। কেউ চাইলে যাওয়ার আগে উনার সাথে যোগাযোগ করে যেতে পারেন। উনি সব কিছু ম্যানেজ করে দেবেন। উনার নম্বর হলো: +৯১ ৯৯৩৩২১ ৭১৮৭ । উনাকে ফোন করে আমার নাম বলতে পারেন। খুব জরুরি একটা কথা আন্দামান এ কোথাও ভালো ইন্টারনেট নেই। এমন কি আপনি হোটেলে ও ইন্টারনেট পাবেন নাম মাত্র। যা স্পিড পাবেনতা দিয়ে ফেইসবুক এ একটা ছবি পোস্ট করতে ঘন্টা দুই লাগবে। তাই মানুষিক প্রস্তুতি নিয়ে যাবেন যে ওখানে আপনাকে ইন্টারনেট ছাড়াই চলতে হবে।

আমাদের দেশের যারা বাইক এবং স্কুটার চালান তাদের জন্য সুখবর হলো আপনারা ঐখানে স্কুটার আর বাইক ভাড়ায় চালাতে পারবেন বাংলাদেশের ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহার করে। তবে ভাড়ার রেটটা আমার জানা নেই।

তাই আন্দামান থেকে ঘুরে আসতে চাইলে এখুনি ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা করিয়ে নিন এবং যাত্রার কমপক্ষে ২ মাস আগে আপনার বিমান এর টিকেট কেটে রাখুন। এতে আপনি কিছুটা সস্তায় টিকেট পাবেন। আমি আমার বৌ এবং ছেলে (১ বছর বয়স) এক মাস আগে টিকেট কাটি এবং আমাদের রিটার্ন টিকেট এর দাম পরে ৪৭০০০ টাকা। অবশ্যই পাসপোর্ট এ ডলার এন্ডোর্স করিয়ে নিবেন কারণ ওখানে অনেক জায়গাতেই ক্রেডিট কার্ড চলে না (ইন্টারনেট এর সমস্যার কারণে)। হাতে যথেষ্ট পরিমান ক্যাশ থাকাই ভালো। ক্রেডিট কার্ড নিলে শুধু ভিসা বা মাস্টার কার্ড নিবেন কারণ পুরা দ্বীপ এ কোথাও আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড একসেপ্ট করে না। ক্রেডিট কার্ড থেকে ক্যাশ তুলতে হলে HDFC ব্যাঙ্ক এর এটিএম বুথ ব্যাবহার করুন।

আমি আসলে গুছিয়ে লিখতে পারিনা। তাই ভুল ত্রূটি হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। এর বাইরে কোনো ইনফরমেশন লাগলে আমাকে অবশ্যই নক করবেন, আমার যদি জানা থাকে তাহলে আমি অবশ্যই জানাবো। সবশেষে ভ্রমণের সময় পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু করবেন না। ধন্যবাদ। (কিছু ছবি ইন্টারনেট থেকে সংযোজিত)

Source: Riasat Farabi‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)